237056

বিএনপিতে ক্ষোভ, ত্যাগীদের চোখে জল!

বিএনপিতে ষড়যন্ত্র ও মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ করেছেন মনোনয়ন বঞ্চিতরা। বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুলশানের কার্যালয়ে টানা দু’দিন দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত প্রার্থীর সমর্থকরা বিক্ষোভ করেন। মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ ছাড়াও, বঞ্চিতদের দাবি- দলের শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতিতে চলছে ষড়যন্ত্র।মনোয়নবঞ্চিত নেতাকর্মী ও বিএনপির মনোনয়নে যুক্ত একাধিক জরিপ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলছেন, সামগ্রিকভাবে মনোনয়ন বণ্টনে সাফল্য দেখালেও কিছু আসনে যোগ্যপ্রার্থী নির্ধারণে ব্যর্থ হয়েছে বিএনপির মনোনয়ন বোর্ড। এক্ষেত্রে মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যের দিকে আঙুল তুলেছেন অনেক মনোনয়ন বঞ্চিত নেতারা।

তারা বলছেন, মনোনয়ন বোর্ডের কিছু সদস্যের নেতৃত্বে অঘোষিত একটি সিন্ডিকেট হয়েছে, যারা প্রার্থী নির্ধারণ করতে গিয়ে নিজেদের বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বিচারের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছেন, তাদের দায়ী করা হচ্ছে সুবিবেচনা না করার অভিযোগেও। এসব কারণে দলে দীর্ঘদিন সক্রিয় ও আনুগত্য প্রদর্শন করেও সংস্কারপন্থীদের কাছে মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন হাফডজন কেন্দ্রীয় নেতা।এসবের মাঝেই মনোনয়ন না পেয়ে দল ছাড়লেন কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা সঙ্গীতশিল্পী মনির খান। এদিকে, বিক্ষোভ করে মনোনয়ন পেলেও আবারো বাদ পড়েছেন বিএনপির সাবেক মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ারের ছেলে আব্দুল হামিদ ডাবলু।

মুন্সীগঞ্জ- ১ আসনে সাবেক জাতীয় পার্টির নেতা শাহ মোয়াজ্জেমের পরিবর্তে শেখ মো. আব্দুল্লাকে মনোনয়ন দেয়ার দাবিতে বিক্ষোভ হয় বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুলশান কার্যালয়ে। এছাড়া কুমিল্লা-৪- আসন জেএসডি আব্দুল মালেক রতনকে ছেড়ে দেয়ায় বিক্ষোভ করেন মঞ্জুলরুল আহসান মুন্সীর সমর্থকরা।বঞ্চিত নেতাকর্মীরা অভিযোগ করে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও অন্যান্য দল থেকে বিএনপিতে আসার পর থেকেই দলে কোন্দল শুরু হয়েছে।’বিএনপি নেতাদের মনোনয়ন দেয়া না হলে সবাই একসঙ্গে পদত্যাগ করাসহ নির্বাচন বর্জনের হুমকিও দেন নেতাকর্মীরা।

সুনামগঞ্জ-৫ আসনে মনোনয়ন পাননি সিলেট বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা, কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন। ইতোমধ্যে সিলেটের একটি হাসপাতালে মিলনকে ভর্তি হতে হয়েছে। তার ঘনিষ্ঠ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মুহাম্মদ মুনতাসির আলী বলেন, ‘কলিম আহমেদ মিলন এখন বাসায় আছেন। তিনি মনোনয়নবঞ্চিত হলেও নেতাকর্মীদের শান্ত থাকার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।’সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির একাধিক নেতা জানান, গত ১০ বছরে সুনামগঞ্জে বিএনপির রাজনীতি টিকিয়ে রাখার পেছনে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা নেতাটি কলিম উদ্দিন মিলন। জেলার সাধারণ মানুষের কাছেও তিনি জনপ্রিয়। এছাড়া সংস্কারপন্থী নজীর হোসেনকে মনোনয়ন দেওয়ায় জেলার পরবর্তী রাজনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।

এই প্রভাব অনেক বেশি ভয়ঙ্কর এবং বিএনপিকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলবে বলে মনে করেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাহের শামীম। তিনি বলেন, ‘আমরা বলতে পারি হতাশ। আমাদের মন খারাপ। পরবর্তী সময়ে দলকে অবশ্যই ভুগতে হবে।’একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঝিনাইদহ-৩ আসন থেকে মনোনয়ন চান সংগীতশিল্পী মনির খান। কিন্তু ঝিনাইদহ-৩ আসনে মনোনয়ন পান বিএনপির জোট সঙ্গি জামায়াত নেতা মতিয়ার রহমান। এরপরই ক্ষোভ জানিয়ে সংবাদ সম্মলনে করে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কাছে ক্ষমা চেয়ে দল ছাড়ার ঘোষণা দেন বিএনপির কেন্ত্রীয় সহ সাংস্কৃতিক সম্পাদক মনির খান।

মনির খান বলেন, ‘এই রাজনীতির মাঠে অনেক চিকন বুদ্ধির প্রয়োজন হয়। তবে সেটির সঙ্গে তাল মেলানো আমার জন্য মুশকিল। আজ এই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আমি বিএনপি থেকে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।’সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, মনোনয়ন পাওয়া না পাওয়া বড় কারণ নয়। মনোনয়ন পেলে রাজনীতি করব আর না পেলে করব না বিষয়টা এমন না। আমি গানের মানুষ গানের মাধ্যমে জনগণের কাছে যাওয়ার সুযোগ করেছে। আবার রাজনীতিও জনগণের জন্য। কিন্তু রাজনীতি দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।এদিকে, নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন বিএনপির প্রবীণ নেতা তৈমুর আলম খন্দকার। তার পরিবর্তে কাজী মনিরকে দলের চিঠি দেয়ায় ক্ষোভ জানান তিনি।

বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা তৈমুর আলম খন্দকার ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘আমি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা দলে আমার কি ভূমিকা না আছে। এইটা এখন একটা ষড়যন্ত্রের আখড়ায় পরিণত হয়েছে।’তিনি আরও বলেন, ‘জিয়া পরিবারের সদস্যদের যারা সমর্থক আছে তাদের পৃথক করার জন্য গুলশান কার্যালয়ে বসে বসে এসব ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। যার কারণে দলে আজ এই অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে কখনও এমন অসন্তোষ সৃষ্টি হয়নি।’আন্দোলন করে মনোনয়ন পেয়েছেন শেরপুর-২ আসনের মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী। তবে মনোনয়ন পাওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় বাদ দেয়ার অভিযোগও করলেন মানিকগঞ্জ-২ আসনের প্রার্থী আব্দুল হামিদ ডাবলু।

বিএনপির সাবেক মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ারের ছেলে আব্দুল হামিদ ডাবলু বলেন, ‘মহাসচিবের সঙ্গে কথা বলেছি তখন তিনি আশ্বস্ত করে বলেন আমার বাইরে কাউকে দলীয় মনোনয়নের কোন চিঠি দেয়া হয়নি। কিন্তু তারপরও যে কেনও আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে মনোনয়ন দেয়ার কথা আসতেছে সেটা আমি জানিনা।’আর রাজবাড়ি থেকে মনোনয়ন বঞ্চিত বিএনপির এক নেতার অভিযোগ মনোনয়ন বাণিজ্যেরে শিকার তিনি। রাজবাড়ী জেলা বিএনপির সহ সভাপতি মোহাম্মদ আসলাম মিয়া জানান, ‘আমরা শুনেছি এখানে বড় মাপের মনোনয়ন বাণিজ্য হয়েছে, আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, তৃণমূল বিএনপিকে ধ্বংস করার অধিকার কারও নেই।’তবে এ বিষয়ে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘নির্বাচন শুরু হলে এসব ক্ষোভ-বিক্ষোভ থাকবেই। এসব কে আমি খারাপ অর্থে দেখিনা। যাদের যন্ত্রণা আছে কষ্ট আছে তারা তা প্রকাশ করবেই। তবে তা সীমালঙ্ঘন না করলেই ভালো।’

ad

পাঠকের মতামত