235608

কোটিপতি ইসহকের ‘গরিবি’ জীবনযাপন

স্বামী-স্ত্রী মিলে কয়েক কোটি টাকার মালিক হলেও তাদের বাড়িতে কোনো আসবাবপত্র নেই। নেই কোনো টিভি, ফ্রিজ বা এসির মতো বিলাসী পণ্যও। নিজের হলফনামায় এমনটিই দাবি করেছেন যশোর-২ আসনের (চৌগাছা-ঝিকরগাছা) ধানের শীষের প্রার্থী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ইসহক।এর আগে পঞ্চম ও সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও যশোর-২ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে হেরে যান যশোর জেলা বিএনপির এ সহসভাপতি। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলের প্রার্থী হিসেবে যশোর-৪ আসনে তিনি নির্বাচন করেন।অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ইসহক দীর্ঘদিন আইন পেশার সঙ্গে যুক্ত। স্ত্রী রুখসোনা আখতার সাবেক সরকারি কর্মকর্তা। তিন সন্তানের মধ্যে দুই মেয়ে বিবাহিত। আর একমাত্র ছেলে সাকিব সামরান শিক্ষানবিশ আইনজীবী।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে দাখিল করা হলফনামা পর্যালোচনায় দেখা যায় স্থাবর সম্পত্তি হিসেবে মোহাম্মদ ইসহকের যশোর শহরের বেজপাড়া এলাকায় একটি দ্বিতল বাড়ি রয়েছে, যার মূল্য পাঁচ লাখ ১০ হাজার টাকা। আর তার স্ত্রীর মালিকানাধীন ঢাকার উত্তরায় ১৪ নম্বর সেক্টরে আছে ২১ লাখ টাকার একটি ফ্ল্যাট। অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে তার নিজের কাছে নগদ ৯ লাখ ৬৮ হাজার ৬৯৬ এবং স্ত্রীর কাছে দুই লাখ টাকা রয়েছে। ব্যাংকে জমা আছে ২৩ লাখ ৩২ হাজার ৬৫৭ এবং স্ত্রীর এক কোটি টাকা। এ ছাড়া নিজের নামে সেভিংস সার্টিফিকেট হিসেবে আছে আরও ২০ লাখ টাকা। বার্ষিক আয় হিসেবে হলফনামায় তিনি আইন পেশা থেকে পাঁচ লাখ ৩০ হাজার এবং সঞ্চয়পত্র সুদ থেকে দুই লাখ সাত হাজার ২৫৩ টাকা দেখিয়েছেন।

সব মিলিয়ে স্বামী-স্ত্রীর নামে কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি থাকলেও ধানের শীষের এ প্রার্থী রীতিমতো ‘নিম্নবিত্ত’ জীবনযাপনের তথ্য দিয়েছেন। যেখানে অন্যসব প্রার্থীর বাড়ি, একাধিক টিভি, ফ্রিজ, এসিসহ দামি দামি বিলাসী পণ্যে ভরপুর; সেখানে ইসহকের কিছুই নেই। অস্থাবর সম্পত্তির বিবরণীতে তিনি আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিকসামগ্রীর অর্জনকালীন মূল্য হিসেবে মাত্র ১০ হাজার টাকা দেখিয়েছেন। এর বাইরে তার বা স্ত্রীর কোনো স্বর্ণ, মূল্যবান ধাতু বা পাথর নির্মিত অলঙ্কারও নেই। এমনকি নেই কোনো বন্ড, ঋণপত্র, স্টক এক্সচেঞ্জ বা কোনো কোম্পানির শেয়ার। তবে যাতায়াতের জন্য ১০ লাখ টাকা দামের একটি প্রাইভেটকারের মালিক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ইসহক। যোগাযোগ করা হলে এই বিএনপি প্রার্থী বলেনÑ ‘অনেক পুরনো টিভি-ফ্রিজ আছে। বর্তমানে এর কোনো মূল্য নেই। তাই সেগুলো উল্লেখ করিনি।’

এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য যশোর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম মনির এবার দলের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। পাঁচ বছর আগে সংসদ সদস্য হওয়ার আগে তার ব্যাংকে কোনো টাকা ছিল না। এখন গচ্ছিত আছে প্রায় কোটি টাকা। সেই সঙ্গে স্থাবর সম্পদ বেড়েছে ১৮৪ গুণ। হলফনামা বিশ্লেষণ করেই এ তথ্য জানা গেছে।একাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দেওয়া হলফনামায় তার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমার পরিমাণ দেখিয়েছেন ৯১ লাখ ২৫ হাজার ৮৮৪ টাকা। দশম সংসদ নির্বাচনের হলফনামা অনুযায়ী, এমপি মনিরের কোনো ধরনের ডিপিএস ও ইন্স্যুরেন্স ছিল না। এবার তার ৮ লাখ ৭০ হাজার ৯৬৩ টাকার ডিপিএস এবং ৩ লাখ ৮৫ হাজার ১৬৩ টাকার ইন্স্যুরেন্স রয়েছে। এ ছাড়া পাঁচ বছর আগে তার পৈতৃক দালানবাড়ি ও নিজ নামে ৯ হাজার ৫০০ টাকা দামের কৃষিজমি ছাড়া আর কোনো স্থাবর সম্পত্তি ছিল না। এখন নিজ নামে ১৭ লাখ ৪৬ হাজার টাকা মূল্যের ৫ দশমিক ২ কাঠা জমি রয়েছে। দশম সংসদ নির্বাচনের সময় তিনি ঝিকরগাছা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। সেই সময় তার ব্যবহারের জন্য ব্যক্তিগত কোনো গাড়ি ছিল না। এমপি হয়ে তিনি ৫৬ লাখ ৪৯ হাজার ৮৩০ টাকা মূল্যের একটি জিপ গাড়ির মালিক।

বীমা কোম্পানির পরামর্শক ও কৃষি খাতেও তার আয় বেড়েছে। দশমের হলফনামায় তিনি এসব খাত থেকে আয় দেখিয়েছিলেন ২ লাখ ৯৮ হাজার, এবার ৪ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। এ ছাড়া বিগত সংসদ নির্বাচনের সময় তার কোনো ব্যবসা ছিল না। এবার মৎস্য ব্যবসা থেকে বার্ষিক ৩১ লাখ টাকা আয় দেখিয়েছেন। মনির তার হলফনামায় আরও জানিয়েছেন, কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে তার দায়-দেনা নেই। স্ত্রীর নামেও কোনো স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি নেই।এদিকে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেজর জেনারেল (অব) অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দিন প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচন করছেন। তার প্রায় তিন কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। আর দায়-দেনা ৩২ লাখ টাকার বেশি। ঢাকার মার্কস মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত তিনি। স্বামী-স্ত্রী দুজনের আয়ের উৎস চাকরির বেতন। সাবেক সেনা কর্মকর্তা ডা. নাসিরের বার্ষিক আয় চাকরি থেকে ১৭ লাখ ১০ টাকা ও মুক্তিযোদ্ধা ভাতা বাবদ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। অন্যদিকে স্ত্রীর চাকরি থেকে বার্ষিক আয় ৭ লাখ ৬৭ হাজার ১২০ টাকা।

ডা. নাসির উদ্দিন অস্থাবর সম্পদের তালিকায় উল্লেখ করেছেন-নগদ ৪ লাখ ৩৫ হজার ১৪৮, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৮৫২, বন্ড বা ঋণপত্রে ৩ লাখ, সঞ্চয়পত্রে ৫৮ লাখ, গাড়ি ১২ লাখ টাকা এবং ১১ লাখ ১ হাজার ৭৫০ টাকা মূল্যের ৩০ তোলা স্বর্ণ, আড়াই লাখ টাকার ইলেকট্রনিকসসামগ্রী, ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা মূল্যের আসবাবপত্র রয়েছে। আর স্ত্রীর অস্থাবর সম্পদ নগদ ৬ লাখ ৮১ হাজার ২০, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা ১০ লাখ ৬৮ হাজার ৯৮০, বন্ড বা ঋণপত্র ৮ লাখ, সঞ্চয়পত্র বা স্থায়ী আমানতে বিনিয়োগ ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং গাড়ি ৩ লাখ টাকা। ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা মূল্যের ৩০ তোলা স্বর্ণ, ৩৫ হাজার টাকা মূল্যের ইলেকট্রনিকসসামগ্রী ও ২ লাখ টাকার আসবাবপত্র রয়েছে।

ডা. নাসির উদ্দিন নিজের স্থাবর সম্পদের মধ্যে ১ কোটি ৭৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকা মূল্যের সাত তলাবিশিষ্ট একটি বাড়ি রয়েছে। এ ছাড়া দোতলা একটি বাড়ি আছে, তবে এর মূল্য জানা নেই। স্ত্রীর স্থাবর সম্পদ ৬০ হাজার টাকা মূল্যের অকৃষিজমি। অন্যদিকে ইট-বালি, সিমেন্ট, কাঠ, টাইলস ও স্যানিটারি ব্যবসায়ীর কাছে ৩২ লাখ ৮৩ হাজার টাকার দায়-দেনা রয়েছে ডা. নাসির উদ্দিনের। তার বিরুদ্ধে অবশ্য কোনো মামলা নেই।

ad

পাঠকের মতামত