বিশ্বজুড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি: চালকের আসনে কারা?
রবিউল হোসেন।। বর্তমান বিশ্ব এক জটিল ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং তাইওয়ান প্রণালীতে উত্তেজনা—সবকিছুই বিশ্বজুড়ে দেশগুলোকে তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে বাধ্য করছে। ফলস্বরূপ, সামরিক সরঞ্জামের চাহিদা আকাশচুম্বী, এবং বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। এই ক্রমবর্ধমান বাজারকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব মজবুত করছে শীর্ষ অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশগুলো।
সুইডেনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই) সম্প্রতি ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিশ্ব অস্ত্র বাজারের একটি বিশদ চিত্র তুলে ধরেছে। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র তার শীর্ষস্থান আরও মজবুত করেছে, যেখানে ফ্রান্স রাশিয়াকে টপকে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে রাশিয়ার রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এই প্রতিবেদনে উঠে আসা বিশ্বের শীর্ষ ১০ অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশের তালিকা ও তাদের প্রভাব নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. যুক্তরাষ্ট্র: অপ্রতিদ্বন্দ্বী শীর্ষে
বিশ্বের অস্ত্র বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান প্রশ্নাতীত। বিশ্বজুড়ে মোট অস্ত্র রপ্তানির ৪৩ শতাংশই আসে এই দেশটি থেকে, যা নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে বহুগুণ বেশি। দেশটি বছরে গড়ে প্রায় ১৫ হাজার কোটি ডলারের সমরাস্ত্র রপ্তানি করে। এর পেছনে রয়েছে দেশটির উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী সামরিক শিল্প এবং বিশ্বজুড়ে মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব। সৌদি আরব, ইউক্রেন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও পোল্যান্ডের মতো দেশগুলো মার্কিন অস্ত্রের প্রধান ক্রেতা। দেশটির রপ্তানিযোগ্য সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে পঞ্চম প্রজন্মের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান, এফ-১৬, অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, চালকবিহীন ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, হেলিকপ্টার ও আব্রামস ট্যাংক।
২. ফ্রান্স: রাশিয়ার স্থান দখল
ফ্রান্স সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অস্ত্র রপ্তানিতে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে ৯.৬ শতাংশ অংশীদারত্ব নিয়ে দেশটি রাশিয়াকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারকের স্থান দখল করেছে। বছরে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র রপ্তানি করে ফ্রান্স। বিশেষ করে রাফাল যুদ্ধবিমানের আন্তর্জাতিক সাফল্য তাদের এই উত্থানের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। ভারত, কাতার ও গ্রিস ফরাসি অস্ত্রের প্রধান ক্রেতা। রাফাল ছাড়াও ফ্রান্সের তৈরি সাবমেরিন, ফ্রিগেট, ক্ষেপণাস্ত্র ও হেলিকপ্টারের বিশ্বজুড়ে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
৩. রাশিয়া: যুদ্ধের প্রভাবে পতন
একসময়কার দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানিকারক রাশিয়া বর্তমানে ৭.৮ শতাংশ অংশীদারত্ব নিয়ে তৃতীয় স্থানে নেমে এসেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং নিজেদের সামরিক চাহিদা মেটাতে হওয়ায় দেশটির রপ্তানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। বছরে গড়ে প্রায় চার হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র রপ্তানি করে দেশটি। ঐতিহ্যগতভাবে ভারত ও চীন রাশিয়ার অস্ত্রের বড় ক্রেতা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ভারত পশ্চিমা অস্ত্রের দিকে ঝুঁকছে। রাশিয়া মূলত এস-৪০০ ও এস-৩০০ বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, সুখোই ও মিগ সিরিজের যুদ্ধবিমান এবং বিভিন্ন ধরনের ট্যাংক ও কামান রপ্তানি করে।
৪. চীন: কৌশলগত বিস্তারের হাতিয়ার
বিশ্বের অস্ত্র বাজারে চীনের অংশীদারত্ব ৫.৯ শতাংশ। দেশটি বছরে গড়ে দুই হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র রপ্তানি করে থাকে। চীন মূলত এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের উন্নয়নশীল দেশগুলোকে লক্ষ্য করে তাদের অস্ত্র বাজার প্রসারিত করছে। পাকিস্তান, সার্বিয়া ও থাইল্যান্ড চীনা অস্ত্রের প্রধান ক্রেতা। অপেক্ষাকৃত কম দামে জেএফ-১৭ ও জে-১০-এর মতো যুদ্ধবিমান, সশস্ত্র ড্রোন, ফ্রিগেট, ও রকেট সিস্টেম সরবরাহ করে চীন তার ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করছে।
৫. জার্মানি: প্রযুক্তিতে আপসহীন
জার্মানি বিশ্ববাজারে মোট অস্ত্র রপ্তানির ৫.৬ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র রপ্তানি করে দেশটি। জার্মান অস্ত্র প্রযুক্তি ও স্থায়িত্বের জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। তাদের লেপার্ড ট্যাংক, টাইপ-২১২ সাবমেরিন, এবং বিভিন্ন ধরনের কামান ও সাঁজোয়া যানের বিশেষ কদর রয়েছে। তবে কঠোর রপ্তানি নীতির কারণে জার্মানি অনেক সময় সব দেশে অস্ত্র বিক্রি করে না। ইউক্রেন, মিসর ও ইসরায়েল তাদের অস্ত্রের প্রধান ক্রেতা।
৬. ইতালি: নৌ-সরঞ্জামে বিশেষত্ব
বৈশ্বিক অস্ত্র রপ্তানিতে ৪.৮ শতাংশ অংশীদারত্ব নিয়ে ইতালি ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে। দেশটি বছরে প্রায় ৮০০ কোটি ডলারের অস্ত্র রপ্তানি করে। ইতালি মূলত নৌ-প্রযুক্তি, বিশেষ করে হেলিকপ্টার, ফ্রিগেট এবং ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থায় পারদর্শী। কাতার, মিসর ও কুয়েতের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ইতালির অস্ত্রের প্রধান ক্রেতা।
৭. যুক্তরাজ্য: ঐতিহ্যের ধারক
যুক্তরাজ্য বিশ্ববাজারে মোট অস্ত্র রপ্তানির ৩.৬ শতাংশ করে থাকে, যার আর্থিক মূল্য বছরে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার। টাইফুন যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ, সেন্সর ও রাডার প্রযুক্তিতে দেশটি এগিয়ে। বিএই সিস্টেমস-এর মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাজ্যের অস্ত্র শিল্পের মূল চালিকাশক্তি। কাতার, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেন ব্রিটিশ অস্ত্রের প্রধান ক্রেতাদের মধ্যে অন্যতম।
৮. ইসরায়েল: যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত প্রযুক্তি
বৈশ্বিক অস্ত্র রপ্তানিতে ইসরায়েলের অংশীদারত্ব ৩.১ শতাংশ। দেশটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের অস্ত্র বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত এবং অত্যন্ত কার্যকর। বিশেষ করে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা (যেমন আয়রন ডোম), চালকবিহীন উড়ন্ত যান (ড্রোন), নজরদারি প্রযুক্তি ও ক্ষেপণাস্ত্রের বিশ্বজুড়ে বিশেষ চাহিদা রয়েছে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইন ইসরায়েলি অস্ত্রের প্রধান ক্রেতা।
৯. স্পেন: উদীয়মান শক্তি
স্পেন ৩ শতাংশ অংশীদারত্ব নিয়ে তালিকার নবম স্থানে রয়েছে। দেশটি মূলত সামুদ্রিক যুদ্ধজাহাজ, হেলিকপ্টার, প্রশিক্ষণ বিমান ও হালকা অস্ত্র তৈরিতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। সৌদি আরব, অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্ক স্পেনের তৈরি অস্ত্রের প্রধান ক্রেতা।
১০. দক্ষিণ কোরিয়া: বাজারের নতুন তারকা
অস্ত্র রপ্তানির বাজারে দক্ষিণ কোরিয়া এক নতুন এবং অত্যন্ত প্রতিযোগী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে তাদের অংশীদারত্ব ২.২ শতাংশ এবং তা দ্রুত বাড়ছে। দেশটি উন্নত প্রযুক্তি, তুলনামূলক কম মূল্য এবং দ্রুত সরবরাহের কারণে অনেক দেশের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। পোল্যান্ড, ফিলিপাইন ও ভারত তাদের প্রধান ক্রেতা। কে-৯ হাউইটজার কামান, হালকা ট্যাংক, ও ফ্রিগেট রপ্তানি করে দক্ষিণ কোরিয়া অল্প সময়েই বিশ্ব বাজারে নিজের জায়গা করে নিয়েছে।










