317644

‘আপনার পায়ে ধরে নিবেদন করি দয়া করে আপনার বিপদগ্রস্ত প্রবাসীদের রক্ষা করুন’

জয়নাল হাজারী ॥  করোনার কারণে বর্তমানে প্রবাসীরা চরম দূরদশার মধ্যে নিপতিত হয়েছে। এদের অবস্থা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। বিভিন্ন দেশের বেশ কয়েকজন প্রবাসী আমার খুবই ঘনিষ্ঠ। এদের অনেকেই বিদেশে আমাকে বিভিন্নভাবে যেভাবে সহযোগীতা করেছে তা ভুলবার নয়। গত কয়দিন থেকে ওদের অনেকেই কেবল কান্নাকাটি করছে আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের বর্ণনা দিয়েছে। ওদের চাকরি নেই, ব্যবসা নেই। ওরা এখন সর্বশান্ত। ওদের জন্য তাদের পরিবারও অনেক কষ্টে দিনযাপন করছে। আমাদের নেত্রী দেশের জনগনের জন্য এক লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। পৃথিবীর কোন দেশ এর ধারে কাছেও যায়নি। নেত্রীর কাছে আমার আবেদন ওই এক লক্ষ কোটি টাকার মধ্যে থেকে প্রথমদিকে অন্তত দশটি দেশে ১০,০০০ কোটি টাকা পাঠিয়ে দিন। দূতাবাসের মাধ্যমে এই অর্থ দুস্থদের মধ্যে বিতারণ করা হবে। বছরের পর বছর এই প্রবাসীরা আমাদেরকে দিয়েছে। আজ তাদের দুর্দিনে আমরা যদি তাদের পাশে না দাঁড়াই তাহলে আমরা বিশ্বাসঘাতক হিসেবে পরিগনিত হবো। আমি জানি উন্নত অনুন্নত সব দেশের প্রবাসীরাই আজ চরম কষ্টের মধ্যে আছে। ইতালির রাজন পরিবার পরিজন নিয়ে প্রতিদিন কান্নাকাটি করছে।

অপরদিকে দুবাইয়ের মুকুল, ইরাকের মহিনউদ্দিন, মালয়েশিয়ার নজরুল, সাইফুল , জালানপডুর শান্ত,জুতামাইনসের সাইফুল, ইতালির নিসান, ওমানের রায়হান ও সিঙ্গাপুরের আমজাদ ,কানাডার সাইফুল, নিউ ইয়ার্কের বাবুল, মালদ্বীপের শামীম রাজ, মক্কায় সিন্ধুরপুরের আমিন ও সিলেটের জুবায়ের, সুইজারল্যান্ডের হাসান উদজ্জামান প্রতিদিন প্রবাসের কথা বলে কান্নাকাটি করে। আমি দু-একজনকে ব্যক্তিগতভাবে কিছু সাহায্য করতে চেয়েছিলাম কিন্তু এখনো তা তাদের হাতে পৌঁছায়নি। নেত্রী আপনি আমাকে শেষ বয়সে উপদেষ্টা করেছেন। যেকয়দিন বেঁচে আছি আমি এর ঋণ কোনদিন শোধ করতে পারব না। আমার আপনাকে উপদেশ দেয়ার যোগ্যতাও নাই কিন্তু আজ এই বিশ্ববিপর্যয়ের দিনে আপনার পায়ে ধরে নিবেদন করি দয়া করে আপনার বিপদগ্রস্ত প্রবাসীদের রক্ষা করুন। আপনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা তাই আমি বিশ্বাস করি আমার এই আবেদনটি আপনি আন্তরিকতার সাথে বিবেচনা করবেন। এরাই আবার আমাদেরকে রেমিটেন্সের মাধ্যমে এই ঋণ শোধ করবে। সৌদি আরব, আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ওমান, কাতার, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কুয়েত, কোরিয়া, লিবিয়া, মালদ্বীব, সাউথ আফ্রিকা, কানাডা, ইরাকসহ আরো কিছু দেশ আছে যেখানে প্রবাসীদের কষ্টের সীমা নেই। আমার এই আবেদনটি রক্ষা পেলে নেত্রী আপনার কাছে আর কোন দিন কিছু চাইব না।

আমি এই সঙ্গে মালয়েশিয়া প্রবাসী রিপন নামে একজনের একটি চিঠি সকলের অবগতির জন্য যোগ করে দিলাম।

মালয়েশিয়া প্রবাসী রিপনের আর্তনাথ: ভালো নেই প্রবাসীরা, ভালো নেই প্রবাসীদের পরিবার। মালয়েশিয়াতে আনুমানিক ৮ লক্ষের অধিক বাংলাদেশী প্রবাসী বসবাস করে, তাদের প্রত্যেকটি পরিবার তাদের উপর নির্ভরশীল। এ হিসেবে ৪০লক্ষ লোক ৮ লক্ষ প্রবাসীর উপর নির্ভরশীল, কিন্তু গত ১৮ ই মার্চ থেকে তারা লক ডাউন পরিস্থিতির কারনে বাসায় অবস্থান করছে। কাজ নেই, অর্থ উপার্জন করার রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। যারা বিভিন্ন কোম্পানির অধীনে কাজ করছেন বিশেষ করে ফেক্টরী গুলোতে তাদের মধ্যে ২৫% কোম্পানি সম্পূর্ন বেতন দিয়েছেন। আর বাকী ৫০% অর্ধেক পরিমান দিয়েছেন। আবার অনেকে নামমাত্র বেতন দিয়েছেন, কিন্তু এপ্রিল মাসের বেতনের বিষয়ে সবাইর অজানাই থেকে গেল। কি হবে কেউ জানেনা।

মালয়েশিয়াতে সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কনস্ট্রাকশন সেক্টরের এবং অবৈধ শ্রমিকেরা । কারন ওনারা হাজিরা ভিত্তিক কাজ করে যেহেতু এখন লক ডাউন সবার কাজ নেই । মানে হাজিরাও নেই বেতন ও নেই। এ সেক্টরের শ্রমিক সংখ্যাই মালশিয়ায় সবছাইতে বেশি, সবচেয়ে দুঃখ জনক বিষয় হল এখন এইসব সেক্টরের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মালিক বা নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বা এজেন্টরা শ্রমিকদের ফোনই রিসিভ করছেনা । এদের দুঃখ দেখার কেও নেই, কস্টশুনার ও কেউ নেই একদিকে রুমের ভাড়া অন্য দিকে খাবার খরচ সবচেয়ে বড় বিষয় হল তার পরিবার তার উপার্জনের উপর নির্ভরশীল। এখন এমন একটি অবস্হা নিজেই খেতে পারছেনা, রুম ভাড়া দিতে পারছেনা পরিবারকে কি দিবে! এ দিকে পরিবার কস্টে বুকে পাথর চাপা দিয়ে দিন যাপন করছে। এমন একটি পরিস্হিতিতে বাংলাদেশী প্রবাসীরা যাবে কোথায়, সবচেয়ে লাজুক
রিপনের টেলিফোন: ০১১২৭২২৭৮৮০

পরিস্থিতিতে আছে অবৈধ শ্রমিকরা। সেই সংখ্যাও অনেক, তাদের না আছে কর্ম, না আছে কোম্পানি, না আছে মালিক। এরপর সরকারী ভাষ্যমতে তাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সরকারী আবেদন আরো আতংকিত করছে তাদের। তারা না পারছে কাজ করতে, না পারছে পরিবার চালাতে না, পারছে নিজে খেয়ে বেচে থাকতে। এ যেন কঠিন অগ্নি পরিক্ষার বাস্তব মুখোমুখি অবৈধ শ্রমিকরা।

এ দিকে বাংলাদেশ হাইকমিশন একটি অনলাইন খাদ্য চাহিদা ফরম বিতরন করেছে প্রবাসীদের অনেকেই সেটি পূরন করে জমা দিয়েছে। কিন্তু প্রবাসীদের অভিযোগ এখন পর্যন্ত তারা কোন খাদ্য সামগ্রী পায়নি বিষয়টি হতাশাজনক। তবে বাংলাদেশী কমিউনিটির কিছু ব্যাবসায়ী এবং সংগঠন প্রবাসী বাংলাদেশীদের কিছু খাদ্য সামগ্রী বিতরন করেছে । তবে সেই সংখ্যা সীমিত পর্যায়ে কিন্তু কত সংখ্যক বাংলাদেশী শ্রমিক অভুক্ত আছে সেই বাস্তবচিত্র বের করা খুব কঠিন। এখন পর্যন্ত সরকারী কোন অনুধান দেওয়া হয়নি হাইকমিশনের পক্ষ থেকে। সরকারিভাবে একটি চাহিদা পত্র চেয়েছিল সেটা কতটুকু হয়েছে এ বিষয়েও অজানাই থেকে গেল। আসলে প্রবাসীরা অবহেলিত মানুষ। পরিবার পরিজন ছেড়ে দেশ ছেড়ে প্রবাসে রক্ত ঘাম ঝড়িয়ে উপার্জন করতেছে। সেই চাকাটাও বন্দ হয়ে যাবে কেইবা জানতো।

তাদের হৃদয়ের রক্তক্ষরন কেউ বুঝেনা। তাদের হৃদয়ের আর্তনাদ কেউ উপলব্ধি করে না। ক্ষত-বিক্ষত সহজ-সরল মনের অবস্থাটান নিরবে নিভৃতে কাঁদে। আমাদের দেশে যদি আমাদের কর্মসংস্থান করতে পারতো আমরা হয়তো দেশ ছেড়ে প্রবাসে আসতাম না। প্রবাসে আসার কারনেই দেশে রেমিট্যান্স যাচ্ছে সেটা দিয়ে দেশ উন্নতি করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। অথচ আজ সাড়া বিশ্বের ১ কোটি ৩০ লক্ষ প্রবাসীদের জন্য কোন বাজেট বা কোন ধরনের প্রণোদনা নেই । তখন প্রবাসীদের হৃদয়ের রক্ত ক্ষরন দ্বিগুণ হয়ে যায়। এটা বুঝার ক্ষমতা হয়ত কারো নেই। এখন তারা দেশকেও রেমিট্যান্স পাঠাতে পারছেনা, আবার নিজের পরিবারের পাশেও দাড়াতে পারছেনা অথচ এই প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে সরকারকে তথা দেশকে এবং তার পরিবারকে বাচিয়ে রেখেছে। অথচ সেই প্রবাসীরা এখন কর্মহীন অনিশ্চিত একটি গন্তব্যের দিকে যাচ্ছে কিন্তু প্রবাসীদের এই দুঃসময়ে তারা না পাচ্ছে সরকারী সহযোগিতা ,না পাচ্ছে কোম্পানি বা এজেন্টদের সহযোগিতা, তাদের এখন চারদিকে অন্ধকার মনে হচ্ছে,যেহেতু তারা ও রক্তে মাংসে গডা মানুষ খাওয়া ছাড়া বিকল্প কোন পথ নেই। ভাত-ঢাল-আলুই অনেকের নিত্য খাবার হয়ে গেছে। অথচ তাদের উপার্জনে দেশের অর্থনীতি আকাশ চুম্বি হয়ে যায় তখন এই হৃদয়ের রক্ত ক্ষরন কার কাছে প্রকাশ করা যাবে! সরকারের ৭৩ হাজার কোটি টাকার বাজেটে প্রবাসীদের জন্য কোন বরাদ্ধ নেই! তাহলে প্রবাসীরা যে সারাজীবন পরিবার এবং দেশকে দিয়েই গেল এটাই কি তাদের অপরাধ ! সরকারের কোন দায়িত্ব নেই প্রবাসীদের জন্য, সামনের দিন গুলো আরো কঠিন করোনা পরিস্হিতি কবে স্বাভাবিক হবে অনিশ্চিত আর প্রবাসীদের ও অবস্হা এখন পেটে আগুন জ্বলার মতো না পারছে কাউকে বলতে আর না পারছে নিজেরা সইতে, এখন সৃস্টিকর্তার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কোন বিকল্প পথ প্রবাসীদের কাছে নেই, তাই সকলে সাবধান থাকুন নিরাপদ থাকুন ধৈর্য ধরুন মনে রাখবেন সময় এমন থাকবেনা আলো আসবেই, প্রবাসীরা হল মোমবাতি নিজে জ্বলে সকলকে আলোকিত করে তাই আত্মবিশ্বাস এই আলো আবার জ্বলবেই, মনে রাখতে হবে রাত যত গভীর হয় প্রভাত তত নিকটে আসে, হেফাজতের মালিক আল্লাহ। ধন্যবাদ সবাইকে। উৎস: হাজারিকা প্রতিদিন।

ad

পাঠকের মতামত