354898

সাত কিশোরীর স্বপ্নভঙ্গ বাল্যবিয়েতে

করোনাকালে বাল্যবিয়েতেই স্বপ্নভঙ্গ হলো দেশসেরা সাত কিশোরী ফুটবলারের। তারা হলো- কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার পাথরডুবি ইউনিয়নের বাঁশজানি ফুটবল (নারী) দলের অধিনায়ক দশম শ্রেণির ছাত্রী স্বরলিকা, তার সহ খেলোয়াড় দশম শ্রেণির জয়নব, নবম শ্রেণির শাবানা, অষ্টম শ্রেণির রত্না, আঁখি, শারমিন ও আতিকা। কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে অব্যাহতভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা এবং দারিদ্র্যের কারণে অভিভাবকরা তাদের বাল্যবিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানা গেছে।

ভূরুঙ্গামারী উপজেলার সীমান্তবর্তী পাথরডুবি ইউনিয়নের সাবেক ছিটমহল দীঘলটারী দক্ষিণ বাঁশজানি গ্রামে স্বরলিকার বাড়ি। ২০১৭ সালে বাঁশজানি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কিশোরী ফুটবল দলটি ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। দলের ২০ কিশোরী টর্নামেন্টে অংশ নিতে ঢাকায় গিয়েছিল। কোভিড-১৯ মহামারীতে সেই দলের ৭ জনকে বিয়ে দেয় তাদের পরিবার।

স্বরলিকা বলেন, ‘ইচ্ছে ছিল জাতীয় দলে খেলার। দেশের জন্য কিছু করার। কিন্তু সেই স্বপ্ন শেষ বিয়ে হয়ে যাওয়ায়। সমাজের নানাজন নানা কথা বলে। বলে মেয়েরা ফুটবল খেললে বিয়ে হবে না। আর্থিক অনটনসহ এমন অনেক কারণেই বাবা-মা বিয়ে দিয়েছেন। আমার টিমের অনেকেরই বিয়ে হয়ে গেছে।’

স্বরলিকার বাবা শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি কৃষিকাজ করি। পাঁচজনের সংসার চালাই। সীমান্ত এলাকায় কোনো কাজকাম নাই। করোনার জন্য অভাব আরও বেশি হইছে। ভালো ঘর পাইছি। ডিমান্ড ছাড়াই বিয়া দিছি মেয়ের।’ তিনি আরও বলেন, গত ৫ মার্চ একই উপজেলার পার্শ্ববর্তী শিলখুড়ি ইউনিয়নের মোটর মেকানিক কামরুল ইসলামের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে স্বরনিকার।

টিমের অপর খেলোয়াড় লিশা মনির মা আমিনা বেগম বলেন, ‘এই তিন বছর থাকি কেউ খোঁজ নেয়নি। স্কুল বন্ধ, পড়াশোনা নাই। মেয়েরা বসি থাকে। ভালো ছেলে পাইছে, স্বরলিকার বিয়ে দিছে ওর বাবা-মা। আমিও ভালো ছেলে পাইলে আমার মেয়েকেও বিয়ে দেব। আমাদের সামর্থ্য নাই যে, মেয়েকে পড়াশোনা করে খেলোয়াড় বানামো।’

খেলোয়াড় লিশা মনি বলল, ‘আমি বাঁশজানি টিমে খেলেছি। আগের দিনের সেই অনুভূতি বলার মতো না। ঢাকা থেকে খেলে আসার পর আমাদের কেউ কোনো খোঁজখবর রাখেনি। গেল তিন মাসে আমাদের টিমের ৭ জনের বিয়ে হয়ে গেছে।

শাবানার বাবা অটোচালক সাইফুর রহমান দুঃখ করে বলেন, ‘এত দূরে মেয়েরা খেলতে গেছিল। শুধু যাওয়া-আসা আর থাকা-খাওয়া ছাড়া তারা কিছুই পায়নি। উল্টো খেলতে গেলে মেয়েদের পেছনে টাকা খরচ করতে হতো। করোনার আগেও রংপুর ও ঢাকা খেলে আসছে। কোনো সহযোগিতা পায় নাই। করোনার মধ্যে স্কুল বন্ধ, আয় কমি গেছে। সংসারে খরচ বাড়ছে। তাই ভালো সম্বন্ধ আসছে, মেয়ের বিয়ে দিছি।’

ফুটবলার সংগঠক নোমী নোমান বলেন, ‘২০১৭ সালে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপে হ্যাটট্রিক কন্যা-খ্যাত দেশের সেরা খেলোয়াড় স্বরলিকা পারভীন। স্বরলিকা ও তার দল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার নিয়েছিল। ফুটবল মাঠের পরিবর্তে স্বরলিকা ও তার দলের ৭ কিশোরী বিয়ে করে সংসার করছে।’

ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বাঁশজানি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ফুটবল প্রশিক্ষক আতিকুর রহমান খোকন বলেন, স্বরলিকাসহ বাঁশজানি নারী দলের ৭ জনের বিয়ে হয়ে গেছে। আমাদের অগোচরেই এসব বিয়ে দিয়েছে তাদের পরিবার।

বাঁশজানি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কায়সার আলী বলেন, করোনার সময় স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর তেমনটা নেওয়া সম্ভব হয়নি। অনেকের বিয়ের বিষয়টি আমি পরে জানতে পেরেছি। আসলে বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর আমাদের কিছু করার থাকে না।

পাথরডুবি ইউপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আরফান আলী বলেন, ‘স্থানীয় প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধির অগোচরেই বাঁশজানি দলের অনেকেরই বিয়ে হয়ে গেছে। সরকারি-বেসরকারিভাবে কিশোরী খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণসহ প্রত্যন্ত সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বৃদ্ধি করা গেলে বাল্যবিয়ের হার কমে আসবে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপক কুমার দেব শর্মা জানান, কিশোরী ফুটবলারদের বাল্যবিয়ের বিষয়ে অবগত ছিলেন না। কেউ তাকে জানায়নি। তাকে কেউ জানালে তিনি আইনি পদক্ষেপ নিতে পারতেন। তবে বাকি খেলোয়াড়রা যেন বাল্যবিয়ের শিকার না হয়, সে জন্য নজর রাখার পাশাপাশি তাদের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

প্রসঙ্গত বঙ্গমাতা গোল্ডকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ রাজশাহীর গোদাগাড়ীর সোনাদীঘি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ৩-১ গোলে হারায় বাঁশজানি দল। সেখানে হ্যাটট্রিক করে অধিনায়ক স্বরলিকা। সেমিফাইনালে হেরে গিয়ে স্থান নির্ধারণী ম্যাচে চট্টগ্রামের বাঁশখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ৪-১ গোলে হারিয়ে তৃতীয় হয় বাঁশজানি দল। এখানেও হ্যাটট্রিক করে কিশোরী স্বরলিকা। তাদের গ্রামটি পরিচিতি পায় নারী ফুটবলার গ্রাম হিসেবে। স্বরলিকার নেতৃত্বে আসে নানা সাফল্যের মেডেল, ক্রেস্ট ও কাপ। ভারত-বাংলাদেশ বিলুপ্ত ছিটমহলের নতুন বাংলাদেশিদের কাছে পাওয়া প্রথম উপহার আসে স্বরনিকা পারভীনের হাত ধরেই। করোনার দুর্যোগে সম্ভাবনাময়ী এই দলের কোনো খোঁজখবর না রাখায় দারিদ্র্যের কষাঘাতে বাধ্য হয়েই তাদের পরিবার থেকে বাল্যবিয়ে দেওয়া হয়েছে। ৭ কিশোরী খেলোয়াড় বয়স কম থাকায় নিবন্ধন (রেজিস্ট্রি) করতে না পেরে শুধু গ্রামীণ আর ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে দেওয়া হয়েছে।

 

ad

পাঠকের মতামত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *