যা থাকছে একাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে
নিউজ ডেস্ক।। একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বুধবার (৩০ জানুয়ারি) শুরু হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে এই নতুন সংসদ। ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়ার সভাপতিত্বে বিকাল তিনটায় বৈঠক শুরু হবে। বৈঠকে প্রথমেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। এছাড়া, প্রথম অধিবেশন হিসেবে এদিন রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দেবেন। সংসদ অধিবেশনের প্রস্তুতি বিষয়ে জানতে চাইলে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনের জন্য সংসদের আসন বিন্যাসসহ সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।’
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ গত ৯ জানুয়ারি এই অধিবেশন আহ্বান করেন। সংবিধানের বিধান অনুসারে সংসদ নির্বাচনের ফল (গেজেট প্রকাশের) ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে প্রথম অধিবেশন বসার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। গত ১ জানুয়ারি একাদশ সংসদ নির্বাচনের ফল গেজেট আকারে প্রকাশ হয়। এর আগে গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। ওই দিন অনুষ্ঠিত ভোটে ২৯৯ আসনের মধ্যে দলটি এককভাবে ২৫৭টিতে জয় পেয়েছে। আর জোটগতভাবে তারা পেয়েছে ২৮৮টি আসন। অন্যদিকে, তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি ও তাদের মিত্ররা পেয়েছে আটটি আসন। ১ জানুয়ারি নির্বাচনি ফলের গেজেট প্রকাশের পর আওয়ামী লীগসহ তাদের জোটভুক্ত দলের সদস্যরা ৩ জানুয়ারি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। এরপর ক্ষমতাসীন দলের সংসদ নেতা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ৭ জানুয়ারি শপথ নিয়েছেন নতুন সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা।
এদিকে, জালিয়াতির অভিযোগ তুলে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করা বিএনপি জোটের নেতারা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন না বলে এরইমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলেও বিরোধী দলের আসনে বসছে গতবারে বিরোধী দলের আসনে থাকা জাতীয় পার্টি। তবে গত সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদের বদলে এবার পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ বিরোধী দলীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন। চিকিৎসার জন্য বর্তমানে সিঙ্গাপুরে অবস্থান করায় এইচএম এরশাদ বুধবারের অধিবেশনে উপস্থিত থাকতে পারছেন না।
বিরোধী দলীয় উপনেতার দায়িত্বে থাকবেন এরশাদের ভাই ও পার্টির কো-চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের। আর বিরোধী দলীয় প্রধান হুইপের দায়িত্ব যাচ্ছে মশিউর রহমান রাঙ্গার কাছে। গতবার বিরোধী দলের পাশাপাশি সরকারের মন্ত্রিসভায়ও ছিল জাতীয় পার্টি। তবে এবার জাতীয় পার্টি বা আওয়ামী লীগের অন্য শরিকদের কেউই এপর্যন্ত সরকারে নেই। সংসদ সচিবালয়ে সূত্রে জানা গেছে, অধিবেশন শুরুর পর প্রথমেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী আবারও স্পিকার নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন, এটা অনেকটা নিশ্চিত। তবে ডেপুটি স্পিকার পদে পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ডেপুটি স্পিকার কে হচ্ছেন, তা স্পষ্ট হওয়া না গেলেও দশম সংসদে হুইপের দায়িত্ব পালনকারী নওগাঁ-২ আসনের সংসদ সদস্য শহীদুজ্জামান সরকারের নাম শোনা যাচ্ছে।
নিয়ম অনুযায়ী স্পিকার নির্বাচনের সময় ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে সংসদ শুরু হবে। যদি বর্তমান ডেপুটি স্পিকার পরবর্তী মেয়াদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তবে কেবল স্পিকার নির্বাচনের পর বৈঠক সাময়িক বিরতি দেওয়া হবে। এ সময়ে স্পিকার শপথ নিয়ে আবারও অধিবেশন শুরু করবেন এবং ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করবেন। আর বর্তমান ডেপুটি স্পিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলে এক বৈঠকেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করে তাদের শপথের জন্য অধিবেশন কিছু সময় মুলতবি রাখা হবে। পরবর্তী মেয়াদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলে স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের সময় তিনি বিদায়ী ভাষণ দেবেন। মুলতবির সময় সংসদ ভবনে অবস্থানরত রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নিয়ে স্পিকার অধিবেশনে বসবেন। নতুন স্পিকার এ সময় সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেবেন। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে অভিনন্দন জানিয়ে সংসদের ফ্লোরে সংক্ষিপ্ত আলোচনারও রেওয়াজ রয়েছে বলে সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
নতুন স্পিকার বৈঠক শুরুর পরে অধিবেশনের জন্য সভাপতিমণ্ডলীর মনোনয়ন দেবেন। স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের মধ্যে অগ্রবর্তীজন সংসদ পরিচালনা করবেন। জাতীয় সংসদ ভবন (ছবি- সাজ্জাদ হোসেন)বুধবারের কার্যসূচিতে দেখা গেছে, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচনের পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সংসদে পাঁচটি অধ্যাদেশ তুলবেন। অধ্যাদেশগুলো হলো— Representation of the People (amendment) Ordinance; ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ)(সংশোধন) অধ্যাদেশ৮; Chittagong Hill Tracts (Land Acquisition)(Amendment) Ordinance; বঙ্গবন্ধৃ শেখ মুজিবুর রহমান অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ও বাংলাদেশ ইপিজেড শ্রম অধ্যাদেশ।
এরপর স্পিকার শোক প্রস্তাব উত্থাপন করবেন। সেই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা ও মোনাজাত হবে। পরে আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অধিবেশন মুলতবি করা হবে। বর্তমান সংসদের কোনও সদস্য মারা গেলে শোক প্রস্তাবের আলোচনা শেষে অধিবেশন মুলতবির রেওয়াজ আছে। সৈয়দ আশরাফ একাদশ সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত হলেও তিনি এই সংসদের আইন প্রণেতা হিসেবে শপথ নেননি। তার মৃত্যুতে এই রেওয়াজের বাধ্যবাধকতা না থাকলেও বিশেষ বিবেচনায় তার জন্য অধিবেশন মুলতবি করা হবে বলে সংসদ সচিবালয়ে সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্পিকার বলেন, ‘সংসদে শোক প্রস্তাব উত্থাপন হবে। তবে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুর কারণে মুলতবি হবে কিনা, এ বিষয়টি আগামীকাল (বুধবার) নিশ্চিত হওয়া যাবে।’ এদিকে, সংসদের প্রথম অধিবেশন হিসেবে এতে রাষ্ট্রপতির ভাষণের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে সংসদ পুরোপুরি মুলতবি না দিয়ে কিছু সময়ের জন্য করা হবে। এরপর আবারও সংসদের বৈঠক শুরু হলে স্পিকার রাষ্ট্রপতিকে ভাষণ দেওয়ার জন্য আহ্বান জানাবেন। রাষ্ট্রপতির ভাষণের পর অধিবেশন মুলতবি করা হবে। সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের পর মুলতবি অধিবেশন যেদিন বসবে ওইদিনই এ ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব আনা হবে। পরে পুরো অধিবেশনে ওই ভাষণের ওপর আলোচনা করবেন সংসদ সদস্যরা। সংসদের প্রথম অধিবেশন, নতুন বছরের প্রথম অধিবেশন ও বাজেট অধিবেশন দীর্ঘ হয়।
প্রসঙ্গত, প্রথম দিনে না হলেও এই অধিবেশনেই সংসদের কমিটিগুলো গঠন করা হবে। এক্ষেত্রে সংসদের অধিবেশনের বিষয়ে যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফোরাম কার্যউপদেষ্টা কমিটি শুরুর দিকেই গঠিত হবে। এই কমিটির প্রধান থাকেন স্পিকার। সংসদ নেতা, বিরোধী দলীয় নেতাসহ সংসদের সিনিয়র সদস্যরা এই কমিটির সদস্য হন। আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিও আগেভাগে গঠিত হয়। এছাড়া, সংসদের অন্যান্য কমিটিগুলো অধিবেশনের সুবিধাজনক কোনও সময়ে গঠিত হতে পারে। নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন উপলক্ষে সব প্রস্তুতি শেষ করেছে সংসদ সচিবালয়। নতুন অধিবেশনের জন্য সংসদের আসন বিন্যাস ঠিক করা হচ্ছে।
আসন বিন্যাসে খুব পরিবর্তন আসছে না : আওয়ামী লীগ ও শরিক ১৪ দলের সিনিয়র নেতারা এবার সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান না পেলেও সংসদের আসন বিন্যাসে তাদের অবস্থান খুব একটা পরিবর্তন হচ্ছে না। দশম সংসদের মতোই একাদশের আসন বিন্যাসে তারা প্রথম সারিতেই থাকছেন।
সংসদ সচিবালয়ে সূত্রে জানা গেছে, সংসদের অধিবেশন কক্ষে সরকারি দলের প্রথম সারিতে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডানে দশম সংসদের যেসব সদস্যরা বসেছিলেন, এবারও প্রায় তারাই থাকছেন। এক্ষেত্রে দশম সংসদের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের স্থলে সেই আসনে বসবেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল। এই সারিতে দশম সংসদে অবস্থানকারী সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রী প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের আসনে বসছেন বর্তমান কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক। এছাড়া, দশম স্পিকারের মুখোমুখি প্রথম সারিতে বসা সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক স্পিকারের মুখোমুখি সারি থেকে ডান পাশে প্রধানমন্ত্রীর সারির শেষ মাথায় চলে আসছেন।দশম সংসদে সরকারি দলের মুখোমুখি আসনে বসা ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও জাতীয় পার্টির (জেপি) সভাপতি আনোয়ার হোসেনের মঞ্জুর আসনে কোনও পরিবর্তন হচ্ছে না।
স্পিকারের মুখোমুখি সারিতে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ও সাবেক এলজিআরডি মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের আসন ঠিক থাকছে। এক্ষেত্রে রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু এক সিট বামে আসছেন এবং তার দশম সংসদের আসনে আসছেন সাবেক গণপূর্তমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। প্রধানমন্ত্রীর পেছনের সারিতে বরাবরের মতো চিফ হুইপ বসছেন। একই সারিতে বসছেন সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যরা। এক্ষেত্রে আগে যে মন্ত্রী যে আসনে ছিলেন, এবারও মোটামুটি সেটাই থাকছে। এক্ষেত্রে কেবল ব্যক্তির পরিবর্তন হচ্ছে। সংসদ সদস্যদের মধ্যে কতবার নির্বাচিত হয়েছেন, সাবেক মন্ত্রী ও দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ও জেষ্ঠ্যতা বিবেচনা করে তুলনামূলকভাবে সামনের আসনগুলো বিন্যাস করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো নির্বাচিত বেশিরভাগ এমপিকে ওপরের সারিতে দেওয়া হচ্ছে। তবে, বয়স্ক কেউ হলে একটু সামনে দেওয়া হচ্ছে।
আসন বিন্যাসের বিষয় জানতে চাইলে স্পিকার বলেন, ‘অনেক কিছু বিবেচনা করেই আসন বিন্যাস করা হয়। এবারের আসন বিন্যাসে সামনের সারিতে খুব একটা পরিবর্তন আসছে না। আর প্রধানমন্ত্রীর পেছনের সারিতে তার মন্ত্রীদের আসন দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে পেছনের প্রথম সারিতে মন্ত্রী ও তার পরের সারিতে প্রতিমন্ত্রীদের দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার চেষ্টা করা হয়েছে।’ উৎস: বাংলা ট্রিবিউন




