অলৌকিকভাবে জীবন রক্ষা খোদাভীরু সাহাবীর
ইসলাম ডেস্ক।। রাত গভীর হয়ে গেছে। ঘুট ঘুটে অন্ধকারে আচ্ছন্ন মক্কার অলিগলি। ঘুমন্ত নগরীর নিস্তব্ধ পরিবেশে অতি সন্তর্পণে পা রাখলেন মুরছাদ ইবনে আবি মুরছাদ। কাফেররা যে সব মুসলমানকে আটক রেখেছিল এবং অমানুষিক নির্যাতন চালাচ্ছিল, তাদের কয়েকজনকে গোপনে মদীনায় নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি এসেছিলেন। রাসূল(সা) তাকে এই কাজে নিয়োগ করেছিলেন। তিনি অতি সাবধানে যাচ্ছিলেন। সহসা সামনে একটা ছায়া দেখতে পেলেন। মুরছাদ ভয়ে জড়সড় হয়ে আসলেন। ছায়াটা আরো নিকটে এল। অতঃপর ছায়াটা থেকে পরিচিত এক নারী কন্ঠ ভেসে এলঃ
“মুরছাদ! তুমি? আমি চিনে ফেলেছি। কেমন আছ? কিভাবে এলে?” “কে উনাক নাকি?” প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন মুরছাদ।
“হ্যাঁ, আমি উনাক। তোমার প্রাণপ্রিয় উনাক। একদিন যাকে ছাড়া তোমার দু’দন্ডও চলতো না। এত রাতে কোথায় যাবে তুমি? চল, আমাদের বাড়ীতে। মনে আছে না অতীতের সেই দিনগুলির কথা?” বলতে বলতে মুরছাদের হাত ধরে টানতে লাগলো মুরছাদের জাহেলী যুগের প্রেমিকা ও বাল্য সংগিণী।
মুরছাদ এক ঝটকায় হাত সরিয়ে এমন ভঙ্গিতে দূরে সরে গেলেন যেন তার হাত কোন বিষধর সাপে পেঁচিয়ে ধরেছিল। “কী হলো? পাগল টাগল হয়ে গেছ নাকি? এ হাত একদিন তোমার কত প্রিয় ছিল, তা কি ভুলে গেলে?” উনাক বিস্ময়জড়িত কন্ঠে বললো।
“থামো উনাক। অতীতের কথা ভুলে যাও। ওটা ছিল আমার জীবনের অন্ধকার যুগ। সে সময় আমি সত্য মিথ্যা, ন্যায় অন্যায় এবং পাক নাপাকির কোন বাছবিচার করতাম না। আমি গোমরাহ ও বিপথগামী ছিলেন।
আল্লাহ আমার ওপর অনুগ্রহ করেছেন। আমি মুসলমান হয়েছি। কিন্তু তুমি এখনো মোশরেক। তা ছাড়া তুমি আমার জন্য পরস্ত্রী। পরস্ত্রীর সাথে মেলামেশা ইসলামে হারাম। কাজেই আমাকে মাফ কর। তোমার বাড়ীতে আমি যাবো না।” মুরছাদ দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বললেন। “কত বড় আমার সাধু পুরুষগো। আমার সাথে যাবে, না চিৎকার দিয়ে সবাইকে জড় করবো?” উনাক বললো।
“মুরছাদ পবিত্র জীবন ছেড়ে অপবিত্রতার পথ আর মাড়াবে না। জাহেলী যুগের সব কিছু আমি পা দিয়ে পিষে ফেলেছি। যাও, তোমার কাজে তুমি যাও।” মুরছাদ অবিচল কন্ঠে জবাব দিল।
“আমার কাজে আমি চলে যাই, আর তুমি ধর্মচ্যূতদেরকে ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে যাও, তাই না?” ক্রুদ্ধ সর্পিনীর মত ফুঁসতে ফুঁসতে বললো উনাক।
তারপর আকাশ বাতাস ফাটিয়ে চিৎকার করে “ওহে মক্কাবাসী, এই দেখ মুরছাদ এসেছে, তোমাদের বন্দীদেরকে ভাগিয়ে নিয়ে যাবে।” আর যায় কোথায়! সদ্য ঘুমিয়ে পড়া মক্কাবাসী জেগে উঠলো এবং যেদিক থেকে আওয়ায আসছিল, সেই দিকে দলে দলে ছুটলো।
মুরছাদ ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে একটা পাহাড়ের গর্তে আত্মগোপন করলেন। কিছু লোক ঐ গর্তের দিকে ধেয়ে গেল। মুরছাদের ধরা পড়ে যাওয়া প্রায় অবধারিত ছিল। সহসা অনেক দূর হতে এক রহস্যময় আওয়ায ভেসে এলঃ “ওদিকে নয়, এদিকে।”
এরপর মুরছাদ শুনতে পেলেন পায়ের আওয়াযগুলো ক্রমে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ তার সৎ ও পরহেজগার বান্দাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে অলৌকিকভাবে রক্ষা করেছিলেন।
শিক্ষাঃ পবিত্র কুরআনের সূরা তালাকের একটি আয়াতে আল্লাহ বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে অন্যান্য কাজ হতে বিরত থাকবে, আল্লাহ তাকে সংকট থেকে কোন না কোন উপায়ে উদ্ধার করবেন এবং তাকে অকল্পনীয়ভাবে জীবিকা সরবরাহ করবেন।” আলোচ্য ঘটনা এই আয়াতে বর্ণিত আল্লাহর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। এমন অলৌকিকভাবে বিপদ হতে উদ্ধার পাওয়া সবার ভাগ্যে নাও জুটতে পারে, কিন্তু প্রতিদান আখিরাতে অবশ্যই পাওয়া যাবে এই বিশ্বাসে অবিচল থেকে তাকওয়া ও পরহেজগারী সর্বাবস্থায় বজায় রাখা কর্তব্য।




