‘আমরা কেউ ভাত আনি নাই, দেহেন টিফিন কেরিয়ার নাই’ (ভিডিও)
ইতোমধ্যে খবর পৌঁছে গেছে। কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। তারপরও শ্রমিকেরা আসছেন। কাঁদছেন, শোকটা হালকা করছেন, যেন পিতা হারানোর বেদনা ভোলার চেষ্টা। শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হকের মালিকানাধীন মোহাম্মদি গ্রুপের পোশাক কারখানায় গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। কারখানার গেটে ঠাঁই দাঁড়িয়ে অপারেটর গোলাম সরোয়ার। কাছে গিয়ে আনিসুল হকের নাম মুখে আনতেই তার বোবা কান্না ফেটে পড়ল। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। অঝোরে বলে চললেন, ‘আমার ফ্যাক্টরির ফাদার মারা গেছে, আমরা পিতা হারিয়েছি। আমাদের অভিভাবক আর নেই।’
.
গোলাম সরোয়ার ১১ বছর আছেন আনিসুল হকের পোশাক কারখানায়। তিনিই জানালেন, খিলক্ষেতের এই কারখানায় ২ হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করেন।
একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন মোহাম্মদি গ্রুপের মোহাম্মদি গার্মেন্টসের প্রহরী বেলায়েত হোসেন। পরিচয় দিতেই তিনি টেনে নিয়ে গেলে ভেতরে। এর মধ্যেই মন উজাড় করে বললেন মালিক আনিসুল হক সম্পর্কে।
বেলায়েতের ভাষ্যে, ‘আমার বাড়ি স্যারের গ্রামে। ১৩ বছর এই কারখানায় আছি। আর কোথাও যাওয়ার ইচ্ছা নেই। স্যারের সঙ্গে বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। স্যার আমাকে সব দিয়েছেন, বাবার আদর-স্নেহ, শাসন। এখন আমি কার কাছে আশ্রয় চাইব!’
পোশাক কারখানাটির ভেতরে সুনসান নিরবতা। সবগুলো মেশিন বন্ধ। আনিসুল হকের মৃত্যুর পরই মোহাম্মদি গ্রুপের বাকি প্রতিষ্ঠানের মত এই কারখানাটিতে দু’দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
জরুরি ডিউটিতে যারা আছেন, তারা কালো ব্যাচ নিয়েছেন। ছুটিতে থাকা কর্মীরাও আসছেন, ঘুরে-ফিরে কারখানা দেখছেন, তারাও কালো ব্যাচ পরে আছেন।
এসব শ্রমিকরাই জানালেন, আনিসুল হক ছিলেন দেশের অন্য প্রতিষ্ঠানের মালিকদের তুলনায় ব্যতিক্রম। তিনি সব সময় নিজের প্রতিষ্ঠান ভিন্ন এবং ব্যতিক্রমভাবে চালাতে চেয়েছেন। তার প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের কখনও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ক্ষোভ দেখানোর প্রয়োজন হয়নি।
সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে কারখানার সামনে একদল নারী শ্রমিক বিলাপ করতে লাগলেন। তাদের বেশিরভাগই মাঝ বয়সী।
১০ বছর ধরে আনিসুল হকের কারখানায় আছেন শেফালি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘আমি ঢাকায় ৩০ বছর ধইরা গার্মেন্টসে কাজ করি। কিন্তু, এইখানে আইসা আমার জীবন পাল্টাইয়া গ্যাছে।’
শেফালি জানান, মেয়র আনিসুল হকের সহযোগিতায় তিনি বড় ছেলে শামীমকে এমবিএ পাস করিয়েছেন। ছোট ছেলে লিংকন এসএসসিতে পড়ছে।
তার মতই শহরবানু আনিসুল হকের পোশাক কারখানায় ১২ বছর ধরে কাজ করছেন। তিনি পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘এই কারখানা অন্য সব কারখানা থেকে ব্যতিক্রম, সুযোগ-সুবিধা সব দিক দিয়া বেশি। নারী শ্রমিকদের জন্য আরও বেশি। আমাদের মাতৃকালীন ছুটি, চিকিৎসা সব নিশ্চিত করেছিলেন স্যার।’
রীনা নামের আরেক শ্রমিক জানান, এই কারখানায় কাজ নেওয়ার পরই আনিসুল হক তাকে সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করার স্বপ্ন দেখান। এরপর এজন্য সব সহযোগিতা করেছেন।
শ্রমিকরা আরও জানান, কারখানার শ্রমিকদের সন্তানদের কথা চিন্তা করে মেয়র আনিসুল হক কাছেই একটি স্কুল করে দিয়েছেন। উৎসাহী শ্রমিকেরা অনেকটা জোর করেই সেখানে নিয়ে গেলেন।
২০০৩ সালে মারা যান আনিসুল হকের ছোট ছেলে শারাফুল হক। তার নামেই স্কুল ‘শারাফের পাঠশালা’। আনিসুল হকের ইচ্ছে অনুযায়ী, বনানীতে এই ছেলের কবরের ওপরেই তাকে দাফন করা হবে।
শারাফের পাঠশালায় শিক্ষা সুবিধা পাচ্ছেন তার কারখানার শ্রমিকদের সন্তানেরা। শ্রমিকেরা জানান, এমন কোনো শ্রমিক নেই যিনি কোনো বিপদে পড়ে সহায়তা চেয়ে আনিসুল হকের কাছ থেকে পাননি! শুধু মেয়র বা নেতা নন আনিসুল হক, তিনি ছিলেন সত্যিকারের শ্রমিকবান্ধব মালিক।
শেফালি, শহরবানু, রীনার সঙ্গে আরও ৮/১০ শ্রমিক প্রায় সমস্বরে বললেন, ‘দেখেন ভাই, আজ আমরা ভাত আনি নাই। আমাদের সঙ্গে কোনো টিফিন কেরিয়ার নেই। সকালে শুনছি মালিক মারা গেছেন। যার উছিলায় আল্লাহর দেওয়া অন্নে আমরা পরিবার নিয়ে সুখে আছি। সেই বাবা সমতুল্য মালিক হারানোর পর যে, আমাগোর গলা দিয়া ভাত নামে না ভাই। এমন মালিক কী আমরা আর জীবনে পামু?’
উল্লেখ্য, লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা ২৩ মিনিটে মারা যান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক।
শনিবার বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে তার মরদেহ বহনকারী বিমান ঢাকায় অবতরণ করবে। এরপর দুপুর সাড়ে ১২টায় পরিবারের সদস্য ও বন্ধু-বান্ধবদের জন্য আনিসুল হককে তার বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হবে।
বিকেল তিনটায় আনিসুল হকের মরদেহ বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে সর্বসাধারণের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে। সেখানেই বাদ আছর নামাজে জানাজা শেষে তাকে বনানী কবরস্থানে ছোট ছেলে শারাফুল হকের কবরের ওপরে দাফন করা হবে। এখানেই চিরঘুমে শায়িত রয়েছেন আনিসুল হকে সবচেয়ে প্রেরণাদায়ী মা ও শাশুড়ি। উৎসঃ পরিবর্তন।










