350803

নতুন করোনার ভয়ঙ্কর আকারে ছড়ানোর শঙ্কা

নিউজ ডেস্ক।। যুক্তরাজ্যে করোনার যে নতুন রূপ পাওয়া গেছে, তার কাছাকাছি একটি শক্তিশালী ভাইরাসের অস্তিত্ব মিলেছে বাংলাদেশেও। এর আগে এটি দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস, ভারত, হংকংসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে ছড়ানোর খবর পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকরা বলছেন, করোনার নতুন এ ধরনটি এখনো প্রাণঘাতী নয়, তবে এর সংক্রমণ ক্ষমতা আগের রূপটির চেয়ে অনেক বেশি। তাই এখনই এটি রুখতে পদক্ষেপ না নিলে তা গোটা দেশে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়তে পারে।

তবে এর মধ্যেই করোনার নতুন রূপের সন্ধান পাওয়ার পর গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে যুক্তরাজ্য ফেরত যাত্রীদের ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এ ধরনের যাত্রীদের অনুরোধ করা হয়েছে, ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী জানিয়েছেন, পর্যবেক্ষণসাপেক্ষে প্রয়োজনে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ফ্লাইট বন্ধ করে দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) জিনোমিক রিসার্চ ল্যাবরেটরির এক দল গবেষক জানিয়েছেন, বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের পূর্ণাঙ্গ জীবননকশা (হোল জিনোম সিকোয়েন্স) উন্মোচন করে বিজ্ঞানীরা বলছেন- এটি এখনো অতটা ভয়ঙ্কর নয়। এর প্রভাব কতটুকু, সে সম্পর্কে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। করোনা ভাইরাসে মোট

২৮টি প্রোটিন থাকে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে স্পাইক প্রোটিন, যার মাধ্যমে মূলত ভাইরাসটি বাহককে আক্রমণ করে। এই স্পাইক প্রোটিনে ১ হাজার ২৭৪টি অ্যামাইনো অ্যাসিড থাকে। এর মধ্যে ‘ডি৬১৪জি’ নম্বর অ্যামাইনো অ্যাসিডটি আগে থেকেই বাংলাদেশে সক্রিয় ছিল। নতুন আরও দুই সক্রিয় অ্যামাইনো অ্যাসিডের নাম ‘পি৬৮১আর’ এবং ‘ডি১১১৮ আর’। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ৪৮৩টি করোনা ভাইরাসের পূর্ণাঙ্গ জিন নকশা বের করা হয়েছে।

বিসিএসআইআরের জিনোমিক রিসার্চ ল্যাবরেটরির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. সেলিম খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘নতুন পাওয়া দুটি ধরন বাংলাদেশসহ পাঁচটি দেশের ১৬ জায়গায় পাওয়া গেছে। এটিও বেশ স্বতন্ত্র। সারাবিশ্বেই করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। এখন শীতের মৌসুম। এ ধরনটি কতটা শক্তি নিয়ে কীভাবে প্রভাব ফেলবে, আদৌ সে সম্পর্কে এখনো আমরা জানি না।’

বিসিএসআইআরের গবেষকরা জানিয়েছেন, দেশের করোনা ভাইরাসটির গতিপথ কোন দিকে যাচ্ছে, সেটির গবেষণায় আরও ৭০০টি করোনা ভাইরাসের পূর্ণাঙ্গ জিন নকশা বের করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দেশে করোনা ভাইরাসের গতিপথ কোন দিকে ও কতটা শক্তিশালী জানতে চাইলে সেলিম খান বলেন, ভাইরাসটি খুব দ্রুত পরিবর্তন হয়। এটি আরও রূপান্তরিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এর চরিত্র কেমন হবে বা শক্তিশালী হবে কিনা, তা বলা মুশকিল। এর জন্য করোনা ভাইরাসের পূর্ণাঙ্গ জীবননকশা উন্মোচনের গবেষণাটি চালিয়ে যেতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজীর আহমদ আমাদের সময়কে বলেন, ‘সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যে শতকরা ২৫ ভাগ করোনায় আক্রান্ত হতো- এখন তা ৮০ ভাগে পৌঁছেছে। এতে পরিষ্কার যে, ভাইরাসের নতুন ধরনটির সংক্রমণ ক্ষমতা অনেক বেশি। শিশুদের ক্ষেত্রে এর সংক্রমণ বেশি হচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্যজুড়ে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। অনেক দেশ যুক্তরাজ্যের সঙ্গে তাদের ফ্লাইট বাতিল করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ ধীর চলো নীতি নিয়েছে। আমার মনে হয়, এটি নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। আপাতত যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ফ্লাইট বন্ধ করতে হবে, নইলে তা আগুনের মতো ছড়াবে।’

অবশ্য যুক্তরাজ্য থেকে ছড়ানো করোনার এ প্রজাতিটি কতটুকু মারাত্মক তা নিয়ে মতপার্থক্য আছে। ভারতীয় গবেষকরা বলছেন, আগেই জানা গেছে করোনার নতুন এই স্ট্রেনটি ৭০ গুণ বেশি দ্রুত ছড়ানোর ক্ষমতা রাখে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার মতো জনবহুল অঞ্চলে করোনার এ প্রজাতিটি ছড়ালে তা বিবর্তিত হয়ে মারাত্মক হয়ে উঠলেও উঠতে পারে। এ ছাড়াও এ ভাইরাস নিয়ে চিন্তার আরেকটি বড় কারণ আছে। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে যে করোনা গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়েছিল, তার মূল শিকার হয়েছিলেন বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা। কিন্তু এবারের প্রজাতিটি টার্গেট করছে তরুণ ও শিশুদের। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. সুবর্ণ কুমার গোস্বামী জানান, এ নতুন প্রজাতির ভাইরাসটি এতই শক্তিশালী যে তা মানুষের জিনের কোড মুছে দিচ্ছে। পাকিস্তানের ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সের উপাচার্য ডা. জাভেদ আকরাম বলেন, আমি বলছি না এটা অনেক মারাত্মক; তবে একটি জনগোষ্ঠীর ক্ষতি করার ক্ষমতা ভাইরাসটি রাখে। এটি তরুণ এবং শিশুদের সহজেই আক্রমণ করছে।

এর আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, করোনার নতুন ধরন ভাইরাস বিবর্তনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, মাস্ক পরা, শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিতসহ আগে যেসব সতর্কতামূলক পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছিলÑ সেসব পালন করলে নতুন ভাইরাসটিকেও রোখা সম্ভব।

ইতোমধ্যে এ ভাইরাসের সংক্রমণ যাতে না ছড়ায়, সে জন্য ৫০টির বেশি দেশ যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। অনেক দেশ যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে স্থগিত করেছে বিমান চলাচল। ইউরোপে জনসাধারণের চলাচল ও জমায়েতের ওপর আবার আরোপ করা হয়েছে কড়াকড়ি। তবে বাংলাদেশ এখনো যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ফ্লাইট চালু রেখেছে। বিশেষজ্ঞদের অনেকে ফ্লাইট বন্ধের পরামর্শ দিলেও সরকার এখনো সে পথে হাঁটছে না। বরং সরকার বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গতকালও যুক্তরাজ্য থেকে ১৬৫ জন যাত্রী সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দরে এসেছেন। যদিও বিমানবন্দর থেকেই তাদের হোম কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী বলেছেন, ‘পর্যবেক্ষণসাপেক্ষে প্রয়োজনে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ফ্লাইট বন্ধ করে দেওয়া হবে। এখন সাত দিন বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনের সঙ্গে তাদের কেয়ার দেওয়া হচ্ছে। বিমানবন্দর, স্বাস্থ্য, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সবাই আমরা অবগত। এখন আমরা বিশেষ নজরদারি করছি।’ গতকাল শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপত্তা মহড়ায় অংশ নিয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এ কথা জানান।

জানা গেছে, বাংলাদেশে করোনার আরেকটি নতুন ধরনের সন্ধান পাওয়ার পর গতকাল আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সিদ্ধান্ত হয়, যুক্তরাজ্য থেকে যারা দেশে ফিরবেনÑ তাদের সাত দিনের পরিবর্তে ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক হোম কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। তবে তারও আগে বাংলাদেশে ঢুকতে তাদের অবশ্যই আসতে হবে করোনার নেগেটিভ সনদ নিয়ে। দেশে এসে এসব যাত্রী হোম কোয়ারেন্টিনে থাকছেন কিনা বা স্বাস্থ্যবিধি ও সরকারি নির্দেশ মেনে চলছেন কিনা, তা তদারকি করবে স্থানীয় প্রশাসন। এ ব্যাপারে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ডিসিদের চিঠি দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে বিভিন্ন দেশের আবিষ্কৃত কোভিড ১৯-এর টিকা নতুন ভাইরাসের ক্ষেত্রে কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বিতর্কে জড়িয়েছেন। অনেকে বলছেন, টিকা নতুন ধরনের এ ভাইরাসের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না। কারও কারও দাবি, করোনার নতুন রূপ টিকার কার্যকারিতা নষ্ট করতে পারবে না। বাংলাদেশ এরই মধ্যে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি যে টিকা কিনতে চুক্তি করেছে, তা করোনার নতুন ধরনটির বিরুদ্ধেও কার্যকর বলে দাবি করা হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে অ্যাস্ট্রাজেনেকার প্রতিনিধি জানান, আমাদের টিকায় (এজেডডি১২২২) সার্স-সিওভি-২ ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের জেনেটিক উপাদান রয়েছে। আর করোনার নতুন যে ধরন শনাক্ত হয়েছে, সেটির জেনেটিক কোড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছেÑ এর স্পাইক প্রোটিনের কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন হয়নি।

 

ad

পাঠকের মতামত