215979

বিশ্বনবি পবিত্র মেরাজে প্রথম আসমানে যা দেখেছিলেন









নিউজ ডেস্ক।। মেরাজের মূল ঘটনা মোটামুটি সকলের জানা বিষয়। নবুওয়তের দ্বাদশ বছরের একটি শুভ মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গভীর রাতে তার বাসভবন থেকে মসজিদুল হারামে নিয়ে যান।

মসজিদে হারাম থেকে বোরাক নামক বাহনে করে প্রিয়নবিকে নিয়ে যাওয়া হয় মসজিদে আকসায়। সেখানে তার ইমামতিতে সব আম্বিয়ায়ে কেরামের নামাজ আদায়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করা হলো, তিনি সর্বশেষ ও শ্রেষ্ঠ নবি এবং সব নবির নেতা। আল্লাহ তাআলা হজরত জিবরিল আলাইহিস সালামকে এ সফরের যাবতীয় ব্যবস্থাপনায় নিযুক্ত করেন।

পবিত্র মেরাজের এই সফরে হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে হজরত মুসা আলাইহি সালাম পর্যন্ত বিভিন্ন নবি-রাসুলদের সঙ্গেই সাক্ষাতের ব্যবস্থা হয়।

প্রথম আসমানে হজরত আদম আলাইহিস সালামের সঙ্গে সাক্ষাতের পর এখানে মানুষের দুনিয়ার জীবনের কৃতকর্মের ফলকে কিভাবে ভোগ করছে (ভবিষ্যতে করবে) প্রতীকীভাবে তা দেখানো হয়। সেখানে তিনি যা দেখতে পেলেন, তার কিছু বর্ণনা তুলে ধরা হলো-

প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখতে পেলেন আদম আলাহিস সালামকে ঘিরে আছে অনেক লোক। তিনি ডানে তাকালে হাসছেন আর বামে তাকালে কাঁদছেন। প্রিয়নবি এ সম্পর্কে জানতে চাইলে, বলা হলো এরা সবাই আদমের বংশধর। আদম আলাইহিস সালাম তাঁর নেক বংশধরদের দেখলে হাসতেন আর অসৎ বংশধরদের দেখলে কাঁদতেন। এরপর প্রিয়নবিকে বিস্তারিত দেখার জন্য সুযোগ করে দেয়া হয়। তিনে সেখানে যা দেখলেন; তা হলো-

> এক স্থানে তিনি দেখলেন, কিছু লোক ফসল কাটছে, যত কাটছে ততই বাড়ছে। জানতে চাইলেন এরা কারা? উত্তরে বলা হলো- এরা আল্লাহর পথে জিহাদকারী।

> এরপর দেখলেন কিছু লোকের মাথা পাথর মেরে চূর্ণ করা হচ্ছে। এদের পরিচয়ে বলা হলো- এরা সেসব লোক যাদের অনীহা ও অসন্তোষ তাদেরকে নামাজের জন্য উঠতে দিত না।

> এরপর তিনি এমন কিছু লোক দেখতে পেলেন যাদের কাপড়ের আগে-পিছে তালি দেয়া। আর তারা পশুর মতো ঘাস খাচ্ছে। এদের ব্যাপারে বলা হলো- এরা তাদের মালের জাকাত আদায় করত না, দান খয়রাতও করত না।




> এরপর তিনি এমন একজন লোক দেখলেন যে ব্যক্তি কাঠ জমা করে বোঝা হিসেবে উঠানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়া সত্ত্বেও আরো বেশি কাঠ তার বোঝার সাথে যোগ করছে। এই লোকটির পরিচয় জানা গেল যে, এ ব্যক্তিটির ওপর এতবেশি দায়িত্বের বোঝা ছিল যে, সে বহন করতে পারতো না। তা সত্ত্বেও বোঝা কমানোর পরিবর্তে আরো অতিরিক্ত দায়িত্বের বোঝা নিজের কাঁধে চাপিয়ে নিত।

> এর পরের দৃশ্যে তিনি দেখলেন, কিছু লোকের ঠোঁট ও জিহ্বা কাঁচি দিয়ে কাটা হচ্ছে। এরা ছিল কাণ্ডজ্ঞানহীন বক্তা। মুখে যা আসে তাই বলতো এবং সমাজে ফেতনা সৃষ্টি করতো।

তারপর এক স্থানে সামান্য ফাটল বিশিষ্ট একটি পাথর দেখা গেল। তার মধ্য থেকে একটা মোটাসোটা বলদ বেরিয়ে এলো। পরে এর মধ্যে ঢুকতে চেয়ে পারল না। এ ব্যাপারে বলা হলো, এটা হল এমন দায়িত্বহীন ব্যক্তির দৃষ্টান্ত, যে ফেতনা সৃষ্টি করার মতো উক্তি করে লজ্জিত হয়ে প্রতিকার করতে চায় কিন্তু পারে না।

 

> এক স্থানে দেখা গেল কিছু লোক তাদের নিজেদের গোশত কেটে কেটে খাচ্ছে। তারা হলো- যারা অন্যের বিরুদ্ধে মিথ্যা দোষারোপ ও কটূক্তি করতো।

> সেখানে এমন কিছু লোক ছিল, যাদের হাতের নখ ছিল তামার তৈরি। তাই দিয়ে তারা তাদের মুখ ও বুক আঁচড়াচ্ছিল। এদের পরিচয় হলো- এরা মানুষের পেছনে তাদের নিন্দা চর্চা করতো। তাদের সম্মানে আঘাত করতো।

> কিছু লোকের ঠোঁট দেখা গেল উটের ঠোঁটের মত এবং তারা আগুন খাচ্ছে। তাদের সম্পর্কে বলা হলো, এরা ইয়াতিমের মাল সম্পদ ভক্ষণ করতো।

> এরপর এমন কিছু লোককে দেখা গেল- যাদের পেট ছিল অসম্ভব বড় এবং বিষাক্ত সাপে পরিপূর্ণ। লোকজন তাদেরকে দলিত মথিত করে তাদের ওপর দিয়ে যাতায়াত করছে। কিন্তু তারা কিছু করতে পারছে না। তাদের পরিচয় হলো- এরা ছিল সুদখোর।

> এরপর এমন কিছু লোক দেখা গেল- যাদের এক পাশে রাখা ছিল ভালো গোশত; অপর পাশে রাখা ছিল পচা দুর্গন্ধযুক্ত গোশত। অথচ তারা ভালো গোশত রেখে পচা গোশত খাচ্ছিল। এরা ছিল ঐ সব লোক- যারা নিজেদের হালাল স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও অবৈধভাবে যৌন বাসনা চরিতার্থ করতো।

>সেখানে এমন কিছু স্ত্রীলোক দেখা গেল- যারা তাদের স্তনের সাহায্যে লটকে আছে। তাদের সম্পর্কে বলা হলো- এরা ছিল এমন স্ত্রীলোক, যারা তাদের স্বামীর ঔরসজাত নয় এমন সন্তানকেও স্বামীর ঔরসজাত হিসেবে দাবি করতো।

এ ছিল প্রথম আসমানে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে হজরত আদম আলাইহিস সালামের সাক্ষাতকালীন সময়ে আদম সন্তানদের অবস্থার নমুনা।




পবিত্র মেরাজের আগের ও পরের বছরগুলো ছিল প্রিয়নবির জন্য অত্যন্ত কষ্ট ও বেদনাদায়ক। ওই মূহূর্তে প্রিয়নবির জন্য মেরাজ সংঘটিত হওয়া ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আর ওই সময়ে সংঘটিত হওয়া এ মেরাজ ছিল প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে ঐতিহাসিক উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

গোটা বিশ্বলোকের সব কিছুর ওপর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিপতি আল্লাহ তাআলা। তার এই ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার কেউ নেই; অতএব তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে এই দ্বীনের বিজয় ঠেকানোর সাধ্য কারো নেই; প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর অনুসারিদের মাঝে এই আস্থা, এই বিশ্বাস মজবুত ও সুদৃঢ় করাই ছিল মেরাজের মূল লক্ষ্য।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে মেরাজের শিক্ষা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করার তাওফিক দান করুন। কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ad

পাঠকের মতামত