350075

সীমান্তবর্তী শেষ গ্রামটিও বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে!

৯০ বছরের বৃদ্ধ শমসের আলী। পদ্মা নদীর পাড়ে বসে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন পানির দিকে। নদীতে সামান্য ঢেউ খেলা করছে তখন। সেই দিকে তাকিয়ে আপন মনে কিছু একটা ভাবছেন তিনি।

তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, খুব শিগগিরই নিজের ঘর বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র যেতে হবে তাকে। কিন্তু কোথায় যাবেন তা নিজেও জানেন না শমসের আলী। কারণ অল্প কিছু দিনের মধ্যেই তার সাজানো ঘরটি হয়তোবা হারিয়ে যাবে সর্বনাশা পদ্মার বুকে।

শুধুমাত্র তার ঘরই নয়, হয়তোবা হারিয়ে যাবে তাদের পুরো গ্রামটিও। তাদের গ্রামকে ভেঙে দিয়ে পদ্মা ঢুকে যাবে প্রতিবেশী দেশ ভারতে। এমন আশঙ্কাই করছেন স্থানীয় বাসিন্দাসহ সংশ্লিষ্টরা।

সীমান্তবর্তী সেই গ্রামের নাম চর খানপুর। পদ্মার নদী ভাঙ্গনে খানপুর গ্রামের বেশির ভাগ অংশ বিলীন হয়ে গেছে। বছর দশেক আগেও এই গ্রামে ৩০ হাজার মানুষের বসবাস ছিল। এখন খানপুর গ্রামের বাসিন্দা মাত্র দেড় হাজার। পদ্মা নদী কেড়ে নিয়েছে বসতবাড়ি। তাই গ্রাম থেকে শহরে চলে গেছে হাজার হাজার মানুষ।

এই গ্রামের সীমান্তের সঙ্গেই কাতলামারি নামের অপর একটি গ্রাম ছিল। গ্রামটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার অংশ। ওই কাতলামারি গ্রামও পদ্মার ভাঙ্গনে প্রায় বিলীন। নেই কোনো বসতবাড়ি। খালি পরে আছে প্রায় ৫০ একর পতিত জমি।

৫০ বছর বয়সী কামরুল ইসলাম নামের গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও এখানে পাকা দালান ছিল। পাকা রাস্তা ছিল। বড় বড় বাড়ি ঘরও ছিল। বসতি ছিল হাজার ত্রিশেক মানুষের। মাঠে ধানের আবাদ থেকে শুরু করে শীতকালীন সবজির চাষ হতো এখানে। ছেলে মেয়েরা নিয়মিত স্কুলেও যেত। কিন্তু উত্তাল পদ্মায় পাড় ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে গত বছর খিদিরপুরের শেষ চিহ্ন সীমান্ত পিলারও নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘খিদিরপুরে আমার ১০ বিঘা ধানি জমি ছিল। নিজেরই একটা পাকা বাড়ি ছিল। কিন্তু সব হারিয়ে এখন পরিবার নিয়ে খানপুরে অন্যের জমিতে কুঁড়েঘর তুলে বসবাস করছি। পদ্মার ভাঙ্গন দেখে বোঝা যাচ্ছে আগামী বর্ষা মৌসুমে খানপুর গ্রামের বসতবাড়িগুলোও বিলীন হয়ে যাবে। তখন এই গ্রামেরও কোন অস্তিত্ব থাকবে না।’

আবদুল মান্নান নামের এক বাসিন্দা বলেন, ‘সরকার যদি বেড়িবাঁধ করে দিত তাইলে এত ভাঙনের কবলে পড়তে হতো না। আমরা চাই আমাদের ভিটা-মাটিটুকু টিকিয়ে রাখতে। আমরা চাই না এই ভূমি বিলীন হয়ে ভারতের দিকে চলে যাক। বর্ষাকালে যে পরিমাণ ভাঙন ধরে তাতে খুব বেশি সময় লাগবে না বিলীন হতে। এই সরকারের আগে প্রায় ২৫শ’ ঘর দিয়েছিল। ওই ঘর, ওই বাড়ি সব বিলীন হয়ে যায়। অনেক কষ্ট আমরা বেঁচে আছি।’

কামাল হোসেন নামের এক প্রবীণ ব্যক্তি বলেন, ‘আমরা এই গ্রামের সবাই কৃষক। আমরা ধান, মসুর ডাল, কালাই চাষ করি। আমরা চাষাবাদ করে যে সবজি বাজারে নিয়ে যাই। তার লাভের বেশি অংশ চলে যায় নৌকা বা ট্রলার ভাড়ায়। এই গ্রাম থেকে রাজশাহী শহরে যেতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। নৌকা বা ট্রলার ভাড়াও অনেক বেশি।’

তিনি আরও বলেন, ‘গ্রামে যেহেতু মানুষের সংখ্যা কম। তাই স্থানীয় কোন বাজার বসে না। সকল প্রয়োজনেই ছুটে যেতে হয় রাজশাহীতে।’

একই ধরনের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন বিজিবি খানপুর ক্যাম্পের কমান্ডার মানিক দেবনাথ। তিনি বলেন, ‘পদ্মার ভাঙ্গনে এই গ্রামের অধিকাংশ তো চলে গেছে। আগামীতে এমন ভাঙ্গনের ফলে এই অল্প জায়গাটুকুও বিলীন হয়ে যেতে পারে। তখন এই গ্রামের কোন অস্তিত্বই হয়তো থাকবে না।’

বিজিবির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘ভাঙ্গনের ফলে হয়তোবা আমাদের এই ক্যাম্পও থাকবে না। আর এই অংশটুকু ভেঙ্গে গেলে পরের জায়গাটা ভারতের। তখন নদী গ্রামটি ভেদ করে ভারতে প্রবেশ করবে।’

সূত্র: দৈনিক আমাদের সময়

ad

পাঠকের মতামত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *