বিএনপির পরিকল্পনায় ঘুরে দাঁড়ানো
সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপির বিক্ষুব্ধ ও হতাশ নেতা-কর্মী-সমর্থকরা অনেকটাই দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। হামলা-মামলায় বিপর্যস্ত লাখো কর্মী। সংগঠনও অনেকটা অগোছাল। এমন কঠিন বাস্তবতায় দল কী করবে, ভবিষ্যৎ কর্মকৌশল কী হবে, তা নিয়ে কপালে ভাঁজ পড়েছে তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় নেতাদের। এটিকে ‘বাস্তবতা’ বলেই মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা। হতাশ নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে যাচ্ছে বিএনপি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিনিয়রদের কাছে এ লক্ষ্যে গাইডলাইনও চেয়েছেন।
বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, ঢেলে সাজানো দরকার সংগঠন। গত কয়েক বছর দলে সাংগঠনিক অনেক ভুলত্রুটি ছিল। অযোগ্যদের ভিড়ে যোগ্য অনেক নেতা হারিয়েছে দল। দলে ‘চক্র’ ছিল, যারা প্রতিপক্ষের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে যোগ্য অনেক নেতাকে পাওয়া গেছে। কার কী ভূমিকা ছিল, তাও স্পষ্ট হয়েছে।দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা মনে করেন, তারুণ্যনির্ভর দল গড়তে হবে। প্রবীণ-নবীনের সমন্বয় করতে হলে অনেক তরুণকে নিয়ে আসতে হবে সামনে। এ জন্য আগামী দুই মাসের মধ্যে একটি জাতীয় কাউন্সিল করার প্রস্তাব আছে, এ নিয়ে আলোচনাও হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ জাতীয় কাউন্সিল করেছিল বিএনপি।
জানা গেছে, ছাত্রদলের নেতৃত্বও অনেকটা হতাশ করেছে বিএনপিকে। ছাত্রদের হাতে ছাত্ররাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। শিগগিরই নতুন কমিটিও গঠন হবে। অন্যান্য অঙ্গসংগঠনও ভেঙে দেওয়া হতে পারে। দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ফর্মুলা অনুযায়ী সব কমিটি পুনর্গঠন করা হবে।নির্বাচনের পর স্থায়ী কমিটির দুই বৈঠকে দল পুনর্গঠনের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। মঙ্গলবারের দুই ঘণ্টার বৈঠকে ভিডিও কনফারেন্সে তারেক রহমানও উপস্থিত ছিলেন। এতে আগামী কিছুদিন বিচ্ছিন্ন কিছু সাংগঠনিক কর্মসূচি ছাড়া রাজনৈতিক কর্মসূচি দেওয়ার বিপক্ষে মত দেন নেতারা। এখন কারাগারে থাকা নেতাকর্মীদের মুক্ত করে আনাই প্রথম লক্ষ্য।
মঙ্গলবার রাতের বৈঠকে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন মার্চে জাতীয় কাউন্সিল করার প্রস্তাব দেন। গত কয়েক বছরের আন্দোলন ও নির্বাচনের মাধ্যমে যে যোগ্য নেতৃত্ব পাওয়া গেছে, তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী সাংগঠনিক গুরুত্বপূর্ণ পদে আনার আলোচনাও হয়েছে।বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব) মাহবুবুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, দলের ভবিষ্যৎ কী হবে তা নিয়ে নীতিনির্ধারকরা আলোচনা করছেন। এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে আমার মতে, দলকে গুছিয়ে তরুণদের সামনে আনা উচিত।স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় বলেন, দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
দলের নীতিনির্ধারকরা ধারণা দিয়েছেন, এক নম্বর ভাইস চেয়ারম্যান পদে জিয়া পরিবারের কোনো সদস্যকে দেখা যেতে পারে। মহাসচিব ফখরুল থাকবেন নাকি অন্য কেউ আসবেন সেই সিদ্ধান্ত খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে স্থায়ী কমিটি ও নির্বাহী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যাবে, এটা নিশ্চিত।আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার কারাবন্দির এক বছর পূর্তি হতে যাচ্ছে। দলটির নেতারা মনে করেন, তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সারাদেশের নেতাকর্মীদের দৃষ্টি দলীয় নেত্রীর মুক্তির দিকে। সেদিকে লক্ষ রেখে আইনি লড়াইসহ মুক্তি আন্দোলন বেগবান করা হবে।
বৈঠকে বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত হয়। আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষে দলটির নীতিনির্ধারণী ফোরাম। যদিও কোনো কোনো নেতার মত, যদি দলের কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক হন, সে ক্ষেত্রে তাকে বাধা দেওয়া হবে না। তবে তাকে দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করতে হবে।সরকারের নানা অনিয়ম তুলে ধরতে বিষয়ভিত্তিক কমিটি গঠনের মতামত এসেছে। স্থায়ী কমিটির কোনো সদস্যকে প্রধান করে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে এ কমিটি করতে হবে। তারাই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এসব অনিয়ম তুলে ধরবেন। এজন্য সাতটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। এর উদ্দেশ্য হলো-ইস্যুবিহীন যেন কেউ সংবাদ সম্মেলন করতে না পারেন।
ঐক্যফ্রন্ট গঠন নিয়েও বিতর্ক : ২০-দলীয় জোটের পাশাপাশি নির্বাচনের আগে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করা নিয়ে বিতর্ক হয় বৈঠকে। সাত দফা দাবি জানানো হলেও দাবি পূরণ ছাড়াই নির্বাচনে গিয়ে কী ফল হলো, সে বিষয়ে অনেকে কথা বলেছেন। আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও আন্দোলন গড়ে তোলা হয়নি।গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অবশ্য বলেছেন, বর্তমান ভোটবিহীন সরকারকে পরাজিত করতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং ২০-দলীয় জোটের সেতুবন্ধন আরও দৃঢ় করার প্রয়োজন।
নেতাদের কেউ মনে করেন, দাবি আদায় ছাড়া ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সৃষ্টি করে নির্বাচনে যাওয়াই ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। বৈঠকে স্থায়ী কমিটির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ড. কামালের ভূমিকার সমালোচনা করেন।বিএনপির সিনিয়র নেতারা বলছেন, এখন খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনে ঐক্যফ্রন্টের ভূমিকা কী তা দেখা হবে। এসবের ওপর নির্ভর করবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ভবিষ্যৎ।ড্যাবের নতুন কমিটি গঠন প্রক্রিয়া শুরু : চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টর’স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ড্যাবের নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গঠন করা হয়েছে ১৭ সদস্যের ‘সাবজেক্ট’ কমিটি।
তারা আগামী ১৯ জানুয়ারির মধ্যে একটি আহ্বায়ক কমিটি করবেন। এই কমিটি সারাদেশের সব ইউনিটে কাউন্সিল করে ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচন করবে। আগামী তিন মাসের মধ্যে একই প্রক্রিয়ায় ড্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, কাউন্সিলে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া ড্যাব দিয়ে শুরু হয়েছে। সূত্র: দৈনিক আমাদের সময়




