287853

মুসলিম বিজ্ঞানী ও দার্শনিক আল ফারাবীর গল্প

মুসলিম জাতির বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই তাদের অতীত ঐতিহ্য সম্পর্কে জানে না। জানার তেমন আগ্রহও নেই। আগ্রহ থাকলেও জানার তেমন কোন পথ ও পাথেয় নেই। রাষ্ট্রশক্তি হারা মুসলমানরা তাদের অতীত ঐতিহ্য ও জ্ঞান বিজ্ঞানকে ধরে রাখতে পারেনি। এমন এক যুগ ছিল যখন সমগ্র বিশ্বের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছিল মুসলমানদের হাতে। জ্ঞান বিজ্ঞান, শিল্প সাহিত্য ও সভ্যতায় মুসলিম জাতি ছিল উন্নত ও শ্রেষ্ঠ। মুসলমানদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে আজ বিকৃত করে রচনা করা হয়েছে। এছাড়া ইউরোপীয় পন্ডিতগণ মুসলিম সভ্যতাকে বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী ও দার্শনিকগণের অধিকাংশের নামই বিকৃত করে লিপিবদ্ধ করেছে। অগ্নিপুরুষ সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী বাঙ্গালি মুসলমানদের চোখের সামনে তাঁদের গৌরবোজ্জ্বল অতীত ইতিহাস তুলে ধরার দূর্বার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি তাঁর “স্পেন বিজয়” কাব্যগ্রন্থে যথার্থই লিখেছেন _

“গাবো সে অতীত কথা, গৌরব কাহিনী, নাচাইতে মুসলেমের নিস্পন্ধন ধমনী। গাবো সে দুর্দম বীর্য দীপ্ত উন্মাদমা, কৃপা করি অগ্নিময়ী করো এ রসনা।”

পৃথিবীতে মুসলমানদের উন্নতির জন্যে যুগে যুগে যে সকল মুসলিম বিজ্ঞানী ও দার্শনিক ছিলেন, আল ফারাবী তাঁদের অন্যতম। তাঁর জন্ম তারিখ কত তা সঠিকভাবে জানা যায় নি। তাঁর জন্ম তারিখের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। এর অন্যতম কারণ হল তৎকালীন যুগে কারো জন্ম তারিখ লিপিবদ্ধ করে রাখার ব্যাপারে তেমন কোন গুরুত্ব ছিল না। যতদূর জানা যায় এ মনীষী ৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে তুর্কিস্তানের অন্তর্গত ‘ফারাব’ নামক শহরের নিকটবর্তী ‘আল ওয়াসিজ’ নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ‘ফারাব’ নামক শহরের নামানুসারে আবু নাসের মোহাম্মদ পরবর্তীতে ‘আল ফারাবী’ নামে পরিচিত হন।

আল ফারাবী বাল্যকাল থেকেই ছিলেন জ্ঞান পিপাসু। অজানাকে জানার এবং অজেয়কে জয় করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছিল তাঁর হৃদয়ে। তাই জ্ঞান বিজ্ঞানের সাধনায় তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন তাঁর সারাটা জীবন। জ্ঞানের সন্ধানে তিনি ছুটে চলেছেন দেশ থেকে দেশান্তরে। তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু হয় ফারাবায়। সেখানে কয়েকবছর শিক্ষা লাভের পর শিক্ষার উদ্দেশ্যে চলে যান বোখারায়। এরপর উচ্চশিক্ষা লাভের জন্যে তিনি গমন করেন বাগদাদে। সেখানে মুসলিম দার্শনিক ও বিজ্ঞানী আল ফারাবী।

তিনি সুদীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর অধ্যয়ন ও গবেষণা করেন। কয়েকটি ভাষার উপর ছিল তাঁর পূর্ণ দখল। জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ছিলেন তিনি পারদর্শী। দার্শনিক এবং বিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর সুখ্যাতি আস্তে আস্তে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। পদার্থবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তিশাস্ত্র, গণিতশাস্ত্র, চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রভৃতিতে তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে বিজ্ঞান ও দর্শনে তাঁর অবদান ছিল সর্বাধিক। পদার্থবিজ্ঞানে তিনিই ‘শূন্যতার অবস্থান’ প্রমাণ করেছিলেন। দার্শনিক হিসেবে ছিলেন নিয়প্লেটনিস্ট’দের পর্যায়ে বিবেচিত। বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক হিসেবে তিনি আরোহণ করেছিলেন জ্ঞানের শীর্ষে ।

বিজ্ঞানী আল ফারাবী সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তিশাস্ত্র প্রভৃতি বিষয়ে বহু রচনা করেছেন। কিন্তু তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক বলে অনেকে উল্লেখ করেছেন। তাঁর রচিত “আলা আহলে আল মদীনা আল ফালিদা” গ্রন্থটি সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য। তিনি আজ বেঁচে নেই কিন্তু মুসলিম জাতির কল্যানে তিনি জ্ঞান বিজ্ঞানের যে মৌলিক আবিষ্কার রেখে গেছেন তা চর্চা করলে মুসলমানরা আজও জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নতি লাভ করতে পারবে। তিনি কত সালে ইন্তেকাল করেছেন তা নিয়েও মতভেদ রয়েছে। যতদূর জানা যায়, তিনি ৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।

ad

পাঠকের মতামত