342109

ট্রাকচালক সেজেও রক্ষা হলো না দুই পুলিশের ভাইয়ের সেই খু’নির

বাসা থেকে ডেকে নিয়ে স্কুলছাত্র সোহরাব হোসেন মুসা হ’ত্যাকা’ণ্ডের ‘মাস্টারমাইন্ড’ কবির মিয়া ওরফে ডা’কাত কবির ওরফে শ্যামল (৪০) অবশেষে ধরা পড়েছে পুলিশের জালে। হ’ত্যাকা’ণ্ডের পর নাম-পরিচয় পাল্টে শ্যামল নামে গাজীপুরে ট্রাক চালক হিসেবে তিন বছর আত্মগোপনে ছিলেন দু’ধ;র্ষ এই খু’নি ও মাদকব্যবসায়ী। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। গত শুক্রবার গাজীপুরের শ্রীপুর থানাধীন মাওনা বহেরারচালা এলাকা থেকে কবিরকে গ্রে’প্তার করে পুলিশের অ’পরাধ বিভাগের (সিআইডি) ঢাকা মেট্রোর একটি টিম। জিজ্ঞাসাবাদে হ’ত্যাকা’ণ্ডের দায় স্বীকার করেছেন তিনি।

২০১৭ সালের ১২ অক্টোবর রাতে নরসিংদীর বেলাবো উপজেলার কুকুরমারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে পেঁপে বাগানে গলা কে’টে হ’ত্যা করা হয় পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে আইজির দপ্তরে কর্মরত কনস্টেবল মো. ফরহাদ ও কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশে কর্মরত কনস্টেবল মো. ফয়সালের ভাই ১৮ বছরের টগবগে তরুণ সোহরাবকে। তিন বছর আগে নরসিংদীর বেলাবো উপজেলার খামারেরচর গ্রামের এই স্কুলছাত্রকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে নৃশংসভাবে গলা কে’টে হ’ত্যা করা হলেও জানা গেছে ঘটনার সূত্রপাত ৭ বছর আগে। ২০১৩ সালের ১০ জুলাই বেলাবোর খামারেরচরে সবজিক্ষেত থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ২২ বছর বয়সী এক তরুণীর লাশ। পাশবিক নির্যাতনের পর খুন করা ওই তরুণীর লাশের পাশ থেকে উদ্ধার করা হয় নিহতের এক বছরের শিশুকন্যাকে। এই শিশুটিকে আশ্রয় দেওয়াই কাল হয় মুক্তিযোদ্ধা মো. তাজুল ইসলাম মাস্টার পরিবারের। দীর্ঘ ৭ বছরেও রহস্যময় ওই নারীর খু’নিরা ধরা পড়া দূরে থাক, এখন পর্যন্ত জানা যায়নি- তার নামটি পর্যন্ত।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই ঘটনার জের ধরেই স্থানীয় সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয়েছেন ওই স্কুলছাত্র। দীর্ঘ প্রায় ৩ বছরে এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পাল্টেছে চারজন।

আজ শনিবার সিআইডির ঢাকা বিভাগ ও ঢাকা মেট্রোর ডিআইজি মো. মাঈনুল হাসান জানান, ঘাতক কবিরের বাবার নাম আব্দুল হাই। গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর বেলাবর খামারেরচরে। কবিরের সঙ্গে নরসিংদীর বেলাবো থানার ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড নারায়ণপুর ইউপি সদস্য রিনা বেগমের দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধ চলে আসছিল। ওই বিরোধের জেরে রিনা বেগমের ছেলে ফরিদকে হ’ত্যার পরিকল্পনা করে কবির। এ ঘটনা বুঝতে পেরে রিনা তার ছেলে ফরিদকে কক্সবাজার পাঠিয়ে দেন। মামলার আরেক আসামি বাচ্চু মিয়া ও রিনা বেগমের ছেলে সোহরাব ওরফে মূসা এক সঙ্গে রিনার বাসায় ঘুমাতো। শিপন ও বাচ্চু মিয়াকে কবির প্রস্তাব দেয়, ফরিদকে ডেকে এনে তাদের কাছে দিতে। তখন বাচ্চু মিয়া কবিরকে জানায়, ফরিদ কক্সবাজারে অবস্থান করছে। তখন কবির ফরিদের যে কোনও ভাইকে ডেকে আনার প্রস্তাব দিলে বাচ্চু মিয়া রাজি হয়নি। পরে শিপন ও কবির বাচ্চু মিয়াকে ভয় দেখায় এবং তাকে কিছু টাকা দেয়।

তিনি আরও জানান, ২০১৭ সালে ১২ অক্টোবর রাত ২টার দিকে শিপন ও কবির বাচ্চু মিয়াকে ডেকে রিনা বেগমের বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে আসে। পরিকল্পনা অনুসারে বাচ্চু মিয়া সোহরাবকে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়। তখন শিপন ও কবির সোহরাবকে জাপটে ধরে মুখে গামছা বেঁধে কুকুর মারা স্কুলের পেছনে নিয়ে যায়। শফিক ও মিলন সোহরাবের দুই পায়ে ধরে, তুহিন মাথা ধরে, শিপন ডান হাতে ধরে রাখে। প্রথমে শিপন এবং পরে কবির সোহরাবের গলায় ছুরি চালিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় নিহত সোহরাবের মা রিনা বেগম বাদী হয়ে কবিরসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে বেলাব থানায় একটি হ’ত্যা মামলা করেন। বেলাব থানা পুলিশ প্রথমে তদন্ত করে মামলাটি। পরে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে নরসিংদী জেলার পিবিআই মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব নেয়। পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুবেল শেখ মামলাটির তদন্ত করে মামলার এজাহার নামীয় আসামি কবিরসহ তিনজন এবং এজাহারের বাইরে আরও দুজনসহ মোট পাঁচ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেয়। তবে ওই অভিযোগপত্রে হত্যা’কা’ণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও আসামি কবির মিয়ার নাম থাকলেও তিনি পলাতক ছিলেন। এতে মামলার বাদী রিনা বেগম আদালতে নারাজি দিলে চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি মামলাটির তদন্তভার সিআইডিকে ন্যাস্ত করেন আদালত। পারিবারিক ও সামাজিক দ্বন্দ্বের জেরে কবির মিয়া এই হ’ত্যাকা’ণ্ডটি পরিকল্পিতভাবে ঘটান বলে স্বীকার করেছেন বলেও ডিআইজি মাঈনুল হাসান জানান।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সিআইডির ঢাকা মেট্রোর পরিদর্শক মো. নুরুল ইসলাম সিদ্দিক জানান, কবির মিয়া নরসিংদী এলাকার দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। তিনি ওই এলাকায় সব ধরনের অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। কবিরের বিরুদ্ধে দুটি হ’ত্যা মা’মলা, একটি ডাকাতি মামলা ও মারামারির ঘটনাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। তার সহযোগী হিসেবে শিপন, বাচ্চু মিয়া, শফিক, মিলনসহ বেশ কয়েকজন ছিলেন। সোহরাব হ’ত্যাকা’ণ্ডের ঘটনার তদন্তে আমরা কবিরসহ ৬ আসামির সরাসরি জড়িত থাকার তথ্য প্রমাণ পেয়েছি। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত মূল আসামি কবির মিয়া ও তার সহযোগী শফিক ও বাচ্চু মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে শফিক বর্তমানে জামিনে আছেন। বাকি আরও তিন আসামি পলাতক। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ঘাতক করিবকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে এ বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যাবে বলেও সিআইডির এই কর্মকর্তা জানান।

নিহতের পরিবারের অভিযোগ, পিবিআইয়ের চার্জশিটে বাঁচিয়ে দেওয়া হয়েছে এজাহারভুক্ত এবং ঘটনায় জড়িত বাচ্চু মিয়ার (বর্তমানে কারাগারে) ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উল্লিখিত খুনের পরিকল্পনাকারী হযরত আলী ছাড়াও এজাহারভুক্ত আসামি মো. স্বপন মিয়া, আব্দুল হাই, হৃদয় মিয়া ও মো. কাউসার মিয়াকে। উপরন্তু পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে বাচ্চু মিয়া ওরফে সাইদুলের উল্লিখিত ঘটনায় সরাসরি জড়িত ভৈরবের কালিপুরের কবিরের বন্ধু শফিক ও মিলনের সঙ্গে নামের মিল থাকায় চার্জশিটে জুড়ে দেওয়া হয়েছে বেলাবোর খামারেরচর এলাকার বাসিন্দা নিরপরাধ শফিক (বাবার নাম- দুলাল মিয়া) ও মিলনের (বাবার নাম- মো. আলাউদ্দিন) নাম। উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে চার্জশিট তৈরির অভিযোগ এনে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি আদালতে এই অভিযোগপত্রের বি;রুদ্ধে নারাজি দাখিল এবং ঘটনার পুনঃতদন্তের দাবি জানান মা;মলার বাদী।

যদিও বাদীর অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করেছেন পিবিআইয়ের নরসিংদী জেলার উপ-পুলিশ পরিদর্শক মো. রুবেল শেখ (সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা)। তিনি দৈনিক আমাদের সময়কে বলেন, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার বাচ্চু মিয়া নামে একজনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তার বয়ান এবং দীর্ঘ তদন্তের আলোকে ঘটনার সঙ্গে যাদের সম্পৃক্ততা পেয়েছি তাদের নামেই চার্জশিট প্রস্তুত করে আদালতে দাখিল করেছি। এখানে কাউকে বাঁচিয়ে দেওয়া বা নামের মিল থাকায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়নি। অভিযোগের বিষয়টি আদালতেই প্রমাণ হবে।

মামলার বাদী নিহত সোহরাবের মা রিনা বেগম জানান, ২০১৩ সালে গ্রামের একটি কাঁকরোল ক্ষেত থেকে অচেতন অবস্থায় অজ্ঞাত এক নারী ও এক বছরের কম বয়সী এক কন্যাশিশুকে উদ্ধার করা হয়। ওই নারী নরসিংদী সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওইদিন মারা যান। পরে আদালত ও পুলিশের মাধ্যমে শিশুটিকে রীনা পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়। কবির ওই নারীকে ধ;র্ষ’ণের পর কাঁকরোল ক্ষেতে বেঁধে রেখেছিল বলে স্থানীয়দের ধারণা। এ ঘটনায় কবিরকে গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু হলে গা-ঢাকা দেয় সে। একপর্যায়ে কবিরের ভাই স্বপনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ সময় কবিরের সহযোগীরা হুমকি দিয়ে বলে- আপনারা ওই শিশুটিকে আশ্রয় না দিলে পুলিশ এ গ্রামে আসত না। কবিরকে খুঁজত না। কবিরের ভাইও গ্রেপ্তার হতো না। এজন্য আপনাদের কড়া মূল্য দিতে হবে। এর পর থেকে ঘাতকরা আমার পরিবারের ক্ষতি করার চেষ্টায় ছিল। এই ক্ষোভেই কবিরসহ ওরা আমার ছেলেকে হ’ত্যা করেছে। একটি অসহায় শিশুকে লালন-পালনের মূল্য যে নিজের সন্তান হারিয়ে দিতে হবে, তা কখনো ভাবতে পারিনি। আমি হ’ত্যাকা’রীদের ফাঁসি চাই।

তদন্তের বরাত দিয়ে চার্জশিটে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের উপ-পুলিশ পরিদর্শক রুবেল শেখ উল্লেখ করেন- মুসা হ’ত্যাকাণ্ডে’র প্রায় ৬ থেকে ৭ বছর আগে রাস্তার ধারে অজ্ঞাত লাশের পাশে একটি নবজাতক শিশু পাওয়া যায়। নবজাতক শিশুর মাকে কে বা কারা হ’ত্যা করে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে যায়। এ ঘটনায় বেলাবো থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়। বেলাবো থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নবজাতক শিশুটিকে লালন পালনের দায়িত্ব দেন বাদীকে। বাদী শিশুটিকে লালন-পালন করতে থাকলে মুসা খুনের মামলার ৩ নম্বর আসামি কবির, ৪ নম্বর আসামি স্বপন মিয়া ও ৫ নম্বর আসামি আব্দুল হাই এতে বাধা দেয়। এর কারণ ৪ নম্বর বিবাদী স্বপন মিয়াকে মুসা খুনে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়। এর সূত্র ধরে কবির, স্বপন ও আব্দুল হাই মামলার বাদীকে শিশুটিকে লালন পালন করা থেকে বিরত থাকতে বলে, না হলে তাদের সমস্যা হতে পারে বলে হুমকি দেয়। সূত্রঃ দৈনিক আমাদের সময়

ad

পাঠকের মতামত