‘আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠিয়েও বাঁচানো যায়নি বিউটিকে’
নিউজ ডেস্ক।।
‘আমার মেয়েটাকে শান্তি দেয়নি বাবুল। হাইস্কুলে ভর্তি করার পর থেকেই তাকে রাস্তাঘাটে বিরক্ত করতো। তার জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে মেয়ের স্কুল যাওয়া বন্ধ করিয়ে দেই। বাড়িতে আটকে রেখেও তাকে বাঁচাতে পারলাম না।’
সিলেটের আঞ্চলিক ভাষার সাথে হবিগঞ্জের বিশেষ উচ্চারণ মিশিয়ে মঙ্গলবার বিকালে কথাগুলো বললেন হুসনা বেগম। যতোটা না বললেন তারচেয়ে বেশি কাঁদলেন। কান্নার জন্য অনেক কথাই বোঝা গেলো না। অনেক কথা হারিয়ে গেলো। হুসনা বেগমে মেয়ের নাম বিউটি আক্তার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে এই নামটি এখন অনেকেরই জানা।
হবিগঞ্জের ধানক্ষেতে কিশোরী বিউটি আক্তারের মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা মরদেহের ছবি নিয়ে দুদিন ধরে তোলপাড় চলছে। গত ১৭ মার্চ সকাল সাড়ে ১১টার দিকে হবিগঞ্জের ব্রাহ্মনডুরা ইউনিয়নের পূবগাও গাতা পাড়ে এক কিশোরীর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। তারা পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ এসে উদ্ধার করে নিয়ে যায় মরদেহ।
পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিহত কিশোরীর নাম বিউটি আক্তার। ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ ফেলে রাখা হয়েছে ধানক্ষেতে।হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ব্রাহ্মণডুরা ইউনিয়নের মোজাহের উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণীর ছাত্রী ছিল বিউটি। বয়স মাত্রই ১৪। স্কুলে আসা যাওয়ার সময় প্রায় প্রতিদিনই বিউটিকে উত্যক্ত করত বাবুল। সেকারণে বাবা শাহেদ আলী ও মা হুসনা বেগম বিউটির স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেন।
বাবুল স্থানী ইউপি সদস্য কলম চান বিবির ছেলে। একই এলাকায় বাড়ি। বখাটে হিসেবেই এলাকায় পরিচিত। হত্যার আগে আরেকবার বিউটিকে অপহরণ করে বাবুল। ১৮ দিন আটকে রাখে। এ ঘটনায় বিউটির বাবা বাদী হয়ে বাবুলকে আসামি করে মামলা করেন। কিন্ত পুলিশ তাকে ধরতে পারেনি। উপরš‘ মামলা প্রত্যাহারের চাপ দিতে থাকে। বাধ্য হয়ে বিউটিকে আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন বাবা-মা। তাতেও কোনো লাভ হয়নি। আত্মীয়ের বাড়ি থেকে তুলে নিয়েই বিউটিকে খুন করা হয়।
কান্না থামিয়ে আবার বলতে শুরু করেন হুসনা বেগম- ‘স্কুল বন্ধ করে দেয়ায় বাবুল তাকে রাস্থাঘাটে না পেয়ে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। সংসার চালানোর জন্য আমি আরএফএল কোম্পানিতে কাজ করি। আমার স্বামীও কাজের জন্য বাইরে থাকেন। ৮ ও ৬ বছরের আরো ২টি মেয়ে আছে আমার। তাদের খালি বাড়িতে রেখেই আমরা প্রতিদিন কাজে যাই। এই সুযোগে ২১ জানুয়ারি বাবুল তার সঙ্গীদের সাথে নিয়ে আমার মেয়েকে জোর করে ঘর থেকে তুলে নিয়ে যায়। ১৮ দিন আটকে রেখে মেয়েকে নির্যাতন করে বাবুল। সেসময় অনেক খোঁজাখোজি করেও মেয়েকে পাইনি। ১৮ দিন পরে ওলিপুর থেকে বিউটি উদ্ধার করি আমরা।
বলতে থাকেন হুসনা বেগম-‘ মেয়েকে বাড়িতে এনে আমরা এলাকার মুরব্বিদের জানাই। মামলা করি। এরপর গ্রামের মুরব্বিদের নিয়ে শালিসে বসা হয়। শালিসে বিউটি সবার সামনে বাবুল কিভাবে তাকে নির্যাতন করেছে তা জানায়। তখন বিউটিকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয় বাবুলকে। কিš‘ বাবুল ও তার মা এতে আপত্তি জানায়। বিয়ে না করার জন্যই বাবুল পরিকল্পিতভাবে আমার মেয়েকে হত্যা করেছে।
বিউটির মা বলেন, বিয়েতে বাবুলের আপত্তির কারণে সেদিনের শালিশের কোন সমাধান হয়নি। অপরদিকে বাবুল মামলা তুলে নেয়ার জন্য হুমকি দেয়া শুর“ করে। বাবুলের ভয়ে বিউটিকে আমরা তার নানার বাড়ি গুনিপুর পাঠিয়ে দেই।’
শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে নিয়ে হুসনা বেগম বলেন, ‘গুনিপুরে বাবুলের খালাত ভাই আনোয়ার আলীর শ্বশুর বাড়ি আছে। সেই সূত্র ধরেই গত ১৬ মার্চ বাবুল তার খালাত ভাইর সহযোগিতায় গুনিপুর থেকে আবারো বিউটিকে অপহরণ করে। আমরা অনেক খোঁজার পরও বিউটির কোন সন্ধান পাইনি। পরেরদিন সকালে খবর পাই পূবগাও গাতা পাড়ে কার লাশ পরে আছে। ওইখানে গিয়ে দেখি ওই লাশ আমার মেয়ের।’ বিউটির মা বলেন, ‘পুরি (মেয়ে) গেছে, পুরিতো (মেয়েকে) আর পাইতাম না কিন্তু বিচার ত পাইতাম।’হুসনা বেগমের আরো দুটি মেয়ে আছে। তারা যেন শান্তিতে বাঁচতে পারে সেজন্য হলেও বিউটি হত্যার সঠিক বিচার প্রার্থণা করেন তিনি।
এ ব্যাপারে শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওস আনিছুর রহমান বলেন, এই মামলায় গত ১৫ মার্চ আমরা বাবুলের মা কলম চান বিবি (আবুনি) এবং তার বন্ধু ইসমাইল হোনেসকে গ্রেপ্তার করেছি। বাবুল পলাতক রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।তিনি বলেন, বিউটিকে অপহরণের অভিযোগে আগে মামলা হলেও এলাকাবাসী শালিসের দায়িত্ব নেওয়ায় প্রথমদিকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হয়নি। উৎস: আমাদেরসময়.কম।




