বিএনপির নেতৃত্বে পরিবর্তন আসছে!
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর বিএনপি-জোট ছাড়ছেন অনেকেই। অনেকেই আবার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে যোগ দিচ্ছেন। নির্বাচনের আগেও এমন দৃশ্য দেখা গেছে। বিএনপির সিনিয়র অনেক নেতাই বলছেন, ড. কামাল ও মির্জা ফখরুলের ভুল কৌশলের মাশুল দিতে হচ্ছে পুরো দলকে। অবার অনেকেই ড. কামালকে আওয়ামী লীগের এজেন্ট বলতেও শোনা গেছে।এসব কিছুর পর আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় বিএনপি। আর তাই দলটির মহাসচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন চাইছেন দলের নেতারা। নেতারা বলছেন, নতুন নেতৃত্বে তৃণমূল নেতাকর্মীদের আরো শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। কারাগারা থাকা নেতাকর্মীদেরও বের করার চেষ্টা চলছে।
বিএনপির সাবেক নেতা বলেন, রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে সরকার নির্বাচনের নামে তাদের ক্ষমতা নবায়ন করেছে। আমাদের নীতি নির্ধারকরা কৌশলগতভাবে ফেল করেছে। আমাদের নেতাকর্মীদের অবস্থা ভালো নেই। এখন আমাদের দলের মহাসচিব পরিবর্তন হওয়া দরকার। একজন শক্ত সাংগঠনিক লোককে মহাসচিব করা দরকার। আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলের নীতি নির্ধারক পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত পুনর্গঠন হওয়া দরকার।
বিএনপির আরেক নেতা বলেন, প্রশাসন এবং আওয়ামী লীগের খপ্পরে পড়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বিএনপি। দল পুনর্গঠনের জন্য যে পরিবেশ দরকার সে পরিবেশ এখন দেশে বিদ্যমান নেই। পুনর্গঠন আমরা কাদের দিয়ে করব? নেতাকর্মীরা তো এলাকা ছাড়া। মিথ্যা মামলায় তারা ফেরারি হয়ে ঘুরছে। ঢাকায় ঘুরছে কিন্তু জামিন হচ্ছে না। তাদের যদি আমরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে না পারি তাহলে কীভাবে আমরা দল পুনর্গঠন করব। আমাদের দল পুনর্গঠন তো তৃণমূলের নেতাকর্মীদের দিয়েই করতে হবে। তারাই যদি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে না পারে তাহলে কাদের দিয়ে করব? তারপরও সেটা আমরা মাথায় রাখছি। এসবের পাশাপাশি আমাদের চিন্তায় আছে দল পুনর্গঠনে সবার আগে আমাদের প্রয়োজন নেতাকর্মীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা। জামিনের ব্যবস্থা করা, এলকায় অবাধ বিচরনের সুযোগ সৃষ্টি করা।তিনি বলেন, সবার আগে নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়াতে হবে। এরপরই আমরা দল পুনর্গঠনের কথা চিন্তা করতে পারি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির সিনিয়র এক নেতা বলেন, নির্বাচনের পর আমাদের নেতাকর্মীদের হতাশা তৈরি হয়েছে, দল বিপর্যস্ত। এসবের দায় দলের মহাসচিবসহ স্থায়ী কমিটির নেতারা এড়াতে পারেন না। তাছাড়া শোনা যাচ্ছে, মহাসচিব সংসদে যোগ দেয়ার জন্য বিদেশি কূটনীতিকদের মাধ্যমে তারেক রহমানের ওপর চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করছেন। কেউ বা তাদের ব্যবসা ধরে রাখার ফায়দা আঁটছেন। সার্বিক বিষয় বিবেচনা রেখে দল পুনর্গঠন হওয়া দরকার। তবে অসম্মানজনকভাবে কাউকে বিদায় দেয়া উচিত হবে না। আগামী মার্চে কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হতে চলেছে। আগামী জুন-জুলাইতে কাউন্সিলের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উপায়ে এসব পরিবর্তন আনলে দলকে গতিশীল করা সম্ভব হবে।
‘বিশ্ব রাজনীতিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বয়স্করা নিস্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন-সেটা বিবেচনায় রেখে নীতি নির্ধারণী ফোরাম, দলের মুখপাত্র, দফতর, চেয়ারপারসনের কার্যালয় সর্বত্র পুনর্গঠন হওয়া উচিত।বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদীন ফারুক বলেন, আমি মনে করি, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল পুনর্গঠন হবে। দল শক্তিশালী করতে হলে শক্তিশালী মানুষ দরকার।দলের ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খান বলেন, ‘দলের সব পর্যায়ে পুনর্গঠন সব সময়ই হয়, এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। গত দশ বছরে অত্যাচার, নির্যাতন, গুম, খুন, হামলা-মামলায় নেতাকর্মীরা বিপর্যস্ত। বলা যায়, এ সময়ে ১০ হাজার নেতাকর্মী খুন হয়ে গেছে। ১০ লাখ পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। একটা গণতান্ত্রিক দেশে এ রকম দেখা যায় না। এটা ইতিহাসে বিরল। এরমধ্যে দলের পুনর্গঠন জরুরি। জনগণের অধীকার ফিরিয়ে দিতে এ মুহূর্তে আমাদের প্রথম কাজ হলো দল পুনর্গঠন।
তিনি মনে করেন, সব জায়গাতেই নতুন পুরাতনের সমন্বয় থাকা উচিত। অভিজ্ঞ এবং নবীনদের সমন্বয় থাকা উচিত। শুধু যদি অভিজ্ঞরা থাকে বা পুরাতনরা থাকে তাহলে যেমন চলে না। আবার শুধু নতুনদের দিয়েও চলে না। অভিজ্ঞ এবং নতুনদের সমন্বয় রেখেই চলতে হয়। যখনই পুনর্গঠন হয় তখনই কিন্তু পুরাতনদের সঙ্গে নতুনদের জায়গা হয়। স্বাভাবিকভাবেই ধরুন, আমাদের দলের স্থায়ী কমিটির এখন প্রায় অর্ধেক পদ খালি আছে। কারণ অনেকেই মারা গেছেন। পদ প্রথম থেকেই পূরণ করা হয়নি। কাজেই যারা অভিজ্ঞ আছেন তাদের অভিজ্ঞতা যেমন আমাদের কাজে লাগাতে হবে, তেমনি নতুনদেরও জায়গা দিতে হবে। শুধু স্থায়ী কমিটি না; সব কমিটিই নতুন পুরনোদের সমন্বয়ে গঠিত হওয়া উচিত। এর মধ্য দিয়েই দলটাকে শক্তিশালী করতে হবে আগামী দিনে জনগণের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য।’
দল পুনর্গঠন প্রশ্নে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাহাবুবুর রহমান বলেন, হ্যাঁ, দল পুনর্গঠন হওয়া উচিত। আমিও তাই মনে করি। আমি মনে করি, একেবারে গণতান্ত্রিক ভিত্তিতে গ্রাসরুট থেকে টপ পর্যন্ত যাদের জনসম্পৃক্ততা আছে তাদের নিয়ে পুনর্গঠন হওয়া উচিত। কারণ জনসম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ।অন্যদিকে নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনী সহিংসতায় যেসব নেতাকর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের পাশে দাঁড়ানো, কারাগারে থাকা নেতাকর্মীদের মুক্ত করা প্রাথমিক কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে দলটি। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে জনমত সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে সংলাপ ও ২০ দল এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোকে পাশে টানার চেষ্টা করবেন তারা। এই লক্ষ্যে তারা বাম গণতান্ত্রিক জোট, বামফ্রন্ট, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও সরকারের বাইরে থাকা সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করতে চায়।
বিএনপির নেতারা বলছেন, সরকার কারচুপি করবে- এটা সবার ধারণা ছিল। সেই কারচুপি মোকাবিলায় বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও কিছু কৌশল গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সরকার এতটা বেসামাল হয়ে কাউকে ভোট কেন্দ্রে যেতে দেবে না, প্রার্থীদের ওপর হামলা ও প্রশাসনকে ব্যবহার করে এমন জালিয়াতি করবে- সেটা ভাবনায়ও নেননি তারা।একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা কাটিয়ে ওঠার উদ্যোগ নেবে বিএনপি। অহিংস আন্দোলন ও জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে সরকারকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হওয়া, এমনকি নির্বাচনের মাঠে দাঁড়াতে না পারায় দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে যে হতাশা দেখা দিয়েছে তাও কাটাতে চায় দলটি। নেতারা বলছেন, ভবিষ্যতে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায় করাই হবে নতুন টার্গেট। এর জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন সব ধরনের কর্মসূচিই গ্রহণ করা হবে। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে দলের সিনিয়র নেতারা কোনো বৈঠক করেননি। কবে নাগাদ বৈঠক করতে পারেন সে বিষয়েও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
খালেদা জিয়ার সঙ্গে দলের সিনিয়র নেতাদের সাক্ষাতের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অনুমতি চাওয়া হয়েছে। অনুমতি মিললে সাক্ষাতের পর গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে জানা গেছে। বিএনপির দলীয় সূত্র বলছে, নির্বাচনে দৃশ্যত বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা হারলেও ভোটের চিত্র দেশবাসীকে একটি বড় বার্তা দিয়েছে। দলীয় সরকারের অধীনে যে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না তা স্পষ্ট হয়েছে। ভবিষ্যতে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার কোনো যুক্তিই এখন ধোপে টিকবে না। নেতারা বলছেন, বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়েও এখন রাজনৈতিক দলগুলো ভাববে। যেহেতু দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হবে তাই এ বিষয়ে বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্টেরও ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হবে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, আমরা এখন দলের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন পুনর্গঠন করবো। এটা আমাদের চলমান প্রক্রিয়া। নির্বাচনের সময় আমাদের সিদ্ধান্ত ও ব্যর্থতাগুলো পর্যালোচনা করে আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ হবে। সরকারের সকল ধরনের চালাকি মোকাবিলার জন্য আমাদের নেতাকর্মীদের প্রস্তুত করা হবে। এ ব্যপারে খালোদ জিয়ার সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করছি।রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নিএনপি এখন কী করবে তাই বুঝতে পারছে না। সম্প্রতি তাদের মধ্যে ব্যাপক অনৈক্য দেখা দিয়েছে। যার প্রমাণ বিএনপি নেতাদের ফোনালাপ ফাঁসে দেখা গেছে। বিএনপি এখন ঘুরে দাঁড়াতে হলে দলের পুনর্গঠন দরকার। সূত্র: বাংলাদেশ জার্নাল




