342637

ভারতে প্রভাব ফেলছে ‘দিরিলিস: এরতুগ্রুল’, নাম রাখার হিড়িক

কাশ্মীরের সোপোর, পুলওয়ামা বা বারামুলাতে এর আগে ‘এরতুগ্রুল’ নামে কেউ ছিল না। অথচ গত তিন বছরে ভ্যালিতে যে শিশুরা জন্মেছে, সেই নবজাতকদের অনেকেরই নাম রাখা হয়েছে এরতুগ্রুল।

শীতের মরশুমে কাশ্মীরে দেখা যাচ্ছে এরতুগ্রুল স্টাইলে’র টুপিও। গাঢ় ওয়াইন-রঙা এই ধরনের মাথা ও কান-ঢাকা ফার বা পশমী টুপি তুরস্কে খুব জনপ্রিয় হলেও কাশ্মীরে তা কিন্তু কখনওই পরার কোনো চল ছিল না। এই পরিবর্তনের পেছনে আছে কাজ করছে অসম্ভব জনপ্রিয় তুর্কী টেলি-ড্রামা, যার নাম ‘ডিরিলিস: এরতুগ্রুল’।

ডিরিলিস শব্দের অর্থ রেজারেকশন বা পুনর্জন্ম, আর তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার আগের ইতিহাস নিয়ে তৈরি এই টানটান নাটকে কাশ্মীর এখন একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ। বিশেষ করে সেখানকার তরুণ প্রজন্ম।

ত্রয়োদশ শতকে ওঘুজ তুর্কীদের নেতা এবং সে দেশের কিংবদন্তী নায়ক এরতুগ্রুলের জীবন নিয়েই বাঁধা হয়েছে এর গল্প। এই এরতুগ্রুল ছিলেন অটোমান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ওসমানের পিতা। মুসলিম বিশ্বের নানা দেশে দারুণ জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর এই এপিক তুর্কী ড্রামাটি এখন কাশ্মীর-সহ ভারতের মুসলমানদের মধ্যেও ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

পাঁচটি সিজনে পরিব্যাপ্ত ৪৪৮টি এপিসোড বা পর্বের এই বিশাল উপাখ্যান অনেকে মাত্র এক-দেড় মাসের মধ্যেও পুরোটা দেখে ফেলেছেন।

এরতুগ্রুল কীভাবে ভারতে এতটা জনপ্রিয়তা পেল, তা নিয়ে বিশদে সমীক্ষা করেছেন হায়দ্রাবাদের মৌলানা আজাদ জাতীয় উর্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন অধ্যাপক – সমাজতত্ত্ব বিভাগের শাহীদ মিও এবং ইতিহাস বিভাগের ইকরামুল হক।

অধ্যাপক শাহীদ মিও বলেন, ‘কাশ্মীরে ইন্টারনেটের কী হাল সবাই জানেন। আমি যখন কাশ্মীরি ছাত্রদের আজকাল অনলাইনে ক্লাস নিই, ব্যান্ডউইথের সমস্যায় তারা আমাকে ঠিকমতো শুনতেই পান না।‘

অথচ সেই একই ছাত্ররা আমাকে বলেন, ‘এরতুগ্রুলের একটা এপিসোডও ছাড়া যাবে না। দুর্বল নেট নিয়েই, বাফারিং সহ্য করেই তারা হুমড়ি খেয়ে পড়েন মোবাইল ফোনে এই তুর্কী নাটক দেখার জন্য!‘ বস্তুত ২০১৭ সালের অক্টোবরে নেটফ্লিক্স তুরস্কের এই ঐতিহাসিক ড্রামাটি অনলাইনে ‘স্ট্রিম’ করতে শুরু করার পরই ভারতে তা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তুমুল সাড়া ফেলে।

অধ্যাপক ইকরামুল হকের কথায়, ‘আজকের ভারতবর্ষে মুসলিমরা যে আত্মপরিচয়ের সঙ্কট বা আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগছেন, সেই শূন্যতার জায়গা থেকেই হয়তো তারা ভিনদেশি এই ঐতিহাসিক উপাখ্যানের সঙ্গে নিজেদের অনেকটা ‘রিলেট’ করতে পারছেন – আর সে কারণেই এরতুগ্রুল এদেশেও এতটা জনপ্রিয় হয়েছে।‘

কিন্তু ভারত ও তুরস্কের কূটনৈতিক সম্পর্ক যখন অত্যন্ত খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, তখন তুরস্কেরই একটি টেলি-ড্রামা ভারতীয় মুসলিমদের মধ্যে এতটা সাড়া ফেলার আর কি কোন রহস্য রয়েছে?

গবেষণা রিপোর্টটির অন্যতম লেখক ড. হক বলেন, ‘একটা ফ্যাক্টর তো এটার টানটান গল্প, নাটকীয়তায় ভরা প্লট, দারুণ অভিনয় আর দুর্ধর্ষ স্পেশাল এফেক্টস। এরতুগ্রুল একবার দেখতে বসলে সেটা ছেড়ে ওঠাই মুশকিল। ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণে ভারতীয় মুসলিমরাও হয়তো এই তুর্কী গল্পটা ভালবেসে ফেলছেন, একাত্ম বোধ করছেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘কিন্তু তার মানে এই নয় যে তুর্কী প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের প্রতি এর মাধ্যমে তাদের কোনও মুগ্ধতা তৈরি হচ্ছে। আসলে এটা শেষ পর্যন্ত ড্রামা-ই, কোনও বিশেষ ব্যক্তি বা কূটনীতির সঙ্গে এর তেমন সম্পর্ক আছে বলে মনে করি না।’

সৌজন্য: বিবিসি বাংলা।

ad

পাঠকের মতামত