221158

পাকিস্তানে ভোট আজ

নিউজ ডেস্ক।। প্রচার-প্রচারণা শেষ। এবার সময়ের অপেক্ষা। সন্ধিক্ষণ পালাবদলের। আজ (বুধবার) পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতা মসনদে বসবেন। নির্বাচনী প্রচারণা মাঠে একের পর এক সন্ত্রাসী হামলায় রক্তাক্ত হয়েছে পাকিস্তান। আগের ১২ দিনের বড় বড় চার হামলায় নিহত হয়েছেন কয়েকজন প্রার্থীসহ শত শত সমর্থক। ঘুম ভাঙলেই জঙ্গি হামলার ভয়।

এমন আতঙ্কের মধ্যেই সোমবার মধ্যরাতে শেষ হয়েছে প্রচারণা। নির্বাচনের দিনও চরমপন্থীদের হামলার আশঙ্কা রয়েছে। গণতন্ত্রের উৎসবে জীবননাশের এ শঙ্কার মধ্যেই দেশটির সাড়ে ১০ কোটি ভোটার তাদের নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করবেন। আরেক সংশয়ও থেকে যাচ্ছে। পাকিস্তানের ইতিহাসে কোনো প্রধানমন্ত্রী তার নির্ধারিত পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। ক্ষমতা থেকে তাদের টেনে নামিয়েছে সেনাবাহিনী। এবারও সেনা হস্তক্ষেপের অভিযোগ চরমে উঠেছে।

ডন জানায়, দেশজুড়ে ৮৫ হাজার ভোট কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়ে চলবে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। এরপরই পোলিং বুথে উপস্থিত ভোটকর্মীরা ভোট গণনার কাজ শুরু করবেন। রাত ৯টা থেকেই নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশ্যে আসতে থাকবে। যদিও হার-জিতের চিত্র স্পষ্ট হবে মধ্যরাতে। এবারের নির্বাচনে ত্রিকোণ যুদ্ধ হবে নওয়াজ শরিফের পাকিস্তান মুসলিম লীগ (পিএমএল-এন), ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) ও বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারির পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) মধ্যে। নওয়াজ শরিফ নির্বাচনে অযোগ্য হওয়ায় পিএমএল-এনের প্রধান তার ভাই শাহবাজ শরিফ।

পাকিস্তানের পার্লামেন্ট ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ও চারটি প্রাদেশিক অ্যাসেম্বলিতে ভোট হবে। প্রদেশগুলো হল পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান, খাইবার পাখতুনখাওয়া ও সিন্ধু। ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে ৩৪২টি আসন। এর মধ্যে সরাসরি নির্বাচিত ২৭২টি আসনে।

সংরক্ষিত আসন ৭০, যার মধ্যে নারীদের ৬০ ও সংখ্যালঘুদের জন্য ১০ আসন। সরকার গঠন করতে কোনো দলকে ১৩৭টি আসনে জয়ী হতে হবে। সরাসরি নির্বাচিত আসনের মধ্যে পাঞ্জাবে ১৪১টি, সিšু¬ প্রদেশে ৬১, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় ৩৯, বেলুচিস্তানে ১৬, উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় ১২ ও জাতীয় রাজধানী (ইসলামাবাদ) সংলগ্ন ৩টি আসন। জাতীয় নির্বাচনে মোট প্রার্থী ৩,৭৬৫ জন। চারটি প্রাদেশিক আইনসভায় আসন সংখ্যা ৭২৮টি। এর মধ্যে পাঞ্জাবে ৩৭১, সিন্ধুতে ১৬৮, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় ১২৪ ও বেলুচিস্তানে ৬৫ আসন।

পাকিস্তানের নির্বাচনের ইতিহাসে এবারই সর্বোচ্চসংখ্যক সেনা মোতায়েন করছে দেশটি। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একদিন আগেই ৩ লাখ ৭০ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। সেনা সদস্যের পাশাপাশি দেশজুড়ে সাড়ে ৪ লাখ পুলিশও মোতায়েন থাকবে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুসারে, রাজধানী ইসলামাবাদে ১ লাখ ৫০০, পাঞ্জাবে ২ লাখ ৫৯ হাজার, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় ৮৭ হাজার ও সিন্ধু প্রদেশে ৮০ হাজার সেনা মোতায়েন থাকবে। এছাড়া দেশের স্পর্শকাতর ভোট কেন্দ্রগুলোতে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা (সিসিটিভি) বসানো হয়েছে। দেশটির ৫,৫৭৬টি কেন্দ্রে প্রায় ২০ হাজার সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।

শীর্ষ নেতাদের কে কোথায় লড়ছেন? : ক্যারিশমাটিক নেতা সাবেক ক্রিকেট তারকা ইমরান খান ও শাহবাজ শরিফ নির্বাচনের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর ২৯ বছর বয়সী ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারিও জনসমর্থন পাচ্ছেন রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হওয়ায়।

শাহবাজ শরিফ : আদালতের নির্দেশে নওয়াজ পিএমএল-এনের প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়ালে সেই পদে স্থলাভিষিক্ত হন ভাই শাহবাজ। লাহোরে জন্ম নেয়া ৬৭ বছরের এই নেতা ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির (এনএ) চারটি আসন থেকে নির্বাচন করছেন। আসনগুলো হল এনএ-২৪৯ (করাচি পশ্চিম-২), এনএ-১৩২ (লাহোর-১০), এনএ-৩ (সোয়াত-৩), এনএ-১৯২ (দেরা হাজি খান-৪)।

ইমরান খান : পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইমরান খান। পাকিস্তানের সেনবাহিনী তাকে ক্ষমতায় বসাতে চায় বলে অভিযোগ রয়েছে। ৬৫ বছর বয়সী ইমরান পাঁচটি আসন থেকে নির্বাচন করছেন। আসনগুলো হল এনএ-৩৫ (বান্নু), এনএ-৫৩ (ইসলামাবাদ-২), এনএ-৯৫ (মিয়ানওয়ালি-১), এনএ-১৩১ (লাহোর-৯) ও এনএ-২৪৩ (করাচি পূর্ব-২)।

বিলাওয়াল ভুট্টো : পিপিপির চেয়ারম্যান ২৯ বছর বয়সী বিলাওয়াল দেশটির প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর ছেলে। প্রথমবারের মতো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে এনএ-৮ (মালাকান্দ সংরক্ষিত এলাকা), এনএ-২০০ (লারকানা-১) ও এনএ-২৪৬ (করাচি দক্ষিণ-১) আসন থেকে নির্বাচন করছেন। ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে বোমা হামলায় মা বেনজির নিহত হওয়ার পর রাজনীতিতে আসেন বিলাওয়াল।

আসিফ আলী জারদারি : পিপিপির প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি। ৬২ বছর বয়সী এই রাজনীতিক এনএ-২১৩ নম্বর আসন (বেনজিরাবাদ-১) থেকে নির্বাচন করছেন। বেনজিরের মৃত্যুর পর স্বামী আসিফ আলী প্রেসিডেন্ট হন। ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

জঙ্গি হামলায় রক্তাক্ত : পাকিস্তানের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জঙ্গি সংগঠনগুলোও ছিল সক্রিয়। প্রার্থীদের বাসভবন, গাড়িবহর, সমাবেশকে কেন্দ্র করে ১২ দিনে চার আত্মঘাতী হামলা হয়েছে। জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) হামলার দায়ও স্বীকার করেছে। নির্বাচনের দু’দিন আগে ২২ জুলাই খাইবারপাখতুনখাওয়ার দেরা ইসলাম খান এলাকায় আত্মঘাতী হামলায় পিটিআই প্রার্থী ইকরামুল্লাহ গান্দাপুর ও তার গাড়ির চালক নিহত হন। এদিনের আরেক হামলায় একটুর জন্য প্রাণে রক্ষা পান জমিয়াত উলিমায়ে ইসলামের প্রার্থী আকরাম খান দুরানি। ১৩ জুলাই বেলুচিস্তানের মাস্তাং জেলায় দলীয় সমাবেশে আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন বেলুচিস্তান আওয়ামী পার্টির প্রার্থী নওয়াবজাদা সিরাজ রাইসানিসহ ১২৮ জন। ১০ জুলাই পেশোয়ারে নির্বাচনী সমাবেশে আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টির প্রার্থী হারুন বিলওয়ারসহ ৩৪ জন। রক্তাক্ত এ প্রচারণায় কারণে নির্বাচনের দিনও জঙ্গি হামলার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

পরিবর্তনের হাওয়া : পাকিস্তানের নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন হামিদা শহিদ নামের এক নারী। কারণ তিনি পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী রক্ষণশীল উপজাতীয় এলাকা দির থেকে পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। এই এলাকার নারীরা নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন না। দির এক সময় ছিল তালেবানের শক্ত ঘাঁটি। সেখানে মেয়েদের অধিকার ছিল খুবই কম, তাদের এমনকি ভোট দিতেও দেয়া হতো না। নির্বাচন কমিশন জানায়, কোনো নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হতে হলে ওই এলাকার অন্তত ১০ শতাংশ নারী ভোটারকে ভোট দিতেই হবে। হামিদা শহিদ তারই সুযোগ নিয়েছেন। তিনি ইমরান খানের পিটিআই থেকে দির আসনে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। দেশটিতে এবারের নির্বাচনে ৩০৫ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। একে রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণের আমূল পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

ad

পাঠকের মতামত