‘হাত নেই, খেয়ে আর কী হবে’
![]()
![]()
![]()
![]()
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বেপরোয়া দুই বাসের রেষারেষিতে ডান হাত হারানো তিতুমীর কলেজের স্নাতকের ছাত্র রাজীব হোসেন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কারোর সাথে কথা বলছেন না। খাবারও খাচ্ছেন না। মুখের সামনে খাবার নিলেই রেগে গিয়ে বার বার বলছেন, ‘আমি খাবো না, খেয়ে আর কী হবে?’
পরিবারের সদস্যরা বলছেন, রাজীবের ডান হাত নেই, এটি সে এতোদিন বুঝতে পারেনি। এখন বুঝতে পারায় অভিমান নিয়ে চুপচাপ শুয়ে থাকছে। কারো সাথে কথা বলছে না, কিছু খাচ্ছে না।
রাজীবের খালা জাহানারা বেগম বলেন, ঘটনার পর প্রথম কয়দিন রাজীব চোখই খুলতে পারতো না। দুইদিন ধরে সে চোখ খুলে দেখছে। প্রথম প্রথম সে বার বার বলতো আমার ডান হাত সোজা করে দাও। এখন সে বুঝে গেছে ওর হাত নেই।
তিনি বলেন, হাত নেই বোঝার পর থেকেই একদম চুপচাপ হয়ে গেছে রাজীব। কারো সাথে কথা বলছে না। কিচ্ছু খাচ্ছে না। খাবার মুখের সামনে নিলেই রেগে যাচ্ছে। চিৎকার করে বলছে- ‘আমি খাবো না, এখন আর খেয়ে কি হবে।’
জাহানারা বলেন, চিকিৎসকরা ওকে জুস আর সুপ খাওয়াতে বলেছে। কিন্তু রাত থেকে যতবারই খাওয়ানোর চেষ্টা করেছি সে খায়নি। ও এখন কারো সাথে কথা বলা তো দূরে থাক, অনেক সময় কাউকে চিনতেই পারছে না।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের অর্থোপেডিকস বিভাগের প্রধান শামসুজ্জামান শাহীন বলেন, রাজীবের শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে ভাল। তবে সে খেতে চাইছে না। ঠিক মতো খাওয়া-দাওয়া করলে তার অবস্থার আরেকটু উন্নতি হতো।
তিনি বলেন, রোববার আবারো রাজীবের আরেক দফা সিটিস্ক্যান করানো হবে। সেই রিপোর্ট পাওয়ার পরই তার শারীরিক অবস্থার কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে তা বোঝা যাবে।
এর আগে ডা. শামসুজ্জামান জানিয়েছিলেন, দুর্ঘটনায় রাজীব হাত হারিয়েছে। তার মাথায়ও আঘাত লেগেছে। ব্রেনের সামনের অংশে রক্ত ও পানি জমে গেছে। মাথার সামনে ও পেছনের খুলিতেও আঘাত লেগেছে। তাই তার অবস্থা শঙ্কামুক্ত বলা যাচ্ছে না।
তিনি আরো জানান, রাজীবকে হাই-কেয়ারের জন্য আইসিইউতে রাখা হয়েছে। তার অপারেশনের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু আপাতত আমরা সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে যাচ্ছি না।
প্রসঙ্গত, ৩ এপ্রিল বিআরটিসির একটি দোতলা বাসের পেছনের ফটকে দাঁড়িয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন মহাখালীর সরকারি তিতুমীর কলেজের স্নাতকের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাজীব হোসেন। বাসটি হোটেল সোনারগাঁওয়ের বিপরীতে পান্থকুঞ্জ পার্কের সামনে পৌঁছালে হঠাৎ করে পেছন থেকে স্বজন পরিবহনের একটি বাস ওভারটেক করে।
সেসময় বিআরটিসির দোতলা বাসটির পেছনের ফটকে দাঁড়িয়ে থাকা রাজীবের ডান হাতটি বাইরের দিকে সামান্য বেরিয়েছিল। স্বজন পরিবহনের বাসটি বিআরটিসি বাসের গা ঘেঁষে পেরিয়ে যাওয়ার সময় রাজীবের হাতটি কাটা পড়ে। তাকে দ্রুত পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকেরা চেষ্টা করেও বিচ্ছিন্ন সে হাতটি রাজীবের শরীরে আর জোড়া লাগাতে পারেননি। পরে তাকে বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়।
ঢাকায় রাজীব হোসেন যাত্রাবাড়ীর মীর হাজিরবাগের একটি মেসে থাকতেন। পড়াশোনা চালাচ্ছিলেন স্বজনদের সহযোগিতায়। রাজীবের মা-বাবা অনেক আগেই মারা গেছেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে রাজীব সবার বড়। বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফলের দাসপাড়ায়। রাজীব টিউশনি করতেন এবং চাচা, খালাসহ সবার সহযোগিতায় পড়াশোনা চালিয়ে নিচ্ছিলেন।




