219466

যেভাবে মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণ করল ছেলে (ভিডিও)

‘মায়ের মত আপন কেহ নাইরে/ মা জননী নাই রে যাহার ত্রিভূবনে তাহার কেহ নাইরে’। সত্যি মায়ের ভালোবাসার কোনো তুলনা হয় না। মৃত্যুর মুখে পৌঁছেও সে কেবল সন্তানের কথা ভাবে। সন্তানের মঙ্গল চিন্তায় বিভোর থাকে। চরম বস্তুবাদী এই সময়ে যখন অর্থের জন্য সব ধরনের ঐতিহ্য আর মূল্যবোধ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তখনও কেবল মায়েদের স্নেহ মমতাই নির্মল আর খাঁটি। নইলে হাসপাতালের বেড শুয়েও কি একজন মা তার সন্তানের পরীক্ষায় পাস নিয়ে এতটা উদ্বিঘ্ন থাকেতে পারেন! যিনি ইহলোক ত্যাগ করবেন দু দিন পরেই।

এই মায়ের নাম স্টিফেনি নর্থকোট। বাড়ি যুক্তরাষ্ট্রের টেনিসি অঙ্গরাজ্যে। ২০১৫ সালে বিরল ক্যান্সারে আক্রান্ত হন স্টিফেনি। এরপর দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সার সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তার আর সেরে উঠার কোনো সম্ভবনাই নেই। গতবছরই শেষ কথা বলে দিয়েছেন চিকিৎসকরা, বড় জোর তার আয়ু আছে আর ১০ মাস।

মৃত্যুশয্যায় শুয়েও একমাত্র ছেলে ডলটনকে নিয়ে স্টিফেনির চিন্তার শেষ নেই। কেবল ভাবেন: ‘আহা মরার আগে যদি দেখে যেতে পারতাম ছেলেটা স্কুল গ্রাজুয়েশন শেষ করেছে! কালো টুপি পড়ে সার্টিফিকেট নিচ্ছে! তাহলে আর চিন্তা থাকত না।’

তার ছেলে ডলটন জ্যাকসন পড়তো যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসা অঙ্গরাজ্যের হলস হাইস্কুলে। সেখানে থেকেই এ বছর মে মাসে পরীক্ষায় পাস করেছে সে। স্কুল তার সার্টিফিকেট দেয়ার অনুষ্ঠান করবে ১৮ মে। কিন্তু চিকিৎসকরা তো সাফ জানিয়ে দিয়েছেন: ‘অতদিন হয়ত বেঁচে থাকবেন না তার মা। এর আগেই মারা যাবেন তিনি।’

চিন্তায় পড়ে যায় ডলটন। তাহলে কি মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণ করা হবে না! না, সেটা তো হতে পারে না। যে করেই হউক একটা ব্যবস্থা তো করতেই হবে। মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণের জন্য মরিয়া ছেলে। একদিন তাই সরাসরি স্কুল বোর্ডের সঙ্গে দেখা করলো ডলটন। খুলে বললো সব কথা। সব শুনে স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল তাকে বললেন, ‘কোনো সমস্যা নেই, হাসপাতালে তোমার মায়ের চোখের সামনেই তোমাকে সার্টিফিকেট দেয়া হবে। তুমি আয়োজন কর। আমাদের কেবল দিনক্ষণ জানিয়ে দিও।’

এবার এগিয়ে এলেন ওই রাজ্যের শিক্ষাবোর্ড। এই কাজে তাকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিল পরিবার ও বন্ধুরাও। এই আয়োজনে আরও সহযোগিতা করলেন ব্যাপিস্ট মেমোরিয়াল হাসপাতালের চিকিৎসক আর কর্মচারীরাও। ফলে স্কুলের বদলে হাসপাতালেই ডলটনের সার্টিফিকেট দেয়ার অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

দিনটা ছিল গত ৪ মে। সিক বেডে শুয়ে ওই অনুষ্ঠান দু চোখ ভরে দেখেন স্টিফেনি নর্থকোট। স্টেফেনি তখন ভালো করে কথাও বলতে পারছিলেন না, এতটাই অসুস্থ তিনি। তারপরও বহু কষ্টে মুখ খুললেন, আগত অতিথিদের ধন্যবাদ জানালেন। ছেলেকে বললেন: ‘চিন্তা করো না আমার দোয়া সবসময় তোমার সঙ্গে থাকবে। তুমি তোমার সব স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে।’ এরপর আসে সেই মহেন্দ্রক্ষণ। যার জন্য দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছিলেন স্টিফেনি। মা ও ছেলে দুজনের জন্যই সেটি ছিল একটা বিশেষ দিন।

ডলটনের মাথায় কালো ক্যাপ পরিয়ে দেন টেনিসি অঙ্গরাজ্যের লুডেরডাল কাউন্টি বোর্ড অব এডুকেশনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘হলস হাইস্কুল থেকে গ্রাজুয়েট সম্পন্ন করেছে ডেলটন ক্রিস্টোফার জ্যাকসন।’উপস্থিত সবাই তাকে হাততালি দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়। টুপিটি শূন্যে ছুড়ে ফেলে ডলটন। এরপর মায়ের কাছে ছুটে আসে ছেলে। দু হাতে জড়িয়ে ধরে মাকে। বলে: ‘দেখো মা, আমি তোমার ইচ্ছা পূরণ করেছি।’ দুজনের চোখেই তখন ভেজা। শুকনো ছিল না অনুষ্ঠানে আগত অন্যদের চোখও।

মাকে বিছানা থেকে তুলে আনে ডলটন। এরপর বুকে জড়িয়ে ধরে খানিকক্ষণ নেচে নেয়। কিন্তু বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলেন না স্টিফেনি। শেষে নিজের বেডেই ফিরে যান তিনি এবং গান। তার ৭ বছরের নাতনি ম্যাডিসন তখন তার কোলে এসে বসে।

ছেলের এই সাফল্য দেখার জন্যই যেন এতদিন ধরে বেঁচে ছিলেন ক্যান্সার আক্রান্ত মা। ছেলে গ্রাজুয়েশন পাওয়ার মাত্র দু সপ্তাহ পরেই শান্তিতে চোখ বুঁজেন তিনি।

দেখুন ভিডিও

ad

পাঠকের মতামত