যেভাবে ইয়েমেন যুদ্ধের প্রতীক হয়ে উঠল এই শিশু
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বাম চোখ পুরোপুরি বন্ধ। বীভৎসভাবে ফুলে উঠে রক্ত জমে গাঢ় লাল হয়েছে। আঘাত লেগে অন্য চোখটাও বন্ধ। জোর করে সেই ডান চোখ খোলার চেষ্টা করছে এক শিশু। ঠোঁট দু’টিও ফুলে উঠে কার্যত বিকৃত হয়েছে। এমনই এক শিশুর ছবি ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল। হয়ে উঠেছিল ইয়েমেন যুদ্ধের ভয়াবহতার প্রতীক।সেই বুথাইনা মনসুর রিমি অবশেষে গ্রামে ফিরল। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে চিকিৎসা শেষে ফিরে এসেছে সানা শহরে নিজের বাড়িতে। মা-বাবা, ভাই, চাচা-সহ পরিবারের প্রায় সবাইকে হারিয়ে এখন তার আশ্রয় চাচা আলির কাছে। আকাশ থেকে সেদিনের উড়ে আসা মৃত্যুদূতের কথা স্মরণ করে আট বছরের বুথাইনা বলল, ‘বন্ধ হোক এই যুদ্ধ! আমরা শান্তিতে থাকতে চাই।’
ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘হুথি’র সঙ্গে সৌদি আরবের যুদ্ধ চলছে দীর্ঘদিন ধরে। বছর চারেক আগে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই সানা শহরের দখল হুথিদের হাতে। ২০১৭ সালের অাগস্টে সেই শহর দখলমুক্ত করতে বিমান হামলা শুরু করে সৌদি। সেই হামলাতেই কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় বুথাইনার পরিবার। জীবিত ছিলেন একমাত্র চাচা। সেই চাচার সঙ্গে রিয়াদে চলে যায় বুথাইনা। সেখানে কিছুদিন চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে ওঠে সে। আর সম্প্রতি ঘরে ফিরেছে বুথাইনা আর তার চাচা।এক বছরেরও বেশি সময় কেটে গিয়েছে। কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই আজও বুথাইনা দেখতে পায় সেদিনের সেই ভয়ঙ্কর হামলার ছবি। নিজের ঘরে বসে পুতুলের চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে ২০১৭ সালের ২৫ অাগস্টের রাতের কথা বলছিল সে।
‘বাবা-মা, ভাই, বোন এবং দুই চাচার সঙ্গে আমরা এক ঘরে বসে ছিলাম। সেই সময়ই আচমকা একটি ক্ষেপণাস্ত্র পড়ল ঘরের উপর। আমাদের শরীরের অনেক জায়গা কেটে গেল। রক্ত পড়ছিল। তাতে চিনি দেয়ার জন্য আমার বাবা দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে দোকানে গেল। ঠিক তখনই ঘরে আছড়ে পড়ল আরও একটি ক্ষেপণাস্ত্র। কয়েক মুহূর্ত পর আরও একটা। হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল পুরো বাড়ি।’এই ঘটনার কয়েক দিন পরই বুথাইনার ছবি ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। এক চোখ ফোলা অবস্থায় হাসপাতালের বেডে বসে একটা চোখ খোলার চেষ্টা করছে বুথাইনা। পোস্ট হওয়ার পরই ভাইরাল হয়ে যায় সেই ছবি।
কিন্তু তার পর শুরু হয় নতুন বিতর্ক। ইয়েমেনের সানা থেকে সৌদির রাজধানী রিয়াদে কীভাবে পৌঁছাল বুথাইনা ও তার চাচা; সে নিয়ে তৈরি হয় ধোঁয়াশা। সংবাদ মাধ্যমেও শুরু হয় আলোচনা। এরমাঝেই একটি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, বুথাইনা আর তার চাচাকে অপহরণ করে রিয়াদে নিয়ে গেছে সৌদি সরকার। দু’জন একটি চার্টার্ড বিমানে উঠছে, এই ছবিও ছাপা হয় ইয়েমেনের একটি দৈনিকে।সম্প্রতি এক শান্তি চুক্তির পর দেশে ফিরে এসেছে বুথাইনা ও তার চাচা। সৌদি আরব বলছে, প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে সানাতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছিল।
পুরো পরিবার খুইয়ে সেই ভুলের খেসারত দিতে হয়েছে সাত বছরের বুথাইনাকে। তবে সব বিতর্ক কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত দেড় বছর পর নিজের দেশে, নিজের বাড়িতে ফিরেছে বুথাইনা। পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য চাচা আলীর সঙ্গেই নতুন করে জীবনে ফেরার স্বপ্ন দেখছে সে। ফরাসী বার্তাসংস্থা এএফপিকে সে বলেছে, ‘আমি আবার স্কুলে যেতে চাই। বড় হয়ে ডাক্তার হতে চাই।’চোখের পানি কিছুটা সামলে নিয়ে চাচা আলী বলেন, ‘ছোট্ট মেয়েটাকে এখনও ঠিকমতো বোঝাতে পারিনি। বুথাইনা ভুলতে পারেনি বাবা-মাকে। এখনও মাঝে মধ্যে বায়না ধরে, মায়ের কাছে যাবে। তখন ওকে বোঝাই, তোমার বাবা-মা স্বর্গে আছেন, যেটা ভীষণ সুন্দর জায়গা।’




