ভোট উৎসবে কাটুক শঙ্কা
নিউজ ডেস্ক।। আজ ভোট। আজ গণরায়। পাঁচ বছরের জন্য নতুন সংসদ গঠন ও সরকার নির্বাচিত করার দিন আজ। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোট নেওয়া হবে সারাদেশের ৪০ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্রে। এরই মধ্যে সব আয়োজন সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দলীয় সরকারের অধীনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে নানা শঙ্কা ও উৎকণ্ঠা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা ভোট উৎসবে রূপ নেবে বলেই সবার প্রত্যাশা। উৎসব নির্বিঘ্ন করতে দেশজুড়ে গ্রহণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
১০ কোটি ভোটারের পাশাপাশি ১৭ কোটি মানুষ ও বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর চোখ থাকবে নির্বাচনী পরিস্থিতির ওপর। এবারের নির্বাচনী প্রচারের পুরো সময়টাতেই উত্তাপ ছিল দেশজুড়ে। তবুও ভোট উৎসবে অংশ নিতে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর অস্থায়ী বাসিন্দারা ছুটে গেছেন নিজ নিজ এলাকায়। অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গেছে ঢাকা শহর। যদিও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের সেই উত্তাল-অস্থির সময়ের স্মৃতি এখনও মানুষের মনে দাগ কেটে আছে। গতবার নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলো এবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্বে ভোটের লড়াইয়ে ফিরেছে। তাই সবার মনেই তৈরি হয়েছে এক ধরনের স্বস্তি।
সরকারি দল, বিরোধী দল ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে সরব উপস্থিতির আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, কেন্দ্রে ভোটারদের ঢল নামলে কেটে যাবে সব শঙ্কা। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলের কর্মী, সমর্থক ও প্রার্থীদের ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রে অবস্থানের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রতিপক্ষ বিএনপির ঘোষণায় কাউকে বিভ্রান্ত না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, মানুষের মনে অনেক সংশয় ও সন্দেহ রয়েছে। ভোটারদের সকাল সকাল কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, ভয় পাবেন না। আপনারা গেলে দুর্বৃত্তরাই পালিয়ে যাবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বলেছেন, কেউ সহিংসতা ও নাশকতামূলক অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করলে কঠোরভাবে দমন করতে হবে। কোনো ভয়ভীতির কাছে নতিস্বীকার না করে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ জানিয়েছেন, ভোটের মাঠে ৫০ হাজারের বেশি সেনাসদস্য মোতায়েন রয়েছে। তিনি ভোটারদের নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান।
২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করার পর এবার বিএনপি অংশ নেওয়ায় দীর্ঘ ১০ বছর পর ইসিতে নিবন্ধিত সব দলের অংশগ্রহণে ভোট হচ্ছে। নৌকা প্রতীকের সঙ্গে সরাসরি ধানের শীষের ভোটের লড়াই হচ্ছে। তবে মহাজোট ও জোটভুক্ত হওয়ায় অনেক স্থানে বড় এই দুই দলের প্রতীক নিয়ে অন্য দলের প্রার্থীরাও ভোট করছেন। এবার বিভিন্ন দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে এক হাজার ৮৬১ প্রার্থী নির্বাচনী লড়াইয়ে আছেন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী রয়েছেন এক হাজার ৭৩৩ জন আর স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন ১২৮ জন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৬ দল এবার কয়েকটি আসনে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছে। মহাজোটের অন্যতম দল জাতীয় পার্টি নিজেদের লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে লড়ছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট বেশিরভাগ আসনেই ধানের শীষ নিয়ে ভোট করছে। ২০ দলের পাশাপাশি ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরাও নির্বাচন করছেন ধানের শীষে।
আইনি জটিলতার কারণে এবারের নির্বাচনে ১৬টি আসনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের কোনো প্রার্থী নেই। আসনগুলো হলো- দিনাজপুর-৩, নীলফামারী-৪, গাইবান্ধা-৪, জয়পুরহাট-১, বগুড়া-৭, রাজশাহী-৬, নাটোর-৪, ঝিনাইদহ-২, জামালপুর-১ ও ৪, মানিকগঞ্জ-৩, ঢাকা-১ ও ২০, নরসিংদী-৩, সিলেট-২ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪। শেষ মুহূর্তে এসব আসনের বেশ কয়েকটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থন জানিয়েছে ঐক্যফ্রন্ট। এরপরও ২৫০টির মতো আসনে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা।
ইসি এই নির্বাচনের প্রথম দফা তফসিল ঘোষণা করেছিল ৮ নভেম্বর। সে অনুযায়ী ভোট হওয়ার কথা ছিল ২৩ ডিসেম্বর। কিন্তু রাজনৈতিক দল ও জোটের পরামর্শে ১২ নভেম্বর পুনঃতফসিল করা হয় এবং ভোট নেওয়ার তারিখ ঠিক করা হয় ৩০ ডিসেম্বর। ১০ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দের পর প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হয়, যা শেষ হয় গত শুক্রবার সকাল ৮টায়। আজ ২৯৯টি আসনে ভোট নেওয়া হলেও একজন প্রার্থীর মৃত্যুতে গাইবান্ধা-৩ আসনের পুনঃতফসিল করে ইসি। আগামী ২৭ জানুয়ারি ওই আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
এবার নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা মোট ১০ কোটি ৪২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৭৭। এর মধ্যে পাঁচ কোটি ২৫ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৫ জন পুরুষ; পাঁচ কোটি ১৬ লাখ ৬৬ হাজার ৩১২ জন নারী। সারাদেশে মোট ৪০ হাজার ১৮৩টি ভোটকেন্দ্র ঠিক করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে সবমিলিয়ে দুই লাখ সাত হাজার ৩১২টি ভোটকক্ষ রয়েছে। এবার ছয়টি আসনে সব কেন্দ্রে ভোট হবে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম)। দ্বৈবচয়ন ভিত্তিতে ঠিক করা আসনগুলো হলো- ঢাকা-৬, ঢাকা-১৩, চট্টগ্রাম-৯, রংপুর-৩, খুলনা-২ এবং সাতক্ষীরা-২। বাকি আসনগুলোতে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে পুরনো পদ্ধতিতেই ভোট নেওয়া হবে।
ভোট গ্রহণের পর প্রতিটি কেন্দ্রে গণনা শেষে বেসরকারি ফলের লিখিত কপি প্রার্থীর পোলিং এজেন্টের কাছে সরবরাহ করবেন সংশ্নিষ্ট প্রিসাইডিং অফিসার। পরে প্রিসাইডিং অফিসাররা লিখিত ফল রিটার্নিং অফিসারের কাছে পাঠাবেন। রিটার্নিং অফিসাররা আসনভিত্তিক বিজয়ীদের নাম বেসরকারিভাবে ঘোষণা করবেন এবং ঢাকায় নির্বাচন ভবনের ফোয়ারা প্রাঙ্গণে বিশেষ মঞ্চ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করা হবে।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তাবলয় গড়ে তুলেছেন সশস্ত্র বাহিনীসহ নিয়মিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। নির্বাচনে মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরের সাধারণ কেন্দ্রে ১৪ থেকে ১৫ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৫ থেকে ১৬ জন নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন থাকবেন। মেট্রোপলিটন এলাকার কেন্দ্রগুলোতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য আরও একজন করে বেশি রাখা হবে। পার্বত্য এলাকা, দ্বীপাঞ্চল, হাওর এলাকার কেন্দ্রগুলোতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা আরও বেশি থাকবে।
ভোটগ্রহণ উপলক্ষে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ভোটে টাকার প্রভাব রোধে বন্ধ করা হয়েছে সব মোবাইল ব্যাংকিং সেবা। ইসির অনুমোদন ছাড়া বন্ধ রয়েছে মোটরসাইকেল চলাচল। গতকাল মধ্যরাত থেকে সব ধরনের যান চলাচলও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন পরিচালনা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় ৭০০ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
ইসি জানিয়েছে, কেন্দ্রের ভেতরে কেবল প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এবং কেন্দ্রের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশের ইনচার্জ মোবাইল ব্যবহার করতে পারবেন। ভোটাররা কোনোভাবেই বুথ বা কেন্দ্রের ভেতরে ফোন ব্যবহার করতে পারবেন না। কেউ মোবাইল ফোন নিয়ে কেন্দ্রে গেলেও তা বন্ধ রাখতে হবে। নির্বাচনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে জেলা পর্যায়ে ৬৬ জন রিটার্নিং অফিসার এবং উপজেলা পর্যায়ে ৫৮২ জন সহকারী রিটার্নিং অফিসার দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের অধীনে দায়িত্ব পালন করবেন দুই লাখ সাত হাজার ৩১২ জন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং চার লাখ ৬২৪ জন পোলিং অফিসার।
পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, আনসার, গ্রাম পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মোট ছয় লাখ আট হাজার সদস্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে পুলিশ এক লাখ ২১ হাজার, আনসার চার লাখ ৪৬ হাজার, গ্রাম পুলিশ ৪১ হাজার, র্যাব ১৮ হাজার, বিজিবি ২৯ হাজার ৪৯০, নৌবাহিনী এক হাজার ৪৪০ ও কোস্টগার্ড এক হাজার ২৬০ জন। ভোটের মাঠে তাৎক্ষণিক সংক্ষিপ্ত বিচারের জন্য এক হাজার ৩২৮ জন নির্বাহী হাকিম এবং ৬৪০ জন বিচারিক হাকিম আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজ করবেন। তাৎক্ষণিকভাবে বিচার করে শাস্তি দিতে পারবেন তারা। এ ছাড়াও ১২২টি নির্বাচনী তদন্ত কমিটির ২৪৪ জন সদস্য নানা অভিযোগ খতিয়ে দেখতে কাজ করবেন।
নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা মূল্যায়ন করতে ৮১টি দেশি পর্যবেক্ষক সংস্থার ২৫ হাজার ৯০০ জন প্রতিনিধি, ৩৮ জন (ফেমবোসা, এএইএ, ওআইসি ও কমনওয়েলথ থেকে আমন্ত্রিত) বিদেশি পর্যবেক্ষক থাকবেন। এ ছাড়া বিভিন্ন বিদেশি মিশনের ৬৪ জন কর্মকর্তা ভোট পর্যবেক্ষণ করবেন। দূতাবাস ও বিদেশি সংস্থায় কর্মরত আরও ৬১ জন বাংলাদেশিও নজর রাখবেন জাতীয় নির্বাচনের দিকে। উৎস: সমকাল।




