দিনে চাকরিজীবী, আর রাতে ডাকাত-ছিনতাইকারী!
দর্জি, গার্মেন্টকর্মী, দোকানের বিক্রয়কর্মী, জমির দালাল, ট্যাক্সিচালক, উকিলের মুহুরি—দিনের বেলায় ওরা এমন নানা পেশায় সম্পৃক্ত থাকে। পরিচিতজনদেরও সবাই ওদের ওই পেশার লোক হিসেবেই জানে। আচার-আচরণেও যথেষ্ট ভদ্র, কেতাদুরস্ত। অথচ সূর্য ডোবার পর থেকেই বেরিয়ে আসে ওদের আসল চেহারা। সক্রিয় হয়ে ওঠে ডাকাতি আর ছিনতাইয়ে।
রাজধানীর উত্তরা থেকে বুধবার রাতে র্যাবের হাতে ধরা পড়া সাত যুবককে জিজ্ঞাসাবাদে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তাদের কাছ থেকে জব্দ করা হয়েছে তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র ও ১৬ রাউন্ড গুলি।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এমন তথ্য তুলে ধরা হয়। র্যাব-১-এর কম্পানি কমান্ডার মেজর মো. রাকিবুজ্জামান গ্রেপ্তার হওয়া সাত ডাকাত-ছিনতাইকারী সম্পর্কে বিস্তারিত জানান।
জানা যায়, গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় গত ১৩ মে রবি ও বিকাশের এজেন্ট আসাদুর রহমান আসাদ ও ইকবাল হোসেনের কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা কেড়ে নিয়ে পালিয়ে যায় একদল ছিনতাইকারী। ওই ঘটনায় জড়িতদের ধরতে মাঠে নামে র্যাব। অবশেষে বুধবার রাতে রাজধানীর উত্তরা থেকে সাগর বাড়ৈ, রুবেল, বাবুল ওরফে বাবু, আনোয়ার হোসেন, স্বপন মাহমুদ, ইউসুফ আলী ও আনোয়ার হোসেন নামের সাতজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। তাদের কাছ থেকে তিনটি বিদেশি অস্ত্র ও ১৬ রাউন্ড গুলি জব্দ করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য পায় র্যাব। ওরা জানায়, দিনের বেলায় কেউ দর্জি, কেউ কাপড়ের দোকানের বিক্রয়কর্মী, তৈরি পোশাক কারখানার কর্মী, জমির দালাল, ট্যাক্সিক্যাব চালক ও মুহুরির কাজ করে। আর রাত হলেই সংঘবদ্ধভাবে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে রাস্তায় নেমে আসে। চান্দনা চৌরাস্তা এলাকার ওই ছিনতাইয়ে ওরা জড়িত ছিল বলেও স্বীকারোক্তি দেয়।
সংবাদ সম্মেলনে মেজর মো. রাকিবুজ্জামান গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য উল্লেখ করে জানান, সাগর পেশায় একজন মুহুরি। সে ২০০০ সাল থেকে মুহুরি হিসেবে কর্মরত। একপর্যায়ে ছিনতাইকারী আনোয়ারের সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং সে এই ছিনতাই চক্রে যোগ দেয়। ২০১৭ সালে আনোয়ার আশুলিয়ায় পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিতে নিহত হলে সাগর ছিনতাই চক্রটির নেতৃত্ব দিতে শুরু করে। এর আগেও সে ডাকাতি ও ছিনতাই মামলায় দুবার জেলে যায় এবং প্রথমবার সাত মাস ও দ্বিতীয়বার দুই মাস কারাবাস শেষে জামিনে বেরিয়ে আসে।
গ্রেপ্তারকৃত রুবেল রাজধানীর গাউছিয়া মার্কেটে দর্জির কাজ করে। সেও আনোয়ারের মাধ্যমে ছিনতাই চক্রে যোগ দেয়। বাবুল নিউ মার্কেটের চাঁদনীচক মার্কেটে একটি দোকানে বিক্রয়কর্মীর কাজ করে। কাজের সূত্র ধরে একই মার্কেটে কর্মরত রুবেলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। বাবুলের বিরুদ্ধে আশুলিয়া ও সাভারে একাধিক ছিনতাই ও ডাকাতির মামলা রয়েছে। মামলাসংক্রান্ত বিষয়ে যোগাযোগের সূত্র ধরেই মুহুরি সাগরের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে সাগর ও রুবেলের মাধ্যমে সে ছিনতাই চক্রে ঢুকে পড়ে। বাবুল ডাকাতি ও ছিনতাই মামলায় মোট ১৭ মাস কারাভোগ করেছে বলে স্বীকার করে। আটক আরেকজন আনোয়ার পেশায় গাড়িচালক। সে বিমানবন্দর এলাকায় ভাড়ায় ট্যাক্সিক্যাব চালায়। এর আগে মাদক বিক্রির দায়ে কারাবন্দি থাকা অবস্থায় সেখানে সাগরের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। দুই মাস পর জেল থেকে বেরিয়ে এ দুজন ছিনতাই চক্রে যোগ দেয়।
গ্রেপ্তার হওয়া আরেক ছিনতাইকারী স্বপন মাহমুদ পেশায় জমির দালাল। ১৯৮৮ সালে সে ঢাকায় আসে একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কম্পানিতে চাকরি নিয়ে। ১৯৯২ সাল পর্যন্ত সে চাকরি করে। ২০১৬ সালে সে সাগর, বাবু ও রুবেলের সঙ্গে ডাকাতি ও ছিনতাই মামলায় গ্রেপ্তার হয়।
ইউসুফ আলী পেশায় সাভারে একটি সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে শ্রমিকের কাজ করে। আনোয়ার পেশায় একজন গার্মেন্টকর্মী। চাকরির সূত্র ধরে ইউসুফের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ইউসুফের মাধ্যমে পরে আনোয়ার ও সাগরের সঙ্গে পরিচয়। চক্রে যোগ দিয়ে দলবদ্ধভাবে শুরু করে ছিনতাই।




