317865

লন্ডনে উবার চালকরা যেমন করে মারা যাচ্ছেন

ডেস্ক রিপোর্ট।। রাজেশ জয়সিলান একজন উবার চালক। তিনি লন্ডনে উবারে গাড়ি চালান। কিন্তু সর্বনাশা করোনা ভাইরাস তাকে বাঁচতে দেয় নি। রাজেশ আক্রান্ত হওয়ার কথা কাউকে বলেননি। তার ভয় ছিল, তিনি করোনা আক্রান্ত, এ কথা প্রকাশ করলে তাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হবে। বাড়িওয়ালা বাসায় থাকতে দেবেন না। তাই অসুস্থতার কথা গোপন করে তিনি বাসার ভিতর অবস্থান করছিলেন। কিন্তু পারলেন না রাজেশ, হেরে গেলেন।

এ নিয়ে লন্ডনে মোট তিনজন উবার চালক মারা গেলেন। তারা হলেন, জিসান আহমেদ, রাজেশ জয়সিলান ও আইয়ুব আকতার। এ খবর দিয়েছে লন্ডনের অনলাইন দ্য গার্ডিয়ান।

রাজেশ বিবাহিত ও দুই সন্তানের জনক। তার বাড়ি ভারতের ব্যাঙ্গালোরে। প্রায় এক দশক আগে তিনি লন্ডনে গিয়েছেন। তার এক বন্ধু সুনীল কুমার বলেছেন, সবার থেকে আলাদা করে ফেলা হবে এবং বাড়িওয়ালা তাকে থাকতে দেবে না- এই আতঙ্কে রাজেশ কাউকে অসুস্থতার কথা জানায়নি। যে বাড়িতে তিনি থাকতেন কয়েকদিন ধরে তার ভিতর অনাহারে পড়েছিলেন ৪৪ বছর বয়সী রাজেশ। তবে টেলিফোনে তার স্ত্রীকে জানিয়েছিলেন, বাসা থেকে তিনি বের হতে চান না। কারণ, ওই বাসার অন্য লোকজন যদি বুঝতে পারে তার করোনা ভাইরাসে সংক্রমণ হয়েছে তাহলে তাকে ছুড়ে ফেলা হতে পারে।

সুনীল কুমার (৩৮) বৃটেনের স্বাস্থ্য সেবা খাতের একজন আইটি কর্মী। তিনি বলেন, রাজেশের এমন আতঙ্কের কারণ আছে। মার্চে একই রকম অভিজ্ঞতার শিকার হন রাজেশ। ওই সময় তিনি যে বাসায় থাকতেন তার মালিক তাকে বাসা ছেড়ে দিতে বলেছিলেন। কারণ, রাজেশ একজন মিনিক্যাব চালক। বাড়িওয়ালার ভয় ছিল, তার কাছ থেকে রোগ ছড়াতে পারে। তাতে আক্রান্ত হতে পারেন বাড়িওয়ালা ও তার পরিবার। এ জন্য রাজেশকে বেশ কয়েক রাত তার গাড়িতেই ঘুমাতে হয়েছে। কিন্তু রাজেশ এক পর্যায়ে আস্তে আস্তে কাবু হতে থাকেন। তিনি এ মাসের শুরুর দিকে নিজেই গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যান। সেখানে তার অবস্থা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে চলে যায়। তাকে রাখা হয় ভেন্টিলেটরে। সেখান থেকে সুনীল কুমার ব্যাঙ্গালোরে অবস্থানরত তার মা ও স্ত্রীর সঙ্গে ভিডিও ফোনকলে সংযোগ স্থাপন করে দেন। এ সময় রাজেশ ছিলেন অচেতন। এর অল্প পরেই গত ১১ই এপ্রিল হ্যারো’তে অবস্থিত নর্থউইক পার্ক হাসপাতালে মারা যান তিনি।

ওদিকে গত বৃহস্পতিবার টটিংয়ে অবস্থিত সেইন্ট জর্জেস হাসপাতালে মারা গেছেন দুই সন্তানের পিতা জিসান আহমেদ। তিনিও স্বাস্থ্য সমস্যাকে এড়িয়ে চলছিলেন। তার সম্পর্কে এক বন্ধু বলেছেন, তিনি ছিলেন বয়সে তরুণ। রেখে গেছেন একজন কম বয়সী স্ত্রী ও সন্তানদের। তাছাড়া তিনি ছিলেন তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।

অন্যদিকে গত সপ্তাহে করোনা ভাইরাসে মারা যান আইয়ুব আকতার। মারাত্মক অসুস্থ হয়েছেন আরো একজন চালক আবদুর রাজাক হাদি। তিনি বলেছেন, সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও সুরক্ষার অভাবে মিনিক্যাব চালকরা রয়েছে উচ্চ মাত্রার ঝুঁকিতে। কিছু চালক সামনের ও পিছনের সিটের মাঝে প্লাস্টিকের বেষ্টনি তৈরি করেছেন। আবার অনেকের তাও নেই। কারণ, তারা মনে করেন এমনটা করলে তাদের লাইসেন্স কেড়ে নেয়া হতে পারে।

ইউনাইটেড প্রাইভেট হায়ার ড্রাইভারস এসোসিয়েশনের জেনারেল সেক্রেটারি ইয়াসিন আসলাম বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৬ জন মিনিক্যাব চালকের মৃত্যুর খবর জানি। অসংখ্য চালক অসুস্থ হয়েছেন। তাদের অনেকে সঙ্কটজনক অবস্থায় আছেন। এটা অত্যন্ত হতাশাজনক। এক্ষেত্রে অভিবাসী শ্রমিকরা খুব ঝুঁকিতে। কারণ, তাদেরকে কাজ করতে বাধ্য হতে হয়। আর তারা সরকারের কোন সুযোগ সুবিধাও পাবেন না।

আখতার ও জয়সিলানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে উবার। উত্তর ও পূর্ব ইউরোপ বিষয়ক উবারের আঞ্চলিক জেনারেল ম্যানেজার জেমি হেউড বলেন, মৃত এসব চালকের পরিবার পরিজন এবং প্রতিজন মানুষের প্রতি এই অপ্রত্যাশিত সময়ে আমাদের সমবেদনা। গত মাসে উবার বলেছিল, যদি কোনো উবার চালকের করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ে, অথবা তারা কোয়ারেন্টিনে থাকেন অথবা আইসোলেশনে থাকেন, তাহলে ১৪ দিন পর্যন্ত সপ্তাহে ১০০ পাউন্ড করে ক্ষতিপূরণ দেবে উবার।

সুনীল কুমার বলেছেন, খুব দরিদ্র পরিবারের সন্তান রাজেশ জয়সিলান। আশা করছিলেন পরিবার নিয়ে যাবেন লন্ডনে। কিন্তু সেই সামর্থ তার হয় নি। ব্যাঙ্গালোরে রেখে আসা তার মা, স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি বছর দু’মাসের জন্য দেখতে যেতেন তিনি। গত মাসে যখন তার করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ে, তখন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। ফোন করে সুনীলের কাছে জানতে চান, কিভাবে নিরাপদ থাকা যায়।

সুনীল বলেন, ওই সময়েই রাজেশ আমাকে বলেছিল যে, আগের বাড়িওয়ালা তাকে বাসা ছেড়ে দিতে বলেছিল। বাড়িওয়ালার ভয় ছিল, একজন উবার চালক হিসেবে সে ভাইরাস বহন করে নেবে এবং ওই বাড়ির সবাইকে সংক্রমিত করবে। তাই বাড়িওয়ালা তাকে তাৎক্ষণিকভাবে নোটিশ দেন। ফলে বেশ কয়েক রাত রাজেশকে তার গাড়ির ভিতর ঘুমাতে হয়।

২০ মার্চের দিকে রাজেশকে ওই হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। এ সময় তার পানিশূন্যতা দেখা দেয়। ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে তরল প্রবেশ করানোর পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। এরপর তিনি আবার কাজে যোগ দেন। সর্বশেষ তিনি যাত্রী বহন করেন ২৫ শে মার্চ হিথ্রো বিমানবন্দরে। এ সময়ে তিনি আবারো অসুস্থ হয়ে পড়েন। নিশ^াস নিতে কষ্ট হতে থাকে তার। তখন তার স্ত্রীকে রাজেশ বলেছিল, তাকে দেখাশোনা করার জন্য এমন একজনকে পেয়েছেন, যিনি তাকে এক সপ্তাহের জন্য দেখাশোনা করবেন। খাবার দেবেন। যতœ নেবেন। কিন্তু শেষ এক সপ্তাহে তিনি পুরোপুরিই অনাহারে ছিলেন। নিজেই একটি রুমের ভিতর ছিলেন। বাইরে বের হন নি। কারণ, তিনি চান নি মানুষ তার অসুস্থতার কথা জানতে পারুক। যখন অবস্থার আরো অবনতি হয়, তখনও তিনি এম্বুলেন্স ডাকেন নি।

ad

পাঠকের মতামত