অসুস্থ হাজী সেলিমের কাছে ছুটে আসছেন ভোটাররাই
নিউজ ডেস্ক।। বছর দেড়েক আগে ব্রেইন স্ট্রোক হয় আলোচিত সাংসদ হাজী মো. সেলিমের। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর শারীরিক অচলতা কাটিয়ে এখন কিছুটা সুস্থ হলেও কথা বলার শক্তি প্রায় হারিয়েছেন তিনি। ঢাকা-৭ আসনে নৌকার টিকেট পাওয়ার পর গণসংযোগে নেমে ইশারা-ইঙ্গিতে ভোট চাইছেন তিনি। তবে তিনি যতটা গণসংযোগ করছেন, তার চেয়ে ভোটাররাই অসুস্থ হাজী সেলিমের সঙ্গে সংযোগ করছেন বেশি।
সরজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, স্পষ্টভাবে কথা বলতে না পারলেও প্রতিদিনই নিয়ম করে প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন হাজী সেলিম। নিজে গাড়িতে বসে থাকেন, আর ভোটারদের কাছে লিফলেট দিয়ে আসেন কর্মীরা। অসুস্থ হাজী সেলিম এসেছেন শুনে ভোটাররাই ছুটে যান তার গাড়ির কাছে; জানতে চান তার শারীরিক অবস্থার খবর। হাজী সেলিম ইশারায় সালাম দেয়া-নেয়া করেন; ভোটারদের হাতে লিফলেট তুলে দেয়ার চেষ্টা করেন। আবার হাত-মাথা নেড়ে বিড়বিড় করে কিছু বলারও চেষ্টা করেন; যদিও তা পারেন না।
গতকাল শুক্রবার বংশাল বড় মসজিদ থেকে জুমআর নামাজ আদায় করে নির্বাচনী প্রচারণায় নামেন হাজী সেলিম। বংশাল বড় পুকুর পাড় দিয়ে ইসলাপুর ঘাট পর্যন্ত যাবেন। কিন্তু সরু একটি রাস্তায় গিয়ে বিশাল গাড়িবহর নিয়ে যাওয়া যাচ্ছিল না। আশপাশে থাকা নেতাকর্মীরা তার অসুস্থতার কথা চিন্তা করে বলতে থাকেন, ‘ভাই ঠিক আছে আজ বাদ দেন, অন্য আরেক দিন যাবো আমরা।’ নেতাকর্মীদের এমন কথা শুনে চটে যান হাজী সেলিম। হাতের ইশারায় বলে দিলেন হেঁটেই প্রচারণা চালাবেন তিনি। নেতার এমন দৃঢ় প্রত্যয় দেখে নেতাকর্মীরাও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। তার পাশে থাকা নেতাকর্মীরা এক সঙ্গে উচ্চ স্বরে বলে উঠলেন, ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’। এ স্লোগানের মধ্যেই কয়েকজন নেতাকর্মী বুদ্ধি করে নিয়ে আসলেন একটি রিকশা। একটি মুচকি হাসি দিয়ে ভোটারদের দ্বারে পৌঁছাতে রিকশাটিতে উঠে পড়লেন হাজী সেলিম। যথারীতি তার রিকশা ঘিরে ধরেন ভোটাররা; জানতে চান শরীরের হাল।
ধানের শীষের বিপরীতে ভোটের ফল ঘরে তুলতে স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিরোধে কাটিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করছেন হাজী সেলিম। ঢাকা-৭ আসনে নৌকার প্রচারণায় হাজী সেলিমের হয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন ১৩টি ওয়ার্ডের নেতৃবৃন্দ। এ বিষয়ে লালবাগ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে আমাদের মাঠ অনেকটা গুছিয়ে ফেলেছি। ১৩টি ওয়ার্ডের নেতৃবৃন্দ ও আমাদের হাজী সেলিমের নিজস্ব ফোর্স, সবাই মিলে একাত্মতা ঘোষণা করে কাজ করে যাচ্ছি।’
পুরান ঢাকার হাজী সেলিম বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েই ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এই আসনের প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।সেসময় সাবেক ঢাকা-৮ আসনের বিএনপি প্রার্থী আবুল হাসনাতকে হারালেও ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি হেরে যান বিএনপি প্রার্থী নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর কাছে। অন্যদিকে সীমানা পুনর্বিন্যাসের পর ২০০৮-এর নির্বাচনে ওই আসনে আওয়ামী লীগের তৎকালীন স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বিএনপির নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুকে হারিয়ে সাংসদ নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে বিএনপিবিহীন নির্বাচনে দলের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনকে হারিয়ে দিয়ে চমক দেখান হাজি সেলিম।
এবার ঢাকা-৭ আসনে নৌকার টিকেট পাওয়া হাজী সেলিমের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসিন মন্টু। এক সময় আওয়ামী লীগের ডাকসাইটে নেতা হিসেবে পরিচিত মন্টু ১৯৮৬ সালে কেরানীগঞ্জ থেকে নৌকার টিকেটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর ওই আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি হেরে যান বিএনপির আমানউল্লাহ আমানের কাছে। ছাত্রলীগ নেতা বাদল হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৯৯২ সালের মে মাসে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ থেকে দূরে সরে যাওয়া মন্টু ড. কামাল হোসেনের গড়া নতুন দল গণফোরামে যোগ দেন। ২০০৪ সাল থেকে দলটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন মুক্তিযুদ্ধকালে ঢাকা মহানগর ও ঢাকা জেলার এই কমান্ডার। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম সংগঠক মন্টু অবশ্য প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন নিজের ঢাকা-৩ আসন থেকে। কিন্তু সেখানে আমানের বদলে তার ছেলে ইরফান ইবনে আমান অমিকে প্রার্থী করে মন্টুকে ঢাকা-৭ আসনে ধানের শীষের টিকেট দেওয়া হয়।
ঢাকা-৭ আসনে হাজী সেলিমের অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীরা হলেন- মই’ প্রতীকে বাসদের খালেকুজ্জামান, লাঙ্গলে জাতীয় পার্টির তারেক আহমেদ আদেল, গোলাপ ফুলে জাকের পার্টির বিপ্লব চন্দ্র বণিক, মাছ প্রতীকে গণফ্রন্টের রিয়াজ উদ্দিন, হারিকেনে মুসলিম লীগের আফতাব হোসেন মোল্লা, হাতপাখায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আব্দুর রহমান, টেলিভিশনে বিএনএফ’র জাহাঙ্গীর হোসেন, আম প্রতীকে ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মো. মাসুদ পাশা এবং বটগাছে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মো. হাবিবুল্লাহ। এই আসনে এবার মোট ১২২টি কেন্দ্রে মোট ভোটার ৩ লাখ ২৮ হাজার ১৮১ জন। ১ লাখ ৭৫ হাজার ১৮৪ জন পুরুষের বিপরীতে নারীর সংখ্যা ১ লাখ ৫২ হাজার ৯৯৭ জন।




