310642

চীনে কেমন আছেন বাংলাদেশিরা

করোনাভাইরাস। বিশ্বব্যাপী এক আতঙ্কের নাম। সেই আতঙ্ক দিন দিন যেন বেড়েই চলেছে। চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান শহরে প্রথম শনাক্ত হওয়া এই প্রাণঘাতী ভাইরাসে এখন পর্যন্ত ১০৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নতুন করে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন অন্তত ১৮০০ জন।

প্রায় সাড়ে ৪ হাজার মানুষ এই ভাইরাস আক্রান্তের পর দেশটির অনেক শহরে চলাচল সংকুচিত করা হয়েছে। নিউমোনিয়াসদৃশ এ ভাইরাসটির সংক্রমণ ঠেকাতে চলতি সপ্তাহে চীন উহানে সেনাবাহিনী মোতায়েনে বাধ্য হয়েছে। এক কোটি ১০ লাখ বাসিন্দার শহরটির সঙ্গে সব ধরনের পরিবহন যোগাযোগ বন্ধ রাখা হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে দেশটিতে অবস্থান করা বাংলাদেশিরা কেমন আছেন, তা জানার চেষ্টা করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশি এই ভাইরাসে আক্রান্ত হননি। তবে অবরুদ্ধ অবস্থায় অনিশ্চয়তা নিয়ে কাটছে তাদের প্রতিটি মুহূর্ত।

উহানের হুয়াঝং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক আবু হুরায়রা বলেন, উহান শহর এখন পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে আর কাউকে যেমন প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না, তেমনি ভেতরের কেউ বাইরে যেতে পারছেন না। তবে সার্বক্ষণিক মেডিকেল সেবা দিতে হনলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে। ওই নম্বরে ফোন করলে মেডিকেলের গাড়ি এসে অসুস্থদের নিয়ে যাচ্ছে বা চিকিৎসা দিচ্ছে।

এই বাংলাদেশি গবেষক বলেন, ‘আমি এখানে অবরুদ্ধ। আমাদের এখানে বাস-ট্রেনসহ সব ধরনের পাবলিক ট্রানসপোর্ট বন্ধ আছে। তবে ভালো খবর হলো, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস অফিস থেকে একটি সুপার শপ খোলা আছে। একটি ক্যান্টিন খোলা রেখেছে। এটা আমাদের ক্যম্পাসের ভেতরেই। ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী বাসায় চলে গেছে। তাই ক্যাম্পাস অনেকটাই ফাঁকা। এ কারণে মাত্র একটা সুপারশপ খোলা আছে।’

আবু হুরায়রা আরও বলেন, ‘বাইরে গেলে আমাদের মাস্ক পরে যেতে হচ্ছে। আমাদের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে, বাইরে থেকে আসলে হাত পরিষ্কার করতে। সবচেয়ে সমস্যার ব্যাপার হচ্ছে, পুরো চীনে মাস্ক সোলড আউট। কোথাও মাস্ক পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের আগে কেনা ছিল সেগুলো ব্যবহার করছি। আমাদের প্রফেসর এসবের খোঁজ-খবর রাখছেন।’

উহানে থাকা বাংলাদেশি গবেষক উসাই মারমা বলেন, ‌‘বর্তমানে উহান শহরের এক একটা রাত ৩৬৫ দিনের সমান। আমরা খুব আতঙ্কে আছি।’

হুয়াঝং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক পিএইচডি গবেষক মো. সামিউল ইসলাম বলছিলেন, ক্যাম্পাসে শীতকালীন ছুটি থাকায় স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরতে যান সাংহাই শহরে। সেখান থেকে গত ২৫ জানুয়ারি উহানে ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু এর আগেই গত ২৩ জানুয়ারি থেকে উহান শহরের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।

কেমন আছেন হ্যাংজু শহরের বাংলাদেশিরা

চীনের চেচিয়াং প্রদেশের হ্যাংজু শহরে অবস্থিত চেচিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএচডি গবেষক মো. আমানুল্লাহ। হুয়াজিয়াচি ক্যাম্পাসে গবেষণা করা এই বাংলাদেশি বলছিলেন, গত ২০ জানুয়ারি থেকে তাদের ক্যাম্পাসে শীতকালীন ছুটি শুরু হয়েছে। চেচিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৫০ জন বাংলাদেশি রয়েছেন। আর তাদের হুয়াজিয়াচি ক্যাম্পাসে রয়েছেন চারজন বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে দুজন নারী গবেষক গতকাল সোমবার বাংলাদেশে ফেরত এসেছেন।

হুয়াজিয়াচি ক্যাম্পাসের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে মো. আমানুল্লাহ বলেন, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে নানা পদক্ষেপের কথা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বলে দেওয়া হয়েছে। খুব প্রয়োজন না হলে কক্ষের বাইরে না যাওয়া, বিশেষ প্রয়োজনে বাইরে গেলে জনবহুল এলাকায় না যাওয়া, যেকোনো প্রাণির সংস্পর্শে না যাওয়া। বাইরে গেলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করা এবং বাইরে থেকে এলে হাত-মুখ ভালোভাবে পরিষ্কার করতে বলা হয়েছে।

শহরের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে এই বাংলাদেশি গবেষক জানান, ক্যাম্পাসের বাইরে থাকা শিক্ষার্থী বা গবেষকদের ক্যাম্পাসে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কেউ বিশেষ প্রয়োজনে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে হচ্ছে। আবেদন যুক্তিযুক্ত হলেই কেবল তাদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে।

দেশে ফেরা নিয়ে যা বলছেন বাংলাদেশিরা

হুয়াঝং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক আবু হুরায়রা বলেন, ‘এখানে বর্তমান যে পরিস্থিতি, তাদের দেশে যাওয়া এখন ঠিক হবে না। কারণ, আমি কোনোভাবে যদি এই ভাইরাসটা নিয়ে যাই, তবে আমার দেশের অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে। তা ছাড়া আমি তো আমার ফ্যামিলির সাথে স্টে করব। আমার পরিবারের অবস্থাও আরও খারাপ হয়ে যাবে। চীনে বিষয়টি নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তারা ফরেনারদের জন্যও ব্যবস্থা নিচ্ছে। তো সে হিসেবে দেশে যাওয়া কারও জন্য ঠিক হবে না। গরমকাল আসলে এটি ঠিক হয়ে যাবে আশা করছি।’

করোনা ভাইরাসের কারণে খুব প্রয়োজন ছাড়া আর ল্যাবে যাচ্ছেন না চেচিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএচডি গবেষক মো. আমানুল্লাহ। তিনি জানান, ক্যাম্পাস ছুটির কারণে মুসলিম ক্যান্টিন বন্ধ রয়েছে। তাই নিজে রান্না করে খাচ্ছেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতেও তিনি দেশে ফেরার পক্ষে নন। কেননা, করোনাভাইরাস নিয়ে দেশে ফিরলে তার সঠিক পরিচর্যা দেশে সম্ভব নয়।

হুয়াঝং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মো. সামিউল ইসলাম জানান, এই পরিস্থিতিতে তিনি চীনে থাকতে চান না। স্ত্রীকে নিয়ে দেশে ফিরতে চান। কেননা করোনাভাইরাসের কারণে তাদের ক্যাম্পাস অন্তত দুই মাস বন্ধ থাকতে পারে।

বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু

চীনে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস আতঙ্কের মধ্যে সে দেশে আটকাপড়া বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘যারা ফিরতে চান তাদের রেজিস্ট্রেশন শুরু হয়ে গেছে।’ আজ মঙ্গলবার বিকেলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এ তথ্য জানান।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাস

উহান শহরে গত ৩১ ডিসেম্বর করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত করা হয়। নিউমোনিয়ার মত লক্ষণ নিয়ে নতুন এ রোগ ছড়াতে দেখে চীনা কর্তৃপক্ষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে সতর্ক করে। এরপর ১১ জানুয়ারি প্রথম একজনের মৃত্যু হয়।

ইতিমধ্যে চীন সরকার প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে। বিভিন্ন শহর থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স উহান শহরে পৌঁছেছে। তারা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আর বর্তমানে ২ হাজার ৫০০ বিশিষ্ট নতুন দুটি হাসপাতাল তৈরি করছে চীন, যেটি ১০ দিনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা বলেও জানান উসাই মারমা।

ভয়ংকর এই ভাইরাস চীন সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে এখন অনেক দেশেই। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, হংকং, ম্যাকাউ, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, জামার্নি, ভিয়েতনাম, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সেও প্রাদুর্ভাব ঘটেছে এই ভাইরাসের।

ad

পাঠকের মতামত