‘পারলে আমিও মামলা করতাম আসিফের বিরুদ্ধে’
ডেস্ক রিপোর্ট : তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনে মামলা হয়েছে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আসিফ আকবরের নামে। সংগীত অঙ্গনের আরেক প্রতিভাবান গীতিকার, সুরকার ও সংগীতশিল্পী শফিক তুহিনের করা এ মামলায় মঙ্গলবার দিবাগত রাতে সিআইডির একটি বিশেষ দল রাজধানীর মগবাজার থেকে তাকে গ্রেফতার করে।
কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবরের গ্রেফতার হওয়া এবং আসিফের আচরণ প্রসঙ্গে প্রিয়.কমকে নিজের ব্যক্তিগত মতামত প্রদান করেন কণ্ঠশিল্পী প্রীতম আহমেদ।
প্রীতম বলেন, ‘আমার কথা হচ্ছে, শিল্পী সমাজের মধ্যে একটা শ্রদ্ধাশীল সম্পর্ক সবার সাথে সবার ছিল। এটা প্রথম তিনি (আসিফ আকবর) ব্রেক করেন অনেক বছর আগে।’
২০০৬ সালের একটি ঘটনার রেষ টেনে প্রীতম আহমেদ বলেন, ‘“মঙ্গা” নামের একটি গান, যেটির টাইটেল ছিল “ধুম মাচালে” গান নিয়ে দ্বন্দ্ব হওয়ায় আমাকে মারার জন্য হুমকি-ধমকি দিয়েছিলেন। বর্তমানের থেকেও সবচেয়ে খারাপ অবস্থা তৈরি করেছিলেন ২০০৬ সালে। কুমিল্লা থেকে সন্ত্রাসী নিয়ে এসে আমার বাসা থেকে তুলে নেবে—এ রকম হুমকি দেওয়ার পর, আমি যেতে বাধ্য হই। আমি সেই সময়ে র্যাব ৪-এ বিষয়টা জানাই। এ বিষয়টা সমঝোতার জন্য যখন আমাকে জোর করে নিয়ে যাওয়া হয় রাত আড়াইটার দিকে। আমি যদি না যেতাম তাহলে আমার বাসায় আসত—এ কথাটি বলা হচ্ছিল। আমি একটা আবাসিক বাসায় থাকি। একটা অ্যাপার্টমেন্টে থাকি বউ-বাচ্চা নিয়ে। তাই বাধ্য হয়ে আমিই যাই। ওরা ১৫ থেকে ২০ জন আসতে চাইছিল বাসায়। ওরা বলতে আসিফ এবং আসিফের বন্ধুরা।
সে সময় মানবজমিনের মতিউর রহমান চৌধুরী এটার সমাধান করেন। উনি আমাদের সঙ্গে মিটআপ করেন, আসিফকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, আপনার সাথে যে ব্যবহার করা হয়েছে সেটি ভালো হয়নি। আমি বলেছি আমি আর আসিফের কাজ করব না। তিনি আসিফকে বলেছিলেন যে, আপনিও প্রীতমের কাছ থেকে কোনো গান নেওয়ার চেষ্টা করবেন না। আপনারা আপনাদের মতো থাকেন। এই ছিল সমাধান।’
আসিফের বিরুদ্ধে প্রীতমের করা অভিযোগের বিষয়টির সত্যতা যাচাইয়ে জন্য মতিউর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে প্রিয়.কম যোগাযোগ করতে পারেনি।
সাম্প্রতিক সময়ে আসিফের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব সম্পর্কে বলেন, ‘এই দফায় আমার উপর আক্রমণ করার কারণ হচ্ছে আমি মোবাইল কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করেছিলাম। সেই মামলার কাগজগুলো আমার কাছে আছে। সেখানে কোথাও আসিফের নামে কোনো অভিযোগ করা হয়নি। আমি অভিযোগ করেছিলাম, যে গানগুলো বিক্রি হচ্ছে সে গানগুলোর সবগুলোর গীতিকার-সুরকার আমি। আইনত গানগুলোর মালিক আমি। আসিফের পারমিশন আপনারা নিতেই পারেন কিন্তু আমার পারমিশনটা কে দিয়েছে, সেটা আমাকে একটু জানান। উনারা সেটা জানায়নি।’
প্রীতম আরও বলেন, ‘লিগেল নোটিশে রবি ও গ্রামীণফোন আমাকে থ্রেট দিয়েছিল যে তাদের কাছে আমার গীতিকার-সুরকার হিসেবে স্বাক্ষর আছে। যদি আমি এটা নিয়ে দ্বিতীয় কোনো কথা বলি, তাহলে তারা সেটা নিয়ে আমার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবে। আমি শুধু আমার গানের জন্য ক্লেম করেছিলাম। আমার লেখা যে গানগুলো আসিফ গেয়েছে, সেগুলোর পারমিশন কার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে, সেটা জানতে চেয়েছিলাম। তখন ওরা আমাকে বলেছিল, আপনার পারমিশন সার্টিফিকেটসহ আমাদের কাছে আছে। সেটা জানার জন্যই আমি আদালতে মামলা করেছি। আমি আসিফকে কিংবা সাউন্ডটেকে স্বাক্ষর দিইনি। তাহলে পারমিশনটা দিলো কে? তখন তারা আমাকে কাগজগুলো পাঠায়। সেখানে দেখা গেল গীতিকার ও সুরকার হিসেবে স্বাক্ষরটা আসিফের দেওয়া। তুহিন বা অন্যান্যদের পক্ষ থেকে স্বাক্ষরটা তার করা। অন বিহাফ। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে অন বিহাফ তো তখনই স্বাক্ষর করা যায় যখন তার সঙ্গে আমাদের একটা এগ্রিমেন্ট থাকবে। অন বিহাফ দিলেও আমাদের তো জানাতে হবে।
সমঝোতা করার জন্য গ্রামীণফোন, রবি এবং সবাই, নিজেরা বসেছে এবং তাদের লোকজন দিয়ে আমাকে অফার দিয়েছে যে আপনি আমাদের সাথে এসে সমস্যাটা নিয়ে বসেন। সমস্যা নিয়ে যখন বসতে গেছি, তখন তারা আমাকে অনেকগুলো দলিল দিয়েছে। সে দলিলগুলোতে এ দলিলও আছে যে, ৬১৭টি গান একটি দলিলে, স্বাক্ষর আসিফ আকবর। গীতিকার হিসেবেও স্বাক্ষর তার, সুরকার হিসেবেও স্বাক্ষর তার।
এই দলিল পাওয়ার পর যে কয়জনই জানতে চেয়েছে বিষয়টি নিয়ে তাকেই আক্রমণ করেছে আসিফ আকবর। একজন মানুষ যখন আক্রান্ত হয়, তখন তার শেল্টার হিসেবে তো একটা জায়গা থাকতে হবে। তার সঙ্গে সরাসরি মারামারি করতে যাওয়া তো আমাদের পক্ষে সম্ভব না। আমি বলব যে শফিক তুহিন যে মামলা করেছে, সেটা আমি করতে পারলে আমিও মামলা করতাম আসিফের বিরুদ্ধে। আমার একটা মামলা চলছে বলে আমি করতে পারিনি। আমাকে যে আক্রমণ করা হয়েছে সেটা আমি আদালতে জানিয়েছি। গত ২ জুন তারিখে আদালতে আমি জানিয়েছি সেটা।’
শফিক তুহিনের করা মামলা প্রসঙ্গে প্রীতম আহমেদ বলেন, ‘এ মামলাটি আমার মনে হয় যে খারাপ সিদ্ধান্ত না। কারণ আমার কাছে মনে হয় যে দেশের আইনশৃঙ্খলা ছাড়া অন্য কোনো আশ্রয় আমাদের কাছে নেই।’
সম্প্রতি একটি ভিডিওতে আসিফ আকবর প্রীতম আহমেদের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেন, ‘যাদেরকে আমি ছোট থেকে বড় করে আসছি, ইন্ডাস্ট্রিতে হাঁটাচলা শেখাইলাম, অলি-গলি চিনাইলাম’—এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রীতম বলেন, প্রথম কথা হচ্ছে আসিফ কুমিল্লা থেকে ঢাকায় গান করতে আসে ১৯৯৯ সালে। এর আগে তিনি ঢাকায় ইন্ডাস্ট্রির কোথাও ছিলেন না। আমি মিউজিক কলেজে পড়াশোনা করেছি, ঢাকায় জন্ম নিয়েছি। শফিক তুহিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স করেছেন। আমরা যখন ইন্ডাস্ট্রিতে ইনভেস্ট করে কাজ করি, তখন আমাদের ইনভেস্ট করে করে নতুন মুখ তৈরি করতে হতো। তুহিন কম করে হলেও ২০০ মিউজিক ডিরেক্টরের, সিঙ্গারের সঙ্গে কাজ করেছে। আমি ৩৫ থেকে ৪০ জন গীতিকার-সুরকার নিয়ে কাজ করতাম। আমার লেখা গান সুর করে বিক্রি করতাম। টোটাল জীবনে আমিও তার গানই করেছি ২৭টি। ২৭টি গান যদি পাঁচ হাজার টাকা করে পেমেন্ট হয় তৎকালীন, তাহলে ১,৩৫,০০০ টাকার বেশি হয় না। তিনি যে বলে বেড়াচ্ছেন যে তিনি আমাদের থাকার জায়গা করে দিয়েছেন, খাওয়ার জায়গা করে দিয়েছেন, উনিই তো তখন ঢাকায় প্রথম এসেছিলেন।
২০০০ সালে আসিফ আকবরের অ্যালবাম রিলিজ হয়েছে। ২০০০ সালের আগ পর্যন্ত তাহলে আমরা কোথায় ছিলাম? সে সময় আমি একজন তরুণ দাপুটে মিউজিক ডিরেক্টর ছিলাম। সাল ছিল ১৯৯৯। আমার করা অ্যালবামগুলো রিলিজ হয়েছে আসিফ আকবরের অ্যালবাম রিলিজ হওয়ারও আগে। সে কীভাবে বলে যে সে মাদের সুযোগ করে দিয়েছে! আসিফ আকবর আমাদের খাবার দিয়েছেন, থাকার জায়গা দিয়েছেন এটা শতভাগ মিথ্যা কথা। সে সময় তো তার নিজের পায়ের তলায়ই মাটি নেই। একটা ভালো বাসায় থাকার মতো ক্ষমতা ছিল না। তার বাসায় আমি গেছি মাত্র তিনবার।’
আসিফের উদ্দেশ্যে তার কিছু বলার আছে কি না, জানতে চাইলে প্রীতম আহমেদ বলেন, ‘তার গায়ক জীবন ভালো হোক, সুন্দর হোক, আমার কোনো সমস্যা নাই। আমরা তো তার সঙ্গে কাজ করি না। আক্রমণ করা তো কোনো শিল্পীর আচরণ হতে পারে না।’ সূত্র : প্রিয়.কম




