325021

কেমন ছিল আইসোলেশনের দিনগুলো, জানালেন চিকিৎসক

নিউজ ডেস্ক।। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) শিশু বিভাগে কর্মরত এফসিপিএসের (ফাইনাল পার্ট) চিকিৎসক নীলিমা নার্গিস আ’ক্রা’ন্ত হয়েছিলেন করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯)। গত ২৯ এপ্রিল নমুনা পরীক্ষার পর তার রিপোর্ট পজিটিভ আসে। এরপর থেকে নিজের ঘরেই আইসোলেশনে থাকেন তিনি। গত ১৯ মে করা দুটি পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ এসেছে তার।

গত ২৬ মে ঘর থেকে বের হন ডা. নিলীমা। নিয়মিত মাস্ক পরাসহ নিয়ম মেনে চলছেন। গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপের সময় আইসোলেশনের দিনগুলোতে কীভাবে নিয়ম মেনে চলেছেন, সে ব্যাপারে জানিয়েছেন তিনি।

গত ২২ এপ্রিল বিএসএমএমইউর শিশু (কিডনি) বিভাগে নাইট ডিউটি ছিল তার। রাত ১০টায় নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা রোগীর রিপোর্ট হাতে আসে। করোনা পজিটিভ। ওই রোগীকে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে রেফার করা, অন্য রোগীদের ব্যবস্থাপনাসহ সব করতে করতে সকাল ৮টা বেজে যায়। পরে ওয়ার্ড লকডাউন করা হয়। সবকিছু শেষ করতে করতে ১৮ ঘণ্টা পার হয়ে যায়।

তখন নীলিমা নার্গিস বুঝতে পারেন, তিনি করোনায় আক্রান্ত হতে পারেন। কিন্তু রোগীদের ফেলে ডিউটি টাইম ছেড়ে চলে যেতে পারেননি তিনি। নীলিমা বলেন, ‘আমার রোগীর জন্য আমার ভালোবাসা। বাসায় বলে রেখেছিলাম, আইসোলেশনের রুম রেডি রাখতে। সেদিনই বন্দিজীবনের শুরু।’

ডা. নীলিমা বলেন, ‘সব মিলিয়ে দিন দিন খারাপ হতে থাকলাম। বিভিন্ন উপসর্গের পাশাপাশি ব্লাডপ্রেশার কমতে শুরু করে। দিনে ছয় থেকে সাটা ওরস্যালাইন আর ডাবের পানি খাচ্ছিলাম। বুঝতে পারছিলাম, আমার অবস্থা খারাপ হচ্ছে। আর না পেরে হাজব্যান্ডকে বললাম ক্যানুলা করার কথা। কিন্তু করোনা পজিটিভ রোগী, কেউ ক্যানুলা করতে রাজি না। চিকিৎসক স্বামী পিপিই পরে এসে নিজেই ক্যানুলা করে দিল। তাতে ব্লকহোলে বাটারফ্লাই দিয়ে নিজের হাতে নিজেই ফ্লুইড দিলাম। ওই দিন ছিল আমাদের সপ্তম বিবাহবার্ষিকী।’

বাসায় আইসোলেশনে থাকা অবস্থায় পাতলা পায়খানাসহ কিছু জটিলতা দেখা দেয় নীলিমার। তবে মানসিকভাবে শক্ত ছিলেন বিএসএমএমইউ শিশু বিভাগে কর্মরত এ চিকিৎসক। ফেসবুকে তিনি আরও বলেন, ‘করোনার যে অভিজ্ঞতা, তা ভয়াবহ। হাসপাতালে নিজে বাচ্চাদের ক্যানুলা করি। আর নিজের যখন প্রয়োজন তখন অন্যরা ভয়ে আমার কাছে আসতে চায়নি। স্বামী পিপিই পরে ক্যানুলা লাগিয়ে দিয়ে যায়। পাতলা পায়খানার জন্য বারবার বাথরুমে যাওয়াসহ অন্য কাজ নিজেকেই করতে হয়েছে। তারপর ক্যানুলার মধ্যে ঝামেলা হলে স্বামীকে আর ডাকিনি। নিজের হাতে নিজে ক্যানুলা লাগানো দুঃসাহসিক কাজ, কিন্তু জীবন বাঁ’চানোর জন্য তা–ও করেছি।’

এই চিকিৎসক বলেন, ‘করোনা পজিটিভ আসার পর থেকে পাগল পাগল অবস্থা হয়েছে। এ অবস্থা থেকে বাঁ’চতেও পারি আবার মারাও যেতে পারি। সব থেকে ভয় লাগত পরিবারের অন্য সদস্যদের কথা চিন্তা করে। আমি বা আমার স্বামী চাকরি করছি, আমাদের কিছু হলে মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু আমাদের জন্য অন্য কারও করোনা হলে বা কাউকে হারাতে হলে… এই চিন্তায় অস্থির থাকতে হয়েছে। দেড় বছর হলো আমার বাচ্চার হার্টের অপারেশন হয়েছে। ওকে নিয়ে ভয়, ননদের বাচ্চা, শ্বশুর–শাশুড়ি সবাইকে নিয়েই ভয় কাজ করত।’

রাজধানীতে নীলিমা তার শ্বশুর, শাশুড়ি, ননদ, দেবর, ননদের বাচ্চা, নিজের ৬ বছর ২ মাস বয়সী সন্তানসহ সবাই যৌথ পরিবারে থাকেন। তার স্বামী ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সের অ্যাসিসট্যান্ট রেজিস্ট্রার মো. বায়েজিদুর রহমান।

অসুস্থ অবস্থায় বাড়ির সবার কাছ থেকে বেশ সহায়তা পাওয়ার কথা জানিয়ে ফেসবুকে নীলিমা বলেন, ‘রাতে ঘুমাতে পারতাম না। আমি আমার রুমে যতক্ষণ লাইট জ্বালিয়ে রাখতাম, রুমের সামনে ডাইনিংয়ে বসে সেসময় আমার শাশুড়ি কোরআন পড়তেন আর আমার জন্য দোয়া করতেন। আমার দেবর রুমের সামনে খাবার দিয়ে যেত, খাওয়ার পর আমি ভেতর থেকে তা ধুয়ে বাইরে রাখার পর আমার দেবর তা নিয়ে যেত।’

করোনাজয়ী এই চিকিৎসক আরও লেখেন, ‘ঢাকা শহরেই আমার মা–বাবা থাকেন। তারাও অসুস্থ। তাই তাদের সঙ্গে ভিডিও কলে একদম সুস্থ আছি সেভাবে কথা বলতে হয়েছে। অথচ ততদিনে আমার চোখ প্রায় গর্তে ঢুকে গেছে। দাঁড়িয়ে নামাজ পর্যন্ত পড়তে পারছিলাম না। কিন্তু কেউ যাতে বাইরে থেকে তা বুঝতে না পারে, সে যে কী মানসিক যুদ্ধ, তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। মানসিক শক্তি, মনোবল, আত্মবিশ্বাস থাকা জরুরি। ব্যায়াম করেছি, নামাজ পড়েছি, কোরআন পড়েছি। মন ভালো রাখার জন্য নাটক দেখেছি। মেয়ে দরজার নিচ দিয়ে চিঠি পাঠাত। তা পড়ে ম্যাসেঞ্জারে উত্তর লিখতাম।’

গত ২৬ মে ঘর থেকে বের হন ৩৩তম বিসিএসের এ চিকিৎসক। এখন নিয়মিত মাস্ক পরে থাকাসহ অন্য নিয়ম মেনে চলছেন। দীর্ঘ এক মাসের বেশি কোয়ারেন্টিনে থাকার পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেছেন নীলিমা। তিনি আরও জানান, আগে থেকেই অ্যাজমা থাকায় বুকে ব্যথা, কাশি, ডায়রিয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অরুচি, হাত–পা–মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথাসহ করোনার বিভিন্ন লক্ষণ দেরিতে শুরু হয়। রক্তশূন্যতাও ছিল। পালস অক্সিমিটার, অক্সিজেন সিলিন্ডার বাসায় এনে রাখা ছিল আগে থেকেই।

কোয়ারেন্টিনে থাকা অবস্থায় নীলিমা ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘পাশের রুমে মেয়ে দাদির কাছে। প্রথম রাতটা খুব কষ্টে কাটিয়েছি। আমি খুব কম কাদি। সেদিন রাতে রায়ার জন্য চোখের জল থামাতেই পারছিলাম না। ওকে আমি যে গান গেয়ে শোনাই, তা মনে করতেই বুক ফেটে যাচ্ছিল। ধীরে ধীরে শক্ত হলাম। আমাকে দূরে থাকতেই হবে। ২৯ এপ্রিল আমার রিপোর্ট পজিটিভ আসে। আমি আমার জীবনে কঠিন সময় পার করেছি, নিজ হাতে রায়াকে অপারেশন টেবিলে রেখে আসছিলাম। ওই দিন থেকে আমি পাথর হয়ে গেছি। সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় আমাকে আল্লাহ জয়ী করেছেন। আর কোভিড–১৯–কে কিসের ভয়।’

ad

পাঠকের মতামত