331837

সাহেদ আমার সঙ্গেও প্র’তারণা করেছে!

আতাউর রহমান কাবুল: সালটির কথা মনে নেই। সম্ভবত ২০০৭–২০০৮ সাল হবে। আমার পরিচিত প্রদীপ দার মাধ্যমে ধানমন্ডির বিডিএস কুরিয়ার নামে এক প্রতিষ্ঠানের কিছু বিজ্ঞাপন ছাপালাম ইত্তেফাক, যুগান্তরসহ বিভিন্ন পত্রিকায়। বলে রাখা ভালো মিডিয়ায় চাকরির পাশাপাশি তখন আমি টুকটাক বিজ্ঞাপনেরও কাজ করতাম। তারা সারাদেশে কুরিয়ারের এজেন্সি নিয়োগ দেবে বিজ্ঞাপনটি ছিল এ সংক্রান্ত।

রাইফেলস স্কয়ার মার্কেটের উল্টোদিকে তাদের অফিসে গিয়ে পরিচিত হলাম প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার মেজর (অব.) ইফতেখার নামে একজনের সঙ্গে। এখন যিনি সাহেদ নামের প্র’তারক। তখন তার গোফ সম্ভবত ছিল না। এতো মোটাও তখন সে ছিল না। সে আমাকে বলল, প্রতিদিন বিজ্ঞাপন ছাপাতে থাকবেন আর বিল নিতে থাকবেন।‌ তাঁর কথামতো বেশ কিছু বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে যখন বিল আনতে গেলাম তখন সে নানা টালবাহানা শুরু করলো। তার অফিসে গেলে সে আমার সঙ্গে দেখা করে না। অফিসের অন্য লোকজনও এ বিষয়ে কিছু বলে না।

আমি তখন অন্য একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় কাজ করি। আমিও না’ছোড়বা’ন্দা। অবশেষে তার রুমে গিয়ে দেখা করি। সে আমাকে বলে, জানেন আমি কার সঙ্গে কাজ করেছি? সাবেক সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদের সঙ্গে একটা লম্বা টুলে কয়েকজনের সঙ্গে বসা তার একটা ছবি ল্যাপটপে আমাকে দেখালো। তখন সম্ভবত সেনাশাসকের সময় এবং মঈন ইউ আহমেদ যথেষ্ট দা’পটশালী। এটা যে ফটোশপে এডিট করা ছবি তা বুঝতে আমার সময় লাগলো না। একটা খেলনা পি’স্তলও সম্ভবত আমাকে দেখালো যে এটা সব সময় তার সঙ্গে থাকে।

আমাকে জানালো, সে বেশ কিছুদিন আগে জেল খেটেছে। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এবং ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ ভাইয়ের সঙ্গে নাকি সে জেলখানাতেও ছিল। আমার সন্দেহ হলো। এ জেড এম ডা. জাহিদ ভাইয়ের নাম্বার আমার কাছে ছিল। আমি তার রুম থেকে বের হয়ে সিড়ির ওখানে গিয়ে ডাক্তার জাহিদ ভাইকে ফোন করি। কিন্তু জাহিদ ভাই এই নামে কাউকে চিনতে পারল না। বিষয়টি তথাকথিত মেজর ইফতেখারকে গিয়ে তাৎক্ষণিক জানালে সে রে’গে গিয়ে আমাকে বলল, আপনি আবার ডাক্তার জাহিদ সাহেবকে ফোন করতে গিয়েছেন কেন?

আমি তাকে বললাম, এতকিছু বুঝিনা অথবা বোঝারও আমার দরকার নেই। আমার পাওনা টাকাগুলো দিয়ে দেন। এভাবে ক’ড়া ক’ড়া কথা বললে একদিন ৫ হাজার, আরেকদিন ১০ হাজার এভাবে দিতে দিতে শেষে ৯৫ হাজার টাকা আমার বাকি পড়ে গেল। আমি খুব টে’নশ’নে পড়ে গেলাম কারণ লাভ হবে মাত্র ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা।

কিন্তু আমি না’ছোড়বা’ন্দা। প্রায় প্রতিদিন অফিস শেষ করে বিকেলবেলা তার অফিসে যাই পাওনা টাকার জন্য। এভাবে সে আরো কিছু টাকা দিল। অবশেষে বেশ কয়েক হাজার টাকা তার কাছে রয়েই গেল। এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে আমিও তার কাছে যাওয়া বাদ দিলাম। পাওনা টাকাগুলো আর পেলাম না।

পরে শুনলাম, বিডিএস কুরিয়ার সার্ভিসের এজেন্ট নিয়োগের নামে সে সারা দেশের অনেক লোকের কাছে জামানত নিয়েছে। পরের খবর আর জানিনা। সম্ভবত অফিস উ’ধাও! এর কিছুদিন পর একটা সংবাদমাধ্যমে দেখি সে গ্রেফতার হয়েছে এমএলএম ব্যবসায় প্র’তারণার নামে। সাতক্ষীরা, যশোরসহ বিভিন্ন জায়গায় অফিস খুলে এলএমএম ব্যবসার নামে এসব প্র’তারণা করত নাকি। ওই মিডিয়ায় তার ছবি দেখে তাকে চিনতে আমার অসুবিধা হলো না।

তখন আমাদের অফিস কাওরান বাজারে। আমিও থাকি সম্ভবত কাঁঠালবাগানে। বসুন্ধরা সিটির সামনে ফার্নিচারের দোকানের ফুটপাত দিয়ে দেখি, একদিন সে একা হেঁ’টে হেঁ’টে যাচ্ছে। চোরের মত লাগছে তাকে দেখতে। আমার ইচ্ছে হলো এখন তার শার্টের কলার ধ’রে আমার পাওনা টাকাগুলো আদায় করি। কিন্তু কি মনে করে আর সেটা করলাম না।

এই দশ/বারো বছরে সেই মেজর ইফতেখার নামের ভ’ন্ড প্র’তারক যে এত বড় প্র’তারক হয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছে তা জানলাম ইদানিং বিভিন্ন মিডিয়ায় রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক সাহেদ নামে একজন প্রতারকের নিউজ দেখে। এই প্র’তারক যে সেই ভন্ড মেজর ইফতেখার তা নিশ্চিত হলাম সাংবাদিক আমিরুল মোমেনীন মানিকের বিডিএস কুরিয়ার নিয়ে তার সঙ্গে প্র’তারণা নিয়ে সম্প্রতি করা একটি ফেসবুক পোস্টে। উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতালে ভূ’য়া করোনা টেস্টের নামে তার যে প্র’তারণা তা আসলে সব কিছুকেই হার মানিয়েছে। এজন্যই বলে ‘দশ দিন চোরের একদিন গৃহস্তের।’

এই ভ’ন্ড প্র’তারককে আজ বুধবার সাতক্ষীরা থেকে গ্রে’ফতার করেছে রেপিড একশন ব্যাটালিয়ন। অ’পরাধের তদ’ন্ত সাপেক্ষে তথাকথিত মেজর ইফতেখার তথা ভ’ন্ড সাহেদের যথোপযুক্ত শাস্তি চাই। লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

ad

পাঠকের মতামত