শ্রীদেবীর ময়নাতদন্ত যেভাবে দেখানো হয়েছে ভারতীয় গণমাধ্যমে!
খবরের কাটতি বাড়াতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর দৌড়ঝাঁপ চোখে পড়ার মতো। টিআরপি শিকারে তারা এমন অনেক কাণ্ড করে বসে, যা অনেক সময় বিস্ময়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমনটা হয়েছ সদ্য প্রয়াত ভারতীয় অভিনেত্রী শ্রীদেবীর ক্ষেত্রে। এই তারকার মৃত্যুর পর চিকিৎসকরা তাৎক্ষণিকভাবে জানান, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তিনি। কিন্তু ময়নাতদন্তের পরে জানা যায়, অচেতন অবস্থায় বাথটাবের পানিতে ডুবে মৃত্যু হয় জনপ্রিয় এই অভিনেত্রীর।দুবাই পুলিশের ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়ার আগেই, শ্রীদেবীর ময়নাতদন্তে মাঠে নামে ভারতের গণমাধ্যমগুলো। কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র ছাড়াই মৃত্যুর বিভিন্ন কারণ নিয়ে বিশ্লেষণ শুরু করে তারা। অনেক জায়গায় তো শ্রীদেবীর ছবি বাথটাবের পানির ভেতরে এডিটিং-এর মাধ্যমে দেখিয়ে তুলে ধরা হয়েছে কাল্পনিক এক চিত্র। অনেক উপস্থাপক বাথটাবের মধ্যে শুয়েই করেছেন উপস্থাপনা।
গণমাধ্যমগুলোর এমন কর্মকাণ্ডে শ্রীদেবীর প্রতি অশ্রদ্ধা দেখানো হয়েছে বলে চটেছেন ভারতের মিডিয়া পাড়ার অনেকেই। তাদের অভিযোগ— যে শ্রীদেবী সারা জীবন ভারতের জন্য শুধু দিয়েই গেছেন, মৃত্যুর পর তাকে সরাসরি অসম্মান করেছে গণমাধ্যমগুলো। শ্রীদেবীর মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে সংবাদ পরিবেশনে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো পাঁচ কারণে ব্যর্থ বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন।
১. মূল ঘটনাগুলোর জন্য অপেক্ষা করেনি গণমাধ্যমগুলোপ্রথমে খবর আসে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে শ্রীদেবী মারা গেছেন। এ সময় ভারতের টিভি চ্যানেলগুলো প্রয়াত অভিনেত্রীর স্বাস্থ্যের অবস্থা সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা শুরু করে। ডায়েট পিল সেবন, ওজন কমানোর সার্জারির কারণে এমনটি হয়ে থাকতে পারে বলে ফলাও করে প্রচার করা হয়। এসব সংবাদ প্রকাশের আগে গণমাধ্যমগুলোকে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত ছিল। কিন্তু তা তারা করেনি। পরে ময়নাতদন্ত রিপোর্টে দেখা যায়- জ্ঞান হারিয়ে বাথটাবের পানিতে ডুবে মারা গেছেন শ্রীদেবী। টিভি চ্যানেলগুলোর এমন সংবাদ পরিবেশন প্রয়াত অভিনেত্রীর জন্য শুধু অসম্মানজনক ছিল না, এটি গণমাধ্যম নীতির পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে।

২. মৃত্যুর স্থানগুলো অতিরঞ্জিত করে দেখানোঘটনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না তো কি হয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো বাথটাবের সঙ্গে অভিনেত্রীর ছবি জুড়িয়ে এর এক আবহ তৈরি করতে ছাড়েনি। কিছু কিছু চ্যানেল বাথটাবের পানিতে শ্রীদেবী পড়ে আছেন এমন ছবি দিয়েও সংবাদ পরিবেশন করে। কোনো গণমাধ্যম আবার ‘বাথরুমে শ্রীদেবীর ১৫ মিনিট’—এমন সংবাদও পরিবেশন করে।
৩. বনি কাপুরকে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মিডিয়াগুলো হতাশমৃতদেহ যে আগে দেখবে তাকে পুলিশের জেরার মুখোমুখি হতে হবে এটাই স্বাভাবিক। একই কাজ দুবাই পুলিশও করেছে। তারা বনি কাপুরকে জেরা করেন। কিন্তু এই সংবাদটি টিভি চ্যানেলগুলো প্রকাশ করে বেশ বাড়াবাড়ি করে। তাদের খবরে বলা হয়, পুলিশ বনি কাপুরকে একটানা ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা জেরা করেছে। এমনকি তিনি নাকি সারা রাত পুলিশ স্টেশনে ছিলেন। পুলিশ বনি কাপুরকে লুকিয়ে রেখেছে বলেও খবর বের হয়।
৪. অ্যালকোহল কাণ্ডপ্রথম ফরেনসিক রিপোর্টে বলা হয়, হোটেলে বাথটাবের পানিতে ডুবে মৃত্যু হয় শ্রীদেবীর। বলা হয়, তার শরীরে অ্যালকোহল পাওয়া গেছে। এই খবর পাওয়া মাত্রই টিভি চ্যানেলগুলোর প্রকাশ করে, মারা যাওয়ার আগে অ্যালকোহল পান করেছিলেন অভিনেত্রী। এর পরই শ্রীদেবী নিয়মিত মদ্যপান করতেন কি না এ বিষয়গুলো উঠে আসে। একটি গণমাধ্যমে তো বাথটাবের পাশে মদের গ্লাস রেখে উপস্থাপনা করা হয়। পরে অবশ্য প্রমাণ পাওয়া যায়, তিনি কোনো দিনও মদ পান করেননি।
৫. অপ্রয়োজনীয় বিশ্লেষণশ্রীদেবীর মৃত্যুর পর অনেক সংবাদমাধ্যম মহাজ্ঞানীর মতো আচারণ করেছে। একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নৃত্যশিল্পী কীভাবে জ্ঞান হারিয়ে বাথটাবের পানিতে ডুবে গেলেন তা নিয়ে তোলা হয়েছে নানা প্রশ্ন। ভারতীয়রা বেশিরভাগই বাথটাবে গোসল করেন না, শ্রীদেবী কেন করলেন এমন নানা অপ্রয়োজনীয় প্রসঙ্গ তুলে ধরে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম।সদ্যপ্রয়াত শ্রীদেবীর মরদেহ গতকাল মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে মুম্বাই বিমানবন্দরে পৌঁছেছে। পরে অনিল অম্বানির চার্টাড বিমানের গ্রিন করিডর দিয়ে লোখন্ডওয়ালায় গ্রিন একর্সে নিয়ে যাওয়া হয় তার দেহ। মরদেহের সঙ্গে ফিরছেন বনি কাপুরসহ ১১ জন। পরিবারের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, আজ বুধবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ রাখা হবে লোখান্ডওয়ালা স্পোর্টস ক্লাব গার্ডেনে। দুপুর ২টায় ভিলে পার্লে শ্মশানের উদ্দেশে যাত্রা, সাড়ে ৩টায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হবে বলে শ্রীদেবীর।প্রয়াত এ অভিনেত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী, তার শেষ যাত্রার সবকিছু সাদায় সাজানো হয়েছে। ১৯৯১ সালে যশ চোপড়ার লমহে ছবির সময়ই শ্রীদেবী বলেছিলেন, সাদা রং তাঁর বড়ই প্রিয়! তাঁর শেষযাত্রায় সব কিছু মোড়া থাকবে সাদায়!




