308184

মোদি-শাহ যেখানে জনসভা করেছেন, সেখানেই পরাজিত

ভারতের ঝাড়খণ্ডের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর একটি কথা খুব জোরেসোরে শোনা যাচ্ছে। বিভিন্ন পরিসংখ্যান দিয়ে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যে সব জায়গায় জনসভা করেছিলেন, তার বেশির ভাগ এলাকাতেই পরাজিত হয়েছে তাদের দল বিজেপি।

সোমবার ঝাড়খন্ড নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হতেই বিজেপির পরাজিত হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছিলো। বেলা যত বেড়েছে ততই সেই ছবিটা স্পষ্ট হয়েছে। দিন শেষে দেখা যায়, রাজ্যের ৮১ আসনের বিধানসভায় মোদির দল পেয়েছে মাত্র ২৫টি আসন। যা আগেরবারের চেয়ে ১২টি কম। এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় পেয়েছে কংগ্রেস-জেএমএম জোট। ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা (জেএমএম) জোট পেয়েছে মোট ৪৭টি আসন। তার মধ্যে হেমন্ত সোরেনের দল একাই ৩০টি। কংগ্রেসের আসন ১৬, আরজেডির ১।

বিজেপি ছেড়ে নির্দলীয় হিসেবে দাঁড়ানো সরযূ রাইয়ের কাছে হেরেছেন ঝাড়খন্ডের মুখ্যমন্ত্রী রঘুবর দাস।

আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়, ঝাড়খণ্ডের পাঁচ দফার ভোটে মোট নয়বার প্রচারণায় এসেছিলেন মোদি। রাজ্য জুড়ে তার বিশাল বিশাল প্রচারণা উপকরণ। মোদির মতোই নয়বার প্রচারণায় আসেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ।

রাঁচিতে বসে বিজেপি নেতারা দাবি করেছিলেন, মোদি-ম্যাজিকে ভর করেই ফের ক্ষমতায় আসবেন তারা। যেমনটা হয়েছে কয়েক মাস আগের লোকসভা নির্বাচনে। ১৪টি লোকসভা আসনের ১১টিতেই জেতে বিজেপি। একটিতে তৎকালীন জোটসঙ্গী আজসু। বিজেপি নেতারা মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বলেছিলেন, ‘আব কি বার, ৬৫ পার।’

কিন্তু তাদের সেই প্রত্যাশার বেলুনে সুঁচ ফুটিয়েছে রাঝখন্ডের নির্বাচনী ফলাফল। ইতিমধ্যে সাংবাদিকের কাছে হার স্বীকার করেছেন মুখ্যমন্ত্রী রঘুবর। বলেন, ‘এটা আমার হার, বিজেপির নয়।’

কিন্তু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, রাজ্য জুড়ে রঘুবরের ভাবমূর্তি ধাক্কা খেয়েছে বুঝতে পেরে ভোটের সব দায়দায়িত্বই কার্যত নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা।

মোদি-শাহ দুজনেই প্রচার করেছেন কাশ্মীরে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপ, রামমন্দির নির্মাণ, তিন তালাক রদ, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) চালু করার সাফল্য-গাথা। কিন্তু ভোটের ফল বলছে, সেই প্রচারকে অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে হেমন্তের ‘জল-জঙ্গল-জমি’-র অধিকারের লড়াই। আদিবাসী-ওবিসি-সহ অন্যেরাও ভোট দিয়েছেন নিজের অপ্রাপ্তির হিসেব কষেই। তাই রাজ্যের ২৬ শতাংশ আদিবাসী ভোট ছাপিয়ে জেএমএম জোটের প্রাপ্ত ভোট প্রায় ৩৭ শতাংশ। বিজেপির একটি সূত্র জানায়, মোদি-অমিত শাহ যে-সব জায়গায় জনসভা করেছিলেন, তার বেশির ভাগ এলাকাতেই দল হেরেছে।

সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধেও ঝাড়খন্ডবাসী ভোট দিয়েছেন বলে পর্যবেক্ষকদের অভিমত। এই বিল পাশ হওয়ার পরে মোদী-শাহ যে-সব জায়গায় জনসভা করেছিলেন, তার বেশির ভাগ এলাকাতেই দল হেরেছে।

গত পাঁচ বছরে আদিবাসীদের অবস্থা আরও খারাপ হওয়ার জন্য সবাই দায়ী করেছেন রঘুবর-সরকারের নীতিকেই। আদিবাসীদের ক্ষোভের আগুনে আরও ঘি ঢেলেছে জমি-নীতি। আদিবাসীদের জমি বৃহৎ পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়টিকে মেনে নিতে পারেননি বিজেপির একাংশও। বিজেপির সঙ্গ ছেড়ে ভোটে লড়েছে কুর্মি সম্প্রদায়ের দল অল ঝাড়খণ্ড স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (আজসু)।

‘আদিবাসী বিরোধী’ বিশেষণ দিয়ে ভোটের আগে রঘুবরের একটি ভিডিও ‘ভাইরাল’ হয়। সেখানে মুখ্যমন্ত্রীকে বলতে শোনা যায়, ‘হাম আদিবাসী-মুক্ত ঝাড়খণ্ড বনায়েঙ্গে।’ অবশ্য পরে তিনি বলেন, ‘প্লাস্টিক-মুক্ত ঝাড়খণ্ড’ বানানোর কথা বলতে গিয়ে আদিবাসী শব্দটি হঠাৎ-ই বেরিয়ে গেছে।

এই অবস্থায় বিজেপির শেষ ভরসা ছিল দু’টি। আদিবাসী এলাকায় আরএসএস-এর সংগঠন এবং তাদের জনসেবামূলক প্রকল্প। আর মোদি-ম্যাজিক। কিন্তু এগুলোর কোনো কিছুই আর কাজে আসেনি।

এদিকে সোমবার ঝাড়খণ্ডে পরাজিত হওয়ার মাধ্যমে গত এক বছরের মধ্যে ভারতের পাঁচটি রাজ্যে ক্ষমতা হারাল বিজেপি।

ad

পাঠকের মতামত