340654

চীন-মার্কিন উত্তেজনায় জাতিসংঘের কঠোর সতর্কতা

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস নতুন স্নায়ুযুদ্ধের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন।

ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্স এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট দুই পরাশক্তির বৈরিতাকে বিশ্বশান্তি এবং স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে আখ্যা দিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। জাতিসংঘের ৭৫ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সাধারণ অধিবেশন ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মঙ্গলবার গুতেরেস বলেন, চরম ভয়াবহতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব।

তিনি বলেন, নতুন স্নায়ুযুদ্ধ পরিহারে আমাদের অবশ্যই সবকিছু করতে হবে। বৃহৎ দুটি অর্থনৈতিক পরাশক্তির বিভাজনে সৃষ্ট ক্ষতের ভার আমাদের বিশ্ব সইতে পারবে না। তাদের মধ্যে বাণিজ্য, আর্থিক নিয়ম, ইন্টারনেট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে দ্বিমত রয়েছে।

‘প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব অনিবার্যভাবে ভূ-কৌশল এবং সামরিকখাতে বিভাজন তৈরি করবে। আমাদের অবশ্যই তা এড়ানো উচিত।’ বলেন ‍গুতেরেস।

ওয়াশিংটন এবং বেইজিংয়ের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে চলমান সংঘাতের জেরে এমন কঠোর সতর্কতা এলো। বাণিজ্য, প্রযুক্তি, করোনা ভাইরাস, তাইওয়ানকে মার্কিন সমর্থন, দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিংয়ের বিতর্কিত দাবি, হংকং, জিনজিয়ানে শি জিনপিং প্রশাসনের নৃশংস এবং কঠোরনীতির কারণে ওয়াশিংটন-বেইজিংয়ের দ্বন্দ্ব ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে।

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষণে দু’পক্ষের বৈরিতার বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে। ভার্চুয়ালি দেয়া সংক্ষিপ্ত ভাষণে তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান, করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়ার জন্য বেইজিংকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য। চীনের উহানে গেলো বছরের ডিসেম্বরে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে ২ লাখের বেশি মানুষ ভাইরাসে মারা গেছে। বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের মৃতের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ।

চীনা রাষ্ট্রদূত বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে উঠা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন আখ্যা দিয়ে অস্বীকার করেছেন। বলেন, এ মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সহযোগিতা এবং সংহতি। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাকযুদ্ধ নয়। শি জিনপিংয়ের রেকর্ড করা ভিডিও ভাষণের আগে জাতিসংঘে চীনা রাষ্ট্রদূত ঝাং জুন এ কথা বলেন।

‘আমাদের উচিৎ পরস্পর আস্থা এবং বিশ্বাস বাড়ানো। রাজনৈতিক ভাইরাস ছড়ানো কোনোভাবেই উচিৎ হবে না।’ বলেন তিনি।

শি তার বক্তব্যে কার্যত ট্রাম্পকে তিরস্কার করেছেন। করোনা মোকাবিলায় বৈশ্বিক পদক্ষেপের পাশাপাশি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউিএইচও) শক্তিশালী নেতৃত্ব নিশ্চিতের আহ্বান জানান। এর আগে ডব্লিউএইচও থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানায় যুক্তরাষ্ট্র।

শি বলেন, আমাদের উচিৎ পরস্পর সংহিত জোরদার করা এবং একসঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা। আমাদের বৈজ্ঞানিক দিকনির্দেশনা অনুসরণ করা উচিৎ। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাকে তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে সহায়তা করা। যৌথভাবে বৈশ্বিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা। করোনা ইস্যুকে রাজনীতিকরণ বা ভিন্নখাতে নেয়ার চেষ্টা অবশ্যই প্রতিহত করা হবে।

জলবায়ু এবং ইরানের পরমাণু চুক্তি থেকে সরে যাওয়া, জাতিসংঘের মানবাধিকার এবং বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাসহ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবহেলা চীনকে বহুপাক্ষিতার প্রধান চরিত্রে উঠে আসার সুযোগ করে দিয়েছে।

চীনা-মার্কিন উত্তেজনার মধ্যে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ মঙ্গলবার বলেন, করোনা ভাইরাসের ক্ষতিগ্রস্ত বিশ্বের দেশগুলোর উচিৎ ঐক্যবদ্ধ হওয়া। একইসঙ্গে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের হাত থেকে বিশ্বকে রক্ষা করা। আমাদের সহযোগিতা থেকে একমাত্র সমাধান আসতে পারে। চীন-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বে বিশ্বকে ফেলে রাখা যায় না।

ভুরাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকলে বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তা ধ্বংস হয়ে যাবে বলে সতর্ক করেছেন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো।

বুধবার তিনি বলেন, যুদ্ধ কারো জন্য মঙ্গল নয়। ধ্বংস্তুপের মধ্যে বিজয় উদযাপনের কোনো মানে হয় না। ডুবন্ত বিশ্বের মাঝখানে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ হওয়া অনর্থক।

চীন-যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনার ভয়াবহতা তুলে ধরেন ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে দেয়া ভাষণে তিনি বলেন, পরমাণু, ক্ষেপণাস্ত্র, অত্যাধুনিক সামরিক বাহিনী যাদের আছে তাদের মধ্যে সংঘাতে হলে তার ভয়াবহতা কি হতে পারে তা শুধু আমরা অনুধাবন করতে পারি; বিস্মিত হতে পারি।

ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপিন্স উভয়ই দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিংয়ের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। ধারণ করা ভিডিও বার্তায় দুতার্তে বলেন, জাতিসংঘ ট্রাইবুনাল চীনের দাবি করা বিতর্কিত জলসীমা ফিলিপিন্সের অধিকারের রাখার পক্ষে রায় দিয়েছেন। আদালতের রায় ক্ষুণ্ন করা প্রচেষ্টা সর্বসম্মতভাবে আমরা প্রত্যাখ্যান করছি।

ad

পাঠকের মতামত