সৌদি ফেরত রাবেয়ার মুখে বন্দিদশার নারকীয় বর্ণনা
‘আমার আব্বা গরীব মানুষ। ১৬ বছর আগে আমারে বিয়ে দেয়া হয় প্রায় ৬০ বছরের এক লোকের সাথে। সেই সংসারে আমার দুইডা মেয়ে। একটা ক্লাস টেনে আরেকটা সিক্সে পড়ে। তাদের বাবা বার্ধক্যজনিত কারণে কোনো কাজই করতে পারেনা। যার কারণে দুই মেয়ে সহ সংসারের সব দায়িত্ব পড়ে আমার ঘাড়ে।
আমাদের এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য সাইফুল ইসলাম একদিন আইসা আমারে কই মাত্র ৬৫ হাজার টাকা হইলেই আমি বিদেশ যাইতে পারুম। নগদ পুরা টাকাও দেয়া লাগবেনা। এহন দিতে হইবো ৩৫ হাজার আর বাকি টাকা আমার বেতন থেকে কাইট্টা নিবো।
কোন দেশে নিবো আর কি কাজ করাইবো, বেতন কতো দিবো জিগাইলে উনি বলেন, সৌদি আরবের রিয়াদে নিবো, দুজন বৃদ্ধের দেখাশোনা করতে হইবো আর বেতন দিবো ২০ হাজার।
তাঁর এমন শর্তে শেষ পর্যন্ত আমি এই বছরের এপ্রিলের ২৫ তারিখে সৌদি আরবে যাই। প্রথম দুই দিন একটা ঘরে থাকি। তৃতীয় দিন আমাকে একটি গাড়িতে করে এক ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। ভবনের ওই কক্ষে গিয়া দেখি আগে থেইকা আরও ৪০ থেকে ৪৫ জন নারীকে রাখা আছে। তাদের কাছ থেকে শুনতে পারি নানা নির্যাতনের কথা। বুঝতে পারি এইখানের সবাই বন্দি যাদের দিয়া অনৈতিক কাজ করানো হয়। আমিও সেই খপ্পড়ে পড়ছি।‘
বলতে বলতে হুহ করে কেঁদে উঠেন সৌদি ফেরত টাঙ্গাইলের রাবেয়া (ছদ্মনাম)। গত ২৪ মে বৃহস্পতিবার ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বেলা তিনটার দিকে সখীপুর পৌরসভার পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের এক আত্মীয়ের বাসায় ওঠেন। গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরব গিয়েছিলেন টাঙ্গাইলের সখীপুরের এই নারী।
সখিপুরে থাকা এই নারী গত ২৫ এপ্রিল গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরব গিয়ে একটি চক্রের খপ্পরে পড়েন। সেখানে একটি ঘরে আটক রেখে তাঁকে নির্যাতন করা হয়।
মুঠোফোনের মাধ্যমে রাবেয়ার সেই আত্নীয়ের বাসায় যোগাযোগ করা হলে প্রথমে এক ভদ্র মহিলা ফোন ধরে বলেন, রাবেয়া সৌদি থেকে ফিরে খুব অসুস্থ। জ্বরে শুয়ে আছে, কথাও কম বলছেন। তিনি শুনেছেন সেখানে সে গণধর্ষণের স্বীকার হয়েছে কিন্তু লোকলজ্জায় কাউকে বলছেন না।
প্রথমে কোনো কথার উত্তর না দিলেও একসময় নিজেই সবকিছু বলতে থাকেন সৌদি ফেরত রাবেয়া।
রাবেয়ার ভাষ্য, সেখানে অন্তত ১০ নারী তাঁকে বলেন, অনৈতিক কাজ না করলে শরীরে গরম পানি ঢালাসহ মারধর করা হয়। গরম রড দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়। সৌদিফেরত রাবেয়া বলেন, ‘কয়েকজন নারীকে আমি ওখানে ভীষণ অসুস্থ অবস্থায় দেখেছি। আমি ভয়ে ভয়ে দিন কাটাতে থাকি। এর মধ্যে সাত-আট দিন পর ফিলিপাইনের এক নারীর মাধ্যমে বাংলাদেশে আমার মেয়ের কাছে এসব নির্যাতনের কথা জানাই।
১০-১২ দিন পর একদিন আমার ডাক পড়ে। আমাকে একটি গাড়িতে করে একটি কক্ষে নেওয়া হয়। সেখানে আনুমানিক ৪০ বছরের এক সৌদি নাগরিকের হাতে-পায়ে ধরি, কান্নাকাটি করি। আমার আকুতি-মিনতি দেখে তিনি আমার পেটের মধ্যে একটা লাথি মারেন। ওই লোকটি আমাকে যৌন নির্যাতন না করে আবার আগের জায়গায় পাঠিয়ে দেন। এরপর যত দিন থেকেছি, শুধু লবণ মেশানো হাফ প্লেট ভাত খেয়ে থেকেছি। আমার আসার সময় কমপক্ষে ১০-১২ জন নির্যাতিত নারী আমার কাছে আবেদন জানান। দেশে গিয়ে তাঁদের যেন মুক্ত করে নিয়ে যাই।’
রাবেয়া বারবার এর কাছে জোর দিয়ে একটা কথা বলেন যে, ‘অইখানে বন্দিশালাই থাকা মেয়েগুলারে মুক্ত করে আনার ব্যবস্থা করেন। যৌন নির্যাতন তো চলেই, তাঁর উপর ঠিকমতো খাইতে দেয়না। তাদের বাঁচান।‘
সাবেক ইউপি সদস্য ও আদম ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলামের মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘আমার চাপেই বিএ অ্যাসোসিয়েট ওই নারীকে ওই দেশ থেকে ফিরিয়ে আনে। আর দেশে ফিরে যা বলছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আসলে হইলো অইখানে গিয়ে এই মহিলা ভয় পেয়ে যায়, তাই দেশে ফিরতে চেয়েছে।‘
রাবেয়ার বড় মেয়ে দশম শ্রেণির ছাত্রী বলে, ‘মায়ের ফোন পাইতেই আমি সাইফুল কাকারে নিয়ে ৪০/১ নয়াপল্টনের এ আর খান ট্রেড সেন্টারের বিএ অ্যাসোসিয়েট নামের ট্রাভেল এজেন্সিতে গিয়ে আমার মাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করি। ওই অ্যাসিয়েটের মালিক হাজি আহমেদ আনসারী আমার মাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন।‘
ঢাকার নয়াপল্টনের ওই বিএ অ্যাসোসিয়েটের একটি ভিজিটিং কার্ডের একটি নম্বরে ফোন করলে আহমেদ আনসারী বলেন, ‘ওই নারীকে (রাবেয়া আক্তার) আমরাই টাকা-পয়সা খরচ করে দেশে ফিরিয়ে এনেছি। দেশে ফিরে ওই নারী যা বলছেন, তা ডাহা মিথ্যা।’
সখীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত ডিউটি অফিসার ইমরান হোসেন বলেন, ওই নির্যাতিত পরিবারের পক্ষে কেউ মামলা করলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
‘সৌদি আরবে অনেক আশা নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। দেশে স্বজনদের কাছে অনেক টাকা পাঠাবেন। সংসারে সচ্ছলতা ফিরবে। আসবে সুদিন। বাস্তবে সে গুড়ে বালি। মাত্র এক মাসের মধ্যে একবুক যন্ত্রণা, কষ্ট আর বঞ্চনা নিয়ে ফিরতে হয়েছে তাঁকে। বলে নিজের হতাশা আর সৌদিতে বন্দিদশায় থাকা নরকীয় নির্যাতনের কথা বলেন রাবেয়া।




