373224

উদ্যোক্তা তৈরিতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কতটা প্রস্তুত?

আমিনুল হক রাসেল ও মঞ্জুর মুর্শেদ ভূঁইয়া।।

বাংলাদেশে “ভালো চাকরি” এখনো বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো—চাকরির বাজার যেমন দ্রুত বদলাচ্ছে, তেমনি নতুন কর্মসংস্থানের বড় অংশও আসছে উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপভিত্তিক উদ্যোগ থেকে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়: আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি সত্যিই উদ্যোক্তা তৈরির জন্য প্রস্তুত—নাকি আমরা এখনো পাঠ্যবই–নির্ভর, পরীক্ষা–কেন্দ্রিক এক পুরোনো কাঠামোতেই আটকে আছি?

চাকরির বাজারের চাপের একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায় যুব বেকারত্বের পরিসংখ্যানে। বিশ্বব্যাংক/আইএলও মডেলড হিসাব (FRED-এ প্রকাশিত) অনুযায়ী ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ১৫–২৪ বছর বয়সীদের বেকারত্বের হার ছিল১১.৪৬২%। একই সময়ে দেশে ১৫–২৯ বছর বয়সী যুব শ্রমশক্তির উল্লেখযোগ্য অংশও বেকার—বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপভিত্তিক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, সংখ্যাটিপ্রায় ১৯.৪ লাখএবং হার৭.২%। এই চাপের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়া অনেক তরুণের কাছে বিকল্প পথ; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কতটা সহায়?

সম্ভাবনার বাংলাদেশ: ডিজিটাল অবকাঠামো আছে, উদ্যোক্তা–শিক্ষা কি আছে?
একদিকে বাংলাদেশে ডিজিটাল গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে দেশে ইন্টারনেট গ্রাহক১৩৫.৯৯ মিলিয়ন—বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য উদ্ধৃত করে সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে।অন্যদিকে আর্থিক লেনদেনে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) যেন উদ্যোক্তাদের “পেমেন্ট রেললাইন”: বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দেশে নিবন্ধিত এমএফএস অ্যাকাউন্ট ছিল২৩৯.৩ মিলিয়ন, এবং ওই মাসে লেনদেনের পরিমাণপ্রায় ১.৭২ ট্রিলিয়ন টাকা।অর্থাৎ বাজার–প্রস্তুত ডিজিটাল অবকাঠামো অনেকটাই তৈরি। প্রশ্ন হলো—বিশ্ববিদ্যালয় কি শিক্ষার্থীদের সেই বাজারেপ্রডাক্ট বানানো, গ্রাহক বোঝা, ডিজিটাল টুল ব্যবহার, ঝুঁকি–ব্যবস্থাপনা, টিমওয়ার্ক ও সেলস–কমিউনিকেশন—এসব সক্ষমতা তৈরি করে দিচ্ছে?

বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে—কিন্তু “উদ্যোক্তা সক্ষমতা” কতটা বাড়ছে?
বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইউজিসির তথ্যমতে, দেশে৫৩টি পাবলিকও১১০টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়রয়েছে। সংখ্যা বাড়লেও উদ্যোক্তা তৈরির জন্য যে “ইকোসিস্টেম”—ইন্ডাস্ট্রি লিঙ্কেজ, ইনকিউবেশন, প্রোটোটাইপ ল্যাব, মেন্টর নেটওয়ার্ক, ক্যারিয়ার/স্টার্টআপ সাপোর্ট, এবং ব্যর্থতা থেকে শেখার নিরাপদ সংস্কৃতি—এসবের বিস্তৃতি এখনো সীমিত ও অসম।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোথায় পিছিয়ে?
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উদ্যোক্তা তৈরিতে কিছু কারণে পিছিয়ে থাকে—

১) কারিকুলাম: জ্ঞান আছে, প্রয়োগ–ভিত্তিক শেখা কম

বেশির ভাগ ব্যবসায় শিক্ষা/ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামে ফাইন্যান্স, মার্কেটিং, এইচআর, স্ট্র্যাটেজি ইত্যাদি শেখানো হয়। সমস্যা হলো—অনেক ক্ষেত্রে এগুলো “কেস স্টাডি পড়ে মুখস্থ” পর্যায়ে থাকে; বাস্তব সমস্যায় গিয়েসমাধান ডিজাইন, বাজার যাচাই, গ্রাহক ইন্টারভিউ, ডেটা দিয়ে সিদ্ধান্ত, ডিজিটাল মার্কেটিং টেস্ট, বাপিচ ডেক বানিয়ে বিনিয়োগকারী/ব্যাংকের সামনে উপস্থাপন—এসব অনুশীলন নিয়মিতভাবে হয় না।

এখানেই Outcome-Based Education (OBE) ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। OBE বলতে বোঝায়—শিক্ষার্থীরা কোর্স শেষেকী করতে পারবেসেটি আগে নির্দিষ্ট করা, এবং ক্লাস–অ্যাসেসমেন্ট–প্রজেক্ট সবকিছু সেই “আউটকাম” অর্জনের দিকে সাজানো। উদ্যোক্তা তৈরিতে OBE প্রয়োগ করলে আউটকাম হতে পারে:

• সুযোগ শনাক্তকরণ ও সমস্যা বিশ্লেষণ (opportunity/problem framing)
• ব্যবসা মডেল ও ইউনিট ইকোনমিক্স বোঝা
• প্রোটোটাইপ/এমভিপি (MVP) তৈরি ও বাজার যাচাই
• ডিজিটাল টুল (ডেটা অ্যানালিটিক্স, এআই/অটোমেশন, নো-কোড, ই-কমার্স স্ট্যাক) ব্যবহার
• টিম লিডারশিপ, নেগোশিয়েশন ও নৈতিকতা
এর মূল্যায়নও তখন লিখিত পরীক্ষার বদলেলাইভ প্রজেক্ট, স্টার্টআপ সিমুলেশন, ইন্টার্নশিপ–ভিত্তিক রিপোর্ট, পিচিং ও গ্রাহক–ফিডব্যাক—এসব দিয়ে করা সম্ভব।

২) ইন্ডাস্ট্রি/মার্কেট এক্সপোজার কম
ক্যাম্পাসে সেমিনার হয়, অতিথি বক্তা আসেন—কিন্তু নিয়মিতভাবে স্থানীয় SME, ই-কমার্স, কৃষি-ভিত্তিক উদ্যোগ, সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রি—এসবের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রজেক্ট হয় না।

৩) ইনকিউবেশন ও মেন্টরশিপ দুর্বল
উদ্যোক্তা হওয়ার সবচেয়ে বড় সহায়তা হলো একজন অভিজ্ঞ মেন্টর—যিনি ভুল ধরিয়ে দেবেন, নেটওয়ার্ক দেবেন, সিদ্ধান্তে সাহায্য করবেন। অনেক ক্যাম্পাসে ইনকিউবেটর থাকলেও তা নিয়মিত কার্যকর হয় না, বা কেবল “ইভেন্ট-কেন্দ্রিক” হয়ে যায়।

৪) ফান্ডিং ও আইনগত সহায়তার ঘাটতি
স্টার্টআপের শুরুর ধাপে ক্ষুদ্র তহবিল, হিসাব-ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স, আইপি/ট্রেডমার্ক, কন্ট্রাক্ট—এসব বিষয়ে ক্যাম্পাসভিত্তিক সহায়তা খুব কম।

৫) ব্যর্থতাকে ‘নেগেটিভ’ হিসেবে দেখা
উদ্যোক্তা জগতে ব্যর্থতা শেখার অংশ। কিন্তু আমাদের সমাজ ও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যর্থতা মানে “অযোগ্যতা”—এমন মনোভাব কাজ করে। এতে শিক্ষার্থীরা ঝুঁকি নিতে ভয় পায়।

IR 4.0 যুগে উদ্যোক্তা তৈরির গুরুত্ব আরও বেড়েছে

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে উদ্যোক্তার সুযোগ বেড়েছে—কারণ ডিজিটাল টুল দিয়ে কম খরচে ব্যবসা শুরু করা যায়: অনলাইন শপ, ডিজিটাল সেবা, কনটেন্ট ইকোনমি, ফ্রিল্যান্সিং থেকে এজেন্সি, লজিস্টিকস, এডটেক, হেলথটেক, কৃষি-টেক—অনেক ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। তবে একই সঙ্গে প্রতিযোগিতা বাড়ছে, এবং বাজারে টিকে থাকতে দরকার ডেটা-চিন্তা, ডিজিটাল মার্কেটিং, কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স, সাইবার নিরাপত্তা—এসব নতুন দক্ষতা। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা শিক্ষা যদি আপডেট না হয়, শিক্ষার্থীরা দ্রুত পিছিয়ে পড়বে।

স্টার্টআপ ফান্ডিংয়ের বাস্তবতা: বড় ডিল হচ্ছে, কিন্তু প্রি-সিড গ্যাপ রয়ে যাচ্ছে
অনেকে বলেন, “বাংলাদেশে স্টার্টআপ হচ্ছে না”—এটা পুরো সত্য নয়। তবে ধারাবাহিকতার সংকট আছে। LightCastle Partners-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে স্টার্টআপ ফান্ডিং৪১% কমে ৪১ মিলিয়ন ডলার-এ নেমেছে।আবার ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে ফান্ডিং১১৯.৯ মিলিয়ন ডলার, যার বড় অংশই একটি১১০ মিলিয়ন ডলারেরকৌশলগত এমঅ্যান্ডএ ডিল থেকে এসেছে (ShopUp–Sary, SILQ Group)।একই রিপোর্টে প্রি-সিডে তহবিল খুব কম এবং কিছু স্টেজে ডিল শূন্য থাকার কথাও বলা হয়েছে—অর্থাৎ “আইডিয়া থেকে গ্রোথ”—এই পথে মাঝখানের সাপোর্ট দুর্বল।এই গ্যাপ পূরণে বিশ্ববিদ্যালয় বড় ভূমিকা রাখতে পারে—প্রি-ইনকিউবেশন, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক সিড ফান্ড, অ্যালামনাই অ্যাঞ্জেল নেটওয়ার্ক, ইন্ডাস্ট্রি–স্পন্সরড ল্যাব/ক্যাপস্টোনইত্যাদির মাধ্যমে।

বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে প্রস্তুত হবে? পাঁচটি বাস্তব করণীয়

উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে “ডিগ্রি-সেন্ট্রিক” থেকে “আউটকাম-সেন্ট্রিক” হতে হবে—অর্থাৎ শিক্ষার্থী শেষে কী করতে পারবে, সেটাই মুখ্য।

১) কারিকুলামে বাধ্যতামূলক ‘স্টার্টআপ স্টুডিও’/ক্যাপস্টোন প্রজেক্ট
শিক্ষার্থীরা দল গঠন করবে, বাস্তব সমস্যা বেছে নেবে, ৩০–৬০ জন সম্ভাব্য গ্রাহকের সাক্ষাৎকার নেবে, MVP (ছোট সংস্করণ) বানাবে, বিক্রি/টেস্ট করবে—এবং রিপোর্ট করবে কী শিখল, কী বদলাল।

২) ইনকিউবেটরকে ইভেন্ট নয়, সার্ভিস-সেন্টার বানানো
ইনকিউবেটরে নিয়মিত মেন্টর আওয়ার, লিগ্যাল/অ্যাকাউন্টিং ক্লিনিক, মার্কেটিং ক্লিনিক, পিচ ডেক রিভিউ—এসব চালু করতে হবে।

৩) ইন্ডাস্ট্রি পার্টনারশিপ: SME–স্টার্টআপ–করপোরেট একসাথে
শুধু বড় কোম্পানি নয়, স্থানীয় উদ্যোক্তা, জেলা শহরের SME, অনলাইন বিক্রেতা—এদের সঙ্গে কোর্সভিত্তিক কাজ হলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব বাজার বুঝবে।

৪) ক্ষুদ্র তহবিল ও প্রতিযোগিতাভিত্তিক অনুদান (Seed Fund)
বিশ্ববিদ্যালয়/অ্যালামনাই/ব্যাংক-CSR সহায়তায় ছোট তহবিল—যেমন ২০–৫০ হাজার টাকা—শিক্ষার্থীদের পাইলট চালাতে বড় ভূমিকা রাখে। তহবিলের শর্ত হবে “অগ্রগতি ও স্বচ্ছতা”—ইভেন্টে ছবি নয়, বাজারে ফলাফল।

৫) উদ্যোক্তামুখী স্কিলস: ডিজিটাল + ফাইন্যান্স + যোগাযোগ
ডিজিটাল মার্কেটিং, বেসিক ডেটা অ্যানালিটিক্স, হিসাব-ব্যবস্থাপনা, প্রাইসিং, কাস্টমার সার্ভিস, নেগোশিয়েশন, প্রেজেন্টেশন—এসবকে ছোট ছোট মডিউলে বাধ্যতামূলক করা দরকার।

সামাজিক সহায়তা ছাড়া উদ্যোক্তা হবে না
বাংলাদেশে অনেক শিক্ষার্থী পরিবারিক ও আর্থিক কারণে ঝুঁকি নিতে পারে না। উদ্যোক্তা শিক্ষা তখন “শুধু সুবিধাভোগীদের জন্য” হয়ে যেতে পারে। তাই দরকার সহায়তা: ডিভাইস/ইন্টারনেট, কাজের জায়গা (কো-ওয়ার্কিং স্পেস), ট্রান্সপোর্ট/ফিল্ডওয়ার্ক সাপোর্ট, এবং মেন্টর নেটওয়ার্ক। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, নেটওয়ার্কিং সুযোগ এবং পরিবার-সচেতনতা কর্মসূচিও গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ কথা
বাংলাদেশে ইন্টারনেট গ্রাহক কোটি ছাড়িয়েছে এমএফএস লেনদেন ট্রিলিয়ন টাকার স্কেলে স্টার্টআপে বড় ডিলও হচ্ছে অর্থাৎ বাজার প্রস্তুত। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: বিশ্ববিদ্যালয় কি শিক্ষার্থীদের শুধু সিভি–বানানো শেখাবে, নাকি সমস্যা সমাধান করে মূল্য তৈরি করার সক্ষমতা দেবে? তাই, উদ্যোক্তা তৈরির লড়াইটা শেষ পর্যন্ত কারিকুলাম–ক্লাসরুম–ক্যাম্পাস কালচারের লড়াই।অর্থ্যাৎ, উদ্যোক্তা তৈরির প্রশ্নে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা এখন আর ঐচ্ছিক নয়—কৌশলগত। বাংলাদেশ যদি কর্মসংস্থান বাড়াতে চায়, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে চায়, এবং তরুণদের শক্তিকে কাজে লাগাতে চায়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়কে উদ্যোক্তা তৈরির কারখানা—অর্থাৎ সক্ষমতা তৈরির কেন্দ্র—হতে হবে।সেমিনার, ক্লাব, পোস্টার—এসব দরকার, কিন্তু যথেষ্ট নয়। দরকার বাস্তব বাজারে নামা, হাতে-কলমে করা, ব্যর্থতা থেকে শেখা, এবং মেন্টর-সহায়তায় আবার দাঁড়ানো। বিশ্ববিদ্যালয় যদি এই পরিবেশ তৈরি করতে পারে, তবে উদ্যোক্তা হবে “বিকল্প” নয়—বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম মূল চালিকা শক্তি।

আমিনুল হক রাসেল।
পিএইচডি ফেলো, ফিনান্সবিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।

এবং

সহকারী অধ্যাপক, ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব আইটি।
ড. মুহাম্মদ মঞ্জুর মুর্শেদ ভূঁইয়া
ডিন, ব্যবসা প্রশাসন।
এবং
অধ্যাপক, ফিনান্স বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

 

ad

পাঠকের মতামত