188128

যে কারণে ইকোনমিস্টের কান্ট্রি অব দ্য ইয়ার হতে পারেনি বাংলাদেশ

লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয়। দ্রুত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। দরিদ্রতার পতন। অবিশ্বাস্য সব অর্জনের জন্য বৃটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের কান্ট্রি অব দ্য ইয়ার হতে পারতো বাংলাদেশ। ঠাঁই মিলেছিল একেবারে সংক্ষিপ্ত তালিকাতেও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হলো না।
বাংলাদেশ নয়, ফ্রান্সকেই কান্ট্রি অব দ্য ইয়ার
নির্বাচিত করেছে ইকোনমিস্ট। কেন বাংলাদেশ নয়- এর পেছনে দুটি কারণ উল্লেখ করেছে সাময়িকীটি। বলছে, বাংলাদেশ বেসামরিক নাগরিকদের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করেছে ও ইসলামিস্টদের লাগামবিহীনভাবে আতঙ্ক ছড়ানো বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সব প্রত্যাশার বাইরে গিয়ে একজন তরুণ সাবেক-ব্যাংক কর্মকর্তাকে নিজেদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করে দ্য ইকোনমিস্টের ‘কান্ট্রি অব দ্য ইয়ার’ খেতাব ছিনিয়ে নিয়েছে ফ্রান্স। তবে প্রতিযোগিতায় প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ হিসেবে ছিল বাংলাদেশ, আর্জেন্টিনা ও দক্ষিণ কোরিয়া। কিন্তু নানা কারণে কান্ট্রি অব দ্য ইয়ারের সম্মান জোটেনি কোনোটির ভাগ্যেই। উল্লেখ্য, ইকোনমিস্ট ২০১৩ সাল থেকে প্রতিবছর একটি দেশকে ‘কান্ট্রি অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে নির্বাচিত করে আসছে। ‘কান্ট্রি অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে নির্বাচন করার সময় ইকোনমিস্ট এক বছরে লক্ষণীয় পরিবর্তন এনেছে বা বিশ্বকে আরো আলোকিত করেছে এমন দেশগুলো বিবেচনা করে থাকে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালে স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রের দিকে ধাবিত হওয়ায় ‘কান্ট্রি অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল মিয়ানমার। তবে ইকোনমিস্ট বলেছে, তাদের সেই সিদ্ধান্ত্ত ভুল ছিল। কেননা, তখনই রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে নির্যাতিত হচ্ছিল। তবে বছর দু’য়েকের ব্যবধানে নির্যাতনের পরিমাণ অস্বাভাবিক পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। ইকোনমিস্ট কর্তৃপক্ষ এই আচানক পরিবর্তন অনুমান করতে ব্যর্থ হয়েছিল। পরিপ্রেক্ষিতে এই বছর, ৬ লাখের বেশি রোহিঙ্গা মিয়ানমারের নির্যাতন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। তাদের সবাইকে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি দেশটি বেশ দ্রুত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি লাভ করেছে। উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে এনেছে দারিদ্র্যতা। এসবের জন্য বাংলাদেশকে কান্ট্রি অব দ্য ইয়ার ঘোষণা করাই যেতো। তবে বেসামরিক নাগরিকদের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করা ও ইসলামিস্টদের লাগামবিহীনভাবে আতঙ্ক ছড়ানো থামাতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে কান্ট্রি অব দ্য ইয়ারের সম্মানে ভূষিত হয়নি বাংলাদেশ।

কান্ট্রি অব দ্য ইয়ারের জন্য নির্বাচিত হতে পারতো এমন অপর এক প্রার্থীদেশ হচ্ছে আর্জেন্টিনা। সেখানে কির্চনার পরিবার কয়েক বছর ধরে অপব্যয়িতার পর প্রেসিডেন্ট মরিসিও মার্সি আর্জেন্টিনার আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে বেশ কষ্টসাধ্য সংস্করণ করছেন। ডিসেম্বরে দেশটিতে সহিংস প্রতিবাদ হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশটিতে নিশ্চিতভাবেই উন্নতি ঘটছে।

কান্ট্রি অব দ্য ইয়ারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ফ্রান্সের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য এই বছর বেশ অসাধারণ কেটেছে বলা যায়। দেশটি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক হামলার হুমকি শান্ত ও মাধুর্য আচরণের সঙ্গে সহ্য করে গেছে। বিশাল বিক্ষোভ ও দুর্নীতি তদন্তে অভিশংসিত হয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট পার্ক গুয়েন-হাই। তার উত্তরসূরী মুন-জায়ে ইন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নিয়ে পুনরায় আলোচনা করার প্রস্তাব নরম স্বরে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

দেশটির সবচেয়ে বড় কংগ্লোমেরাট স্যামসাংয়ের কার্যত মালিক ও ভাইস-চেয়ারম্যান লি জায়ে-ইয়ং দুর্নীতি মামলায় কারাদণ্ড পেয়েছেন। সব মিলিয়ে, প্রতিনিয়ত পারমাণবিক হামলার হুমকির নিচে থাকার পরেও দক্ষিণ কোরিয়া তাদের দেশীয় রাজনীতি থেকে সমস্যা অনেকটাই দূর করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যান্য বছর কান্ট্রি অব দ্য ইয়ার হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিল। তবে এ বছর সব প্রত্যাশার সীমা ছাড়িয়েছে।

ফ্রান্সের জনগণ নিজেদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করেছে এমান্যুয়েল ম্যাক্রন নামের তরুণ সাবেক এক ব্যাংক কর্মকর্তাকে। ঐতিহ্যবাহী কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থন ছাড়াই ফ্রান্সের সবচেয়ে কমবয়সী প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ম্যাক্রন। তারপর, রাজনৈতিকভাবে একেবারে সদ্য দীক্ষিত নেতা-নেত্রী নিয়ে তার দল লা রিপাবলিক এন মার্চে পুরনো সব বাধা ভেঙে ন্যাশনাল এসেম্বলিতে সবচেয়ে বেশি আসন জেতে।

এটা কোনো সাধারণ জয় ছিল না। যারা ভাবে যে, উন্মুক্ত ও বন্ধের বিভক্ত পুরনো ডান-বাম বিভক্তের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাদের আশা জুগিয়েছে এই জয়। ম্যাক্রন এমন একটি ফ্রান্সের প্রচারণা চালিয়েছে যেই ফ্রান্স- বিদেশি মানুষ, পণ্য ও চিন্তাধারা ও নিজদেশে সামাজিক পরিবর্তনকে স্বাগতম জানায়। ছয় মাসের মধ্যে তিনি ও তার দল বেশ কয়েকটি যৌক্তিক সংশোধন এনেছে। সেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, একটি দুর্নীতি-বিরোধী বিল ও ফ্রান্সের কঠোর শ্রমনীতির স্খলন। প্রতিবেদনে বলা হয়, সমালোচকরা ম্যাক্রনের আচরণ নিয়ে উপহাস করেন।

তাদের মতে ম্যাক্রনের সংস্কার আরো অনেক দূর যেতে পারতো। এটা সত্য। তবে তারা হয়তো ভুলে গেছেন যে, ম্যাক্রন প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে ফ্রান্স কী রকম ছিল! ম্যাক্রন ফ্রান্সবাসীকে পরিবর্তন আনার ও বিদেশিদের প্রতি ভয় নিয়ে থাকার মধ্য থেকে বেছে নেয়ার সুযোগ দিয়েছেন। ফ্রান্স, পরিবর্তন-বিরোধীদের সামনা-সামনি মোকাবিলা করেছে আর পরাজিত করেছে। আর সেজন্যই নির্বাচিত হয়েছে এই বছরের কান্ট্রি অফ দ্য ইয়ার।

ad

পাঠকের মতামত