দেওয়ালে পিঠ ঠেকলেই এখন ফনা তোলেন মুশফিকরা!
কি মারটাই না খেল বাংলাদেশের অনভিজ্ঞ বোলিং লাইন আপ। তাতে শ্রীলঙ্কার ইনিংসশেষে মনে হলো, ম্যাচটা হেরেই গেছে বাংলাদেশ। আগে যে ১৬৪ এর বেশি তাড়া করে জেতার রেকর্ড নেই! আর টি-টুয়েন্টিতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটি ১৯৩ রানের। তার মানে, ২০ ওভারে ক্রিকেটে আগের ৭২ ম্যাচে টাইগারদের তো ২০০ করার অভিজ্ঞতাই নেই। কিন্তু কে জানতো বোলারদের অনভিজ্ঞতাই ব্যাটসম্যানদের সামর্থ্যের প্রকাশ ঘটাবে এমন দুর্ধষভাবে! সেই প্রকাশে নিদাহাস ট্রফিতে লঙ্কান সিংহ বধ হলো বাঘদের প্রবল থাবায়। শনিবার রাতে। আর টুর্নামেন্টের ফাইনালে খেলার আশাটা বেঁচে রইল মুশফিকুর রহীমের তরবারী হয়ে ওঠা ব্যাটে।
বিস্ময়কর। অবিশ্বাস্য। দুর্ধর্ষ। এমন যতো বিশেষণ দিন বাংলাদেশের ৫ উইকেটের জয়টা ঠিক বোঝানো যাবে না। বোঝানো যাবে না টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটে টাইগারদের নতুন সূর্য ওঠানো দিনটাকে। কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে ১০ মার্চ যে সূর্য উঠেছে বাংলাদেশের সময় রাত ১২টায় পা রাখার সামান্য আগে। মুশফিক যেখানে ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় ৩৫ বলে ৫ বাউন্ডারি ও ৪ ছক্কায় ৭২ রানে অপরাজিত থেকে। ২১৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করে বাংলাদেশ ২ বল হাতে রেখেই ৫ উইকেটে করে ফেলে ২১৫। মুশফিক আবার মনে করিয়ে দিয়ে গেলেন ম্যাচের পর পুরস্কার নিতে এসে, তার ছেলেটির বয়সও কাকতালীয়ভাবে ৩৫ দিন! ঠিক ৩৫ বলেই যে খেলা তার স্মরণীয় ইনিংসটা!
মাশরাফী বিন মোর্ত্তজাকে টি-টুয়েন্টির নেতৃত্ব থেকে বাদ দিতে গিয়ে নিজেদের কি সর্বনাশটাই না করেছে টাইগাররা! টি-টুয়েন্টিতে পেস আক্রমণ বলে কি থাকলো? তাসকিন আহমেদকে ডেকে আনতে হলো বাদ দেওয়ার পরও। সাকিব আল হাসান ইনজুরিতে নেই। সর্বনাশের ষোলকলা পূর্ণ ওখানেই। তাসকিন ৩ ওভারে দেন ৪০, ৩ উইকেট পেলেও ৪ ওভারে মোস্তাফিজুর রহমান খরচ করেন ৪৮। রুবেল হোসেনের বয়স বাড়ে তিনি মাঝেসাঝে বাড়েন না। ৪ ওভারে তাই ৪৫। মেহেদী হাসান মিরাজ বয়সের হিসেবে কমই রান দিলেন। ৪ ওভারে ৩১। নবীন নাজমুল ইসলাম অপু ২ ওভারে ২০ দিয়ে আর সুযোগ পান না।
ম্যাচের পর টাইগারদের সেরা টেক্কা মুশফিক আক্ষেপ করেননি। এমন দিনে আক্ষেপ মানায় না। তবে বলেছেন, রানটা একটু বেশি দিয়ে ফেলেছিলেন তারা। তার ভাষায়, ‘ব্যাটিং উইকেট ঠিক আছে। কিন্তু আমরা একটু বেশি রান দিয়েছি। ১৯০ এর মতো দিলে হয়তো ঠিক ছিল। ওটা তাড়া করার মতো।’
কিন্তু স্বাগতিক লঙ্কানরা ৬ উইকেটে করেছিল ২১৪। তার মানে, মুশফিকের হিসেবে পাক্কা ২৪টি রান বেশি দেওয়া হয়ে গেল! ২০ ওভারের ম্যাচে ২৪ রান বেশি দিতে হলে সেই দল জেতে না। কিন্তু এই ম্যাচ না জিতলে তো অস্তিত্বের সঙ্কট। আর অস্তিত্বের সঙ্কটে টাইগাররা বেশিরভাগ সময় প্রবল হুঙ্কারে ঝাঁপিয়ে পড়তে জানে। ইতিহাসের পাতায় পাতায় তার অনেক প্রমাণ। নতুন প্রমাণ, রেকর্ড গড়ে জয়। আজকাল তারা ফনা তুলছে!
ভারতের কাছে প্রথম ম্যাচ হারতে হয়েছে। এটাও হারলে ১৮ মার্চের ফাইনালে খেলার আশা প্রয় থাকে না বলতে গেলে। এখন থাকল। ভারত-শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ, সব দলেরই এখন একটি করে জয় নিদাহাস ট্রফিতে। কেউ এগিয়ে নয়, কেউ নয় পিছিয়ে। সমানে লড়ার যোগ্যতা রাখে মাহমুদউল্লাহর দল। তারাও সমান দাবিদার অসাধারণ এক জয়ে।
আর এই একটি জয়ই তো আসলে ট্র্যাকে ফেরার জন্য খুব দরকারী হয়ে গিয়েছিল। যে জয়ের ভিত্তি বাংলাদেশের কৌশল পরিবর্তনে। মুশফিকের মতে, তামিম গোটা ছয়েক ওভারে তামিম ইকবাল ও লিটন কুমার দাস যা করে গেছেন সেটাই তাদের জয় তুলে নেওয়ার বিশ্বাস জুগিয়েছে। সৌম্য সরকার ব্যর্থতার ঘুর্ণিপাকে। তাই লিটনকে তামিমের সঙ্গী করে পাঠানো হয়েছিল ওপেনিংয়ে। দুর্দান্ত মার দিলেন লিটন। তামিম তো তারই মতো। ৫.৫ ওভারে বাংলাদেশের ৭৭! লিটন ১৯ বলে ৫ ছক্কা ও ২ চারে নিজের সামর্থ্যটা প্রমাণ করে যান ৪৩ রানে। ২৯ বলে ৬ চার ও ১ ছক্কায় তামিমের অবদান ৪৭। সৌম্য মনে হচ্ছিল খেলাটা নষ্ট করে দিয়ে গেলেন বাজে আউটে! ২৪ রান দিয়েছেন যদিও। কিন্তু মাহমুদউল্লাহ এসে ১৮ রানের এক ওভার বানালেন। আর মুশফিক তো ছিলেনই। তালগোল পাকাতে পাকাতেও শেষ পর্যন্ত তার ব্যাটেই বীরোচিত জয়।
সাব্বির রহমান এবং মিরাজের নামের পাশে শূন্য থাকলেও তাই বাংলাদেশের সমস্যা হয় না। ১৯৭ থেকে ২১৫, মুশফিকের ফনা তোলা ব্যাটে মাইলস্টোনের এক জয় পেরিয়ে নোঙ্গর করে বাংলাদেশ। যে জয়ে আত্মবিশ্বাস ফিনকি দিয়ে ছোটে। আর শেষ শটটা নিয়ে রান নিতে দৌড়াতে দৌড়াতে স্বভাবজাত উল্লাস করেন। নন স্ট্রাইকিং এন্ড পেরিয়ে সটান দাঁড়িয়ে কোবরার মতো ফনা তোলেন। নাজমুল অপুর উইকেট শিকারের যে উল্লাসের ধরন হালে বাংলাদেশ দলের ট্রেডমার্ক। আর মুশফিক তো ঠিকই দেখালেন। সাপ হয়ে বাঘ ছোবল দিল এমন যেটিতে সর্বাঙ্গ নীল লঙ্কানদের। স্টেডিয়ামের ইতিহাসের সর্বোচ্চ রান করেও স্বাগতিকদের জিততে না দেখে শেষে যে শোকে মুহ্যমান মাঠে ছিল মৃত্যুর নিরাবতা। যে নিরাবতা চিরে কেবল ভেসে আসছিল টাইগারদেরই গর্জন। নাকি ছোবলের আগে ও পরের ‘শশশশশশশ’ শব্দ!




