এইসব অদ্ভুত কারনেও হতে পারে আপনার হার্টের সমস্যা!
স্বাস্থ্য ডেস্ক।। হার্ট আমাদের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ন একটি অঙ্গ। হার্টের সমস্যা থেকে মুক্ত থাকা সুস্থ্য জীবনের জন্য আবশ্যক। হার্টের সাথে সংশ্লিষ্ট রোগ বিভিন্ন কারণে হতে পারে। অস্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম না করা এবং ধুমপানের কারনে সাধারণত হার্টের রোগ হয়। তবে হার্টের রোগ হওয়ার কিছু কিছু অদ্ভুত কারণ আছে যেগুলো আপনাকে অবাক করে দিতে পারে। হার্টের সমস্যা এর কিছু অদ্ভুত কারন যা আপনাকে অবাক করবে
গাড়ি, প্লেন এবং ট্রেন : গাড়ি, প্লেন, ট্রেন এবং অন্যান্য যানবাহনের শব্দ আপনার হার্ট এর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ৫০ ডেসিবেল এর চেয়ে বেশি শব্দে (রেফ্রিজারেটরের শব্দ অথবা স্বাভাবিক কথাবার্তার চেয়ে বেশি শব্দ) আপনার ব্লাড প্রেশার বাড়ার এবং হার্ট ফেইলারের সম্ভাবনা বেড়ে যেতে পারে। শব্দ যত বেশি বাড়ে, আপনার হার্টের রোগ এবং স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি বাড়ে।
মাইগ্রেইন : যদি আপনার মাইগ্রেইন থাকে, তাহলে আপনার স্ট্রোক, বুকে ব্যাথা এবং হার্ট এটাকের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। কেন এটা হয়, তা নিয়ে গবেষকরা নিশ্চিত না। যদি আপনার পরিবারে হার্টের রোগের ইতিহাস থাকে অথবা আপনার স্ট্রোক কিংবা হার্টের সমস্যা থাকে, তাহলে আপনার মাইগ্রেইনের জন্য Triptan টাইপের ঔষধ খাওয়া দরকার। মাইগ্রেইন আপনার রক্তনালীকে সরু করে দেয়। এই ঔষধটা সেটা ঠিক করে। তবে সবচেয়ে উত্তম পন্থা হচ্ছে ডাক্তারের সাথে কথা বলে মাথা ব্যাথার চিকিৎসা করা।
সন্তান : নিঃসন্তান মানুষের চেয়ে সন্তানের বাবা-মায়ের হার্টের রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সন্তান যত বেশি হয়, হার্টের রোগের সম্ভাবনাও তত বেশি। যেহেতু মাতাপিতা দুই জনেরই রোগের সম্ভাবনা বাড়ে, সেহেতু বায়োলজি সম্ভবত এর পিছনে কোন ভুমিকা পালন করে না। মেয়েদের যদি গর্ভস্রাব হয় অথবা ডিম্বাশয় কিংবা জরায়ু অপসারিত করে ফেলা হয়, তাহলে তাদেরও হার্টের রোগের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
খাটো হওয়া : গড় উচ্চতার চেয়ে আপনি যদি ২.৫ ইঞ্চি খাটো হন, তাহলে আপনার হার্টের রোগ হওয়ার সম্ভাবনা ৮% বেড়ে যায়। আপনি যত বেশি খাটো, আপনার হার্টের রোগ হওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি। তবে এটা ঠিক কি কারণে হয়, তা নিয়ে ডাক্তাররা নিশ্চিত না। খাটো ব্যাক্তিদের কোলেস্টেরোল এবং ট্রাইগ্লিসারাইড মাত্রা বেশি থাকে। এটার সাথে হার্টের রোগের সম্ভাবনা থাকতে পারে। এছাড়া এটাও হতে পারে যে, খাটো ব্যাক্তিরা কোন কারণে কম স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন করে।
একাকীত্ব : বেশি বন্ধু না থাকা এবং অসুখী সম্পর্ক আপনার হার্টের রোগ এবং স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয়। একাকীত্বের কারণে ব্লাড প্রেশারও বেড়ে যায়। তাই সম্ভব হলে একটি বিনোদনমূলক ক্রীড়া দলে যোগ দিন। আপনার ব্যায়াম হবে এবং একাকীত্বও দূর হবে – দুইটাই আপনার হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।
লম্বা সময় কাজ করা : যারা সপ্তাহে কমপক্ষে ৫৫ ঘন্টা কাজ করে, তাদের সপ্তাহে ৩৫-৪০ ঘন্টা কাজ করা মানুষের চেয়ে হার্টের রোগ বেশী হয়। বেশ কয়েকটা কারণে এটা হতে পারে, যেমন বেশি সময় বসে থাকা, বেশি চাপে থাকা, ইত্যাদি। যদি আপনার লম্বা সময় কাজ করার অভ্যাস থাকে, তাহলে ভালো করে শরীরের যত্ন নিন।
দাঁতের মাড়ির অসুখ : দাঁতের মাড়ির অসুখ থাকলে আপনার মুখ থেকে ব্যাকটেরিয়া রক্তে চলে যেয়ে ধমনীতে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। এতে ধমনীতে মেদ জমতে এবং হার্টের রোগের সম্ভাবনা বেড়ে যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে দাঁতের মাড়ির অসুখের চিকিৎসা করলে রক্তে প্রদাহ তৈরি করা C-reactive নামক প্রোটিনের সংখ্যা কমে যায়।
খারাপ শৈশব : ছোটবেলায় শিশুকে অত্যাচার এবং বেশী শাসন করলে অথবা শিশু অন্যের উপর অত্যাচার দেখলে বড়বেলায় তার ব্লাড প্রেশার, মেদবাহুল্য এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এই সমস্যাগুলো থাকলে হার্টের রোগ হওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।
ইনফ্লুয়েঞ্জা : সাম্প্রতিক একটা গবেষণাতে দেখা গিয়েছে যে, ইনফ্লুয়েঞ্জা হলে এক সপ্তাহ মতো হার্ট এটাক হওয়ার সম্ভাবনা ৬ গুণ বেড়ে যায়। এটা কি জন্য হয় তা নিয়ে গবেষকরা নিশ্চিত না। এটা হতে পারে যে, আপনার শরীর যখন সংক্রমণ থামানোর চেষ্টা করছে, তখন আপনার রক্ত সহজে জমাট বেঁধে যায়। এক্ষেত্রে প্রদাহও কিছু ভুমিকা পালন করতে পারে।
ক্রোধ : প্রচন্ড ক্রোধ এর পরে হার্ট এটাক হওয়ার সম্ভাবনা ৫ গুন বেড়ে যায়। রাগ এ ফেটে পড়ার পরের ২ ঘন্টায় হার্টবিট বাড়া এবং স্ট্রোক এর সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। কখন রাগ হবে সেটাকে সবসময় কন্ট্রোল করা সম্ভব না। তাই রাগ হলে তাড়াতাড়ি ঠান্ডা হওয়ার চেষ্টা করুন। যদি আপনার ঘন ঘন প্রচন্ড রাগ হয়, তাহলে হার্টের সমস্যার সম্ভাবনা কমাতে একজন সাইকোথেরাপিস্ট এর সাথে কথা বলুন।
দীর্ঘ সময় টিভি দেখা : মাঝেমধ্যে টিভি দেখার মধ্যে কোন সমস্যা নেই। তবে দীর্ঘ সময় ধরে বসে বসে টিভি দেখলে হার্ট এটাক এবং স্ট্রোকের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। শুধু বসে বসে টিভি দেখা না, সবধরণের নিষ্ক্রিয়তাই শরীরের জন্য খারাপ। নিষ্ক্রিয়তার কারণে রক্তে জমাট বাধা শুরু হয়। এছাড়া টিভি দেখার সময় আপনি অনেক জাঙ্ক ফুড এবং চিনি-যুক্ত পানীয় খেতে পারেন, যেটা আপনার হার্টের জন্য খারাপ।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ : প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত জায়গায় বাস করলে হার্টের রোগের সম্ভাবনা বেড়ে যেতে পারে। ২০০৫ সালে আমেরিকার নিউ অর্লিন্স এ হারিকেন আঘাতের পরের দশকে স্থানীয় টুলেন মেডিকেল সেন্টারে হার্ট এটাকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩ গুন বেড়ে যায়। আরেকটা স্টাডিতে দেখা গিয়েছে, ২০১১ সালে জাপানে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের পড়ে হার্ট এটাক এবং স্টোকের সংখ্যা বেশ বেড়ে যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মানুষ যে প্রচন্ড চাপে থাকে, তার কারণে হার্টের সমস্যা হতে পারে। এছাড়া আপনার যদি হার্টের সমস্যা আগে থেকেই থেকে থাকে, তাহলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নতুন সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।
স্তন্য ক্যান্সার : স্তন্য ক্যান্সারের কারণে কেমোথেরাপি এবং রেডিয়েশন থেরাপি দেয়া হলে হার্টের রোগের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আমেরিকান হার্ট এসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, ৬৫ বছরের চেয়ে বেশি বয়সী স্তন্য ক্যান্সারের চিকিৎসা করানো নারীদের স্তন্য ক্যান্সারের চেয়ে হার্টের সমস্যার কারণে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
শিক্ষার স্তর : ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল ফর এক্যুইটি ইন হেলথ জার্নালে প্রকাশিত ২০১৬ সালের অস্ট্রেলিয়ান এক স্টাডিতে দেখা গিয়েছে যে, আপনি যত বেশি সময় স্কুল/কলেজ/ইউনিভার্সিটিতে ব্যায় করেছেন, আপনার হার্টের সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা তত কম। যাদের কোন শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই, তাদের স্নাতক ডিগ্রি থাকা মানুষের চেয়ে হার্টের সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা দ্বিগুন বেশি।
মানুষ কোথায় বসবাস করছে, কি ধরণের কাজ করছে, কত টাকা ইনকাম করছে, কি ধরণের জীবনযাপন করছে, ইত্যাদি অনেকটা শিক্ষাগত যোগ্যতার উপর নির্ভর করে। তাই শিক্ষার স্তরের সাথে হার্টের সমস্যার একটা সংযোগ আছে।
নিম্ন এল্টিচ্যুডে (সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা) বসবাস করা : ২০১৭ সালে ফ্রন্টিয়ার ইন সাইকোলজি জার্নালে প্রকাশিত এক স্টাডিতে দেখা গিয়েছে যে, যারা উচ্চ এল্টিচ্যুডে (৪৫৭ থেকে ২,২৯৭ মিটারের মধ্যে) বসবাস করে, তাদের মেটাবোলিক সিন্ড্রোম হওয়ার সম্ভাবনা কম। মেটাবোলিক সিন্ড্রোম হচ্ছে হার্টের রোগের কয়েকটা রিস্ক ফ্যাক্টর – যেমন, হাই ব্লাড প্রেশার, হাই কোলেস্টেরল, মেদবহুলতা, ইত্যাদি। যারা সমুদ্রের লেভেলে বসবাস করে, তাদের মেটাবোলিক সিন্ড্রোম হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এটা ঠিক কি কারণে হয়, তা নিয়ে গবেষকরা নিশ্চিত না। একটা কারণ হতে পারে যে, উচ্চ এল্টিচ্যুডে বাতাসে অক্সিজেন একটু কম থাকে। একারণে হার্ট এবং ফুসফুস ভালো কাজ করে।
মার্কারি বা পারদ যুক্ত মাছ : মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড থাকে যেটা হার্ট এটাক এবং স্ট্রোকের সম্ভাবনাকে কমিয়ে দেয়। একারণে হার্টের সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের মাছ খেতে বলা হয়। তবে কিছু কিছু সামুদ্রিক মাছে প্রচুর মার্কারি বা পারদ থাকে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, মার্কারি ব্লাড প্রেশার এবং হার্ট এটাকের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয়। হাঙ্গর, সোর্ড ফিশ এবং টুনাতে সবচেয়ে বেশি মার্কারি থাকে। এগুলো থেকে দূরে থাকুন। স্যামন এবং ট্রাউটে প্রচুর সাস্থ্যকর ফ্যাটি এসিড থাকে এবং কম মারকিউরি থাকে। সামুদ্রিক মাছ খেতে হলে, এগুলো খান।
ডায়াবেটিস : ডায়াবেটিসের কারণে অনেকে দৃষ্টি শক্তি কমে যাওয়া, হাড়ের ক্ষতি হওয়া ইত্যাদির ভয় করে। তবে ডায়াবেটিস থেকে হার্টের সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা ওগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের ডায়াবেটিস নেই এমন মানুষের চেয়ে হার্টের রোগে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা ২ থেকে ৪ গুন বেশি। তবে ভালো খবর হচ্ছে, ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করলে এবং নিয়মিত ব্যায়াম করলে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের হার্টের রোগ এবং স্ট্রোকের সম্ভাবনা অনেক কমে যায়।




