336575

বাস্তব জীবনের নায়ক কয়েকজন বাংলাদেশি তরুণ

১৯ আগস্ট বিশ্ব মানবতা দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক সংস্থা ইউএনওসিএইচএ তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে কয়েকজন ‘রিয়েল লাইফ হিরোস’র নাম। এদের মধ্যে চার বাংলাদেশিও রয়েছেন-

মাতৃত্বে নিরাপত্তার স্বপ্ন দেখেন তানিয়া আক্তার-২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময়। ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে জাতিসংঘ এবং বাংলাদেশ মিডওয়াইফারি সোসাইটির সমর্থনে আয়োজিত হচ্ছে ‘উইমেন ডেলিভার ২০১৬’ নামক একটি কনফারেন্স। সেই কনফারেন্সের আলো ঝলমলে মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের স্বপ্নের কথা, ধাত্রী হিসেবে বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে নিজের প্রত্যয়ের কথা বলেছেন বাংলাদেশি তরুণী, মিডওয়াইফ প্রতিনিধি তানিয়া আক্তার। তার সামনে বসে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা শত শত স্বপ্নবান তরুণ, আছেন বিশ্বখ্যাত অনেক মানুষ। সেই কনফারেন্স শেষে দেশে ফিরে এসে সবই চলছিল আগের নিয়মে। কিন্তু চিকিৎসা দেওয়ার প্রত্যয় যার চিন্তায়, তিনি তো চাইলেও সব দেখে নীরব থাকতে পারবেন না। ২০১৬ সালের মে মাসে দেশের উপকূলে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু। এর দুই মাস পর কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলায় উত্তর ১ নম্বর ধুরুং ইউনিয়নে নিজ কর্মক্ষেত্রে গর্ভবতী আর প্রসূতি মায়েদের সেবা দিতে পৌঁছে যান তানিয়া।

পথ পাড়ি দিয়ে তবেই না পৌঁছাতে হবে নিজ কর্মক্ষেত্রে। এই যাত্রাপথে রোয়ানুর ক্ষতি হওয়া উপকূলীয় এলাকার অবস্থা দেখে নিজের কাজ নিয়ে ভাবছিলেন। তবে ভাবা এক জিনিস, বাস্তবতা অন্য। বঙ্গোপসাগরের বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পা ফেলেই বুঝতে পারলেন বাস্তব জীবনের কাঠিন্য নিয়ে। প্রথম কর্মক্ষেত্রে পৌঁছে দেখলেন কেউ সেখানে কাজ করতে চাইতেন না বলে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি অনেকদিন ধরে বন্ধ। অন্ধকার আর ভূতুড়ে এই এলাকায় কীভাবে কাজ করবেন তা নিয়ে রীতিমত ভাবনায় পড়ে গেলেন। এমন পরিস্থিতিতে তার কাজের অভিজ্ঞতাও কম।

তানিয়া এই এলাকায় এসেছেন রিসার্চ ট্রেইনিং ম্যানেজমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি বেসরকারি সংস্থার হয়ে। শহরে বেড়ে ওঠা তানিয়ার কাছে বিদ্যুৎবিহীন প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাস করা বেশ কষ্টের ছিল। তবু যে স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়ে পথ চলছেন সেই স্বপ্ন থেকে পিছপা হলেন না। পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শকের সঙ্গে ছুটে চললেন ইউনিয়নের গ্রাম থেকে গ্রামে। নিজ বাড়িতে প্রশিক্ষণবিহীন ধাত্রীদের হাতে প্রসব করানোর ঝুঁকি আর নিজের দায়িত্ব ও সেবা সম্পর্কে এলাকাবাসীকে বোঝালেন। শুরুতে তেমন কেউ সাড়া দিচ্ছিলেন না তানিয়ার কথায়। তবে মাস গড়াতেই সবার মধ্যে কিছু পরিবর্তন এল। অনেকেই তানিয়ার কাছে নিজ থেকে এলেন। তানিয়াও বাড়ি বাড়ি গেলেন। নারীদের কাছে এক সময় হয়ে উঠলেন তাদের আপনজন, কারও মা, কারও বোন। কুতুবদিয়ার এ প্রজেক্ট শেষে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ে পালিয়ে আসা হবু মায়েদের সাহায্য করেন তানিয়া। উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শরণার্থী মায়েদের সেবা দিয়েছেন। একজন মা যখন সুস্থ সন্তান জন্ম দেন সেটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

ধাত্রীবিদ্যা নিয়ে পড়ার আগ্রহ ছিল তার ছোট থেকেই। শুরুতে এই পেশা সম্পর্কে খুব একটা ধারণা না থাকলেও দেশে বিষয়টি নিয়ে যখন ডিগ্রি পড়ানো শুরু হয় তখন প্রথম ব্যাচে ঢাকা নার্সিং কলেজে ভর্তি হন। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ধাত্রীবিদ্যায় ডিপ্লোমা ডিগ্রি নেন তানিয়া। মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার কমাতে চেষ্টা করেছেন অবিরত। ২০১৮ সালে সরকারি মিডওয়াইফ হিসেবে প্রথম কর্মস্থল ভোলায় যোগ দেন। করোনা দুর্যোগেও ছিলেন সেখানেই। বর্তমানে দায়িত্ব পালন করেছেন কুমিল্লা সদরের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।

করোনাকালে মায়েরা যখন হাসপাতালে আসছেন না তখন তাদের পরামর্শ দিচ্ছেন ফোনে। নানা প্রতিকূল অবস্থায় তার এই সেবা প্রদানকে সম্মান জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওসিএইচএ)। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে তিনি বাস্তব জীবনের একজন নায়ক।

রিজভীর নকশা বাড়িয়েছে আস্থা-৯ মে ‘বিশ্বের সেরা দশ নতুন স্থাপত্য প্রকল্প’ শিরোনাম নামে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় সাংবাদিক ও স্থাপত্য সমালোচক রোয়ান মুর যে লেখাটি দিয়েছিলেন সেখানে নাম ছিল বাংলাদেশি তরুণ স্থপতি রিজভী হাসানের। তার তৈরি করা প্রকল্পের নাম ‘বিয়ন্ড সারভাইভাল: এ সেফ স্পেস ফর রোহিঙ্গা উইমেন অ্যান্ড গার্লস’।

শরণার্থী হিসেবে আসা রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের আপন আঙিনা হিসেবে নারী ও কিশোরীবান্ধব স্থাপত্য প্রকল্পটি শুরু করেন তিনি ও তার দল। এই নকশা তৈরিতে রিজভীর ভাবনাকে সম্মান জানিয়েছে ইউএনওসিএইচএ। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে অন্যদের সঙ্গে রিজভীও বাস্তব জীবনের একজন নায়ক। বর্তমানে রিজভী কক্সবাজারে স্থপতি হিসেবে কাজ করছেন ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের (আইওএম) হয়ে। বুয়েটে স্থাপত্য বিষয়ে পড়াশোনা শেষে ২০১৭ সালে ঝিনাইদহ চলে যান। সেখানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক স্থপতি খন্দকার হাসিবুল কবিরের একটি প্রকল্পে এবং ব্র্যাকের সঙ্গে শুরু করেন প্রকল্পের কাজ। প্রকল্পের মাধ্যমে ইউনিসেফ, ইউএনএইচসিআর, ইউএনওমেন, ব্র্যাকের মতো প্রতিষ্ঠানের জন্য সাতটি সেন্টার গড়েছেন রিজভী।

উন্নয়ন সংস্থাগুলোর অনেক কর্মসূচি যেমন রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্যসহায়তা করা, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ দেয়া, শিশুদের জন্য কাজ করা, করোনাকালে মাস্ক তৈরিসহ নানা কাজ করা হচ্ছে।

তানভীর হাসান-বাংলাদেশে করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর মার্চ মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ছেড়ে নিজেদের বাড়িতে চলে গেলেও থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের ছাত্র তানভীর হাসানসহ কয়েকজন ক্যাম্পাসে থেকে প্রান্তিক মানুষকে সহায়তা করেন। গত এপ্রিলের শুরু থেকে টানা ১১৬ দিন মানবিক এ সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার পর সুনামগঞ্জের বন্যাকবলিত মানুষকে সহায়তা করতে চলে যান। বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে অর্থসহায়তা নিয়ে তিনি মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন। করোনাকালে প্রান্তিক মানুষকে সহায়তার স্বীকৃতি হিসেবে ইউএনওসিএইচএ এর পক্ষ থেকে ‘রিয়েল লাইফ হিরোস’ হিসেবে স্বীকৃতি পান তিনি।

তানভীর বলেন, ‘সারাদেশে করোনাভাইরাস শুরু হওয়ার পরে যখন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেল, তখন মানুষের জন্য কিছু করার দায়বদ্ধতা থেকে কাজটি শুরু করি। যেহেতু আমরা জনগণের করের টাকায় পড়ি, সেহেতু এই কাজটি করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। কোনো কিছু পাওয়ার আশায় কাজটি করিনি। জাতিসংঘ আমাদের উপাধি দিয়ে অনুপ্রেরণা জাগিয়েছে। এক্ষেত্রে আমরা ভবিষ্যতে মানুষের জন্য আরো কাজ করতে পারব। এ উপাধিটা শুধু আমার নয়, আমার টিমে যারা কাজ করেছে তাদের সকলের এবং বাংলাদেশের জনগণের।’

সিফাত নূর ও আঁখি-যেকোনো সংকটের সময় খাদ্য, পানি ও আশ্রয়ের মতো প্রয়োজনীয় তথ্য ও যোগাযোগ হতে হয় জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষায়। এ ক্ষেত্রে একজন অনুবাদকের কাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জটিল ও জীবনরক্ষাকারী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাংলায় অনুবাদ করেছেন সিফাত নূর। ২০২০ সালের মার্চে ট্রান্সলেটর উইদাউট বর্ডারস নামের একটি সংস্থায় কাজ শুরুর পর ১ লাখ ১৫ হাজারের বেশি বিদেশি শব্দের বাংলা অনুবাদ করেছেন তিনি। আইএফআরসি ও ইউএনএইচসিআরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার হয়ে এই শব্দগুলো অনুবাদের মাধ্যমে অনেক বেশি মানুষের কাছে জীবনরক্ষাকারী তথ্য পৌঁছে দিয়েছেন। কোভিড-১৯ নিয়ে তার করা অনুবাদের মাধ্যমে বহু মানুষ নিজেকে ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ রাখতে পেরেছেন। সিফাতের এই মানবিকতার কারণে তিনি আজ বাস্তবতার একজন নায়ক।

বাংলাদেশের আরো বহু শিশুর মতো একসময় শিশুশ্রমে নিয়োজিত আঁখিকে পুনর্বাসনে সহায়তা করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন। বয়সের কারণে সে স্কুলে না ফিরলেও সেলাই কাজের প্রশিক্ষণ পায়। প্রশিক্ষণ শেষে পাওয়া সেলাই মেশিন ও কিছু কাপড় নিয়ে স্বপ্ন দেখে নিজের গার্মেন্টস কারখানা গড়ে তোলার। বর্তমানে আঁখি তার মা ও বড় বোনের সহযোগিতায় নিজের ব্যবসা পরিচালনা করছে। দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে আঁখি মাস্ক বানানো শুরু করে। কম দামে আশপাশের দরিদ্র মানুষের কাছে এসব মাস্ক বিক্রি শুরু করে সে। সংকটের সময় মানবিকতার এ কাজে অবদান রাখায় আঁখিও একজন বাস্তবতার নায়ক।

সূত্রঃ দেশ রুপান্তর

ad

পাঠকের মতামত