297093

‘মীনার’ মর্মান্তিক ঘটনা থেকে আমরা যা শিখতে পারি

ইসলাম ডেস্ক: মক্কার অদূরে অবস্তিত ইসলামের একটি অনন্য ঐতিহাসিক স্থান ‘মীনা’। সেখানে অনেক নবী রাসুলগনের ইতিহাস বিজরীত পবিত্র স্থান। যেখানে সম্মানীত হাজী সাহেবান গন প্রতি বছর হজ্জ পালনার্থে গমন করেন। মীনায় অবস্থান করা হাজীগনের জন্য ওয়াজিব।

এক দুই বছর নয়। দীর্ঘ হাজার হাজার বছর পূর্বের ঘটনার সমাহার সেখানে। আল্লাহ পাকের খলিল হযরত ইব্রাহীম আ: এর সময়কার মর্মান্তিক ঘটনা। বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহ পাক হযরত ইব্রাহীম আ: কে একজন পুত্র সন্তান দান করেন যার নাম হযরত ইসমাঈল আ:। আল্লাহ পাক হযরত ইব্রাহীম আ: কে স্বপ্নের মাধ্যমে জানালেন হে আমার হাবীব, আপনি আপনার প্রিয় বস্তুকে আমার নামে কোরবানী করুন। স্বপ্র দেখে হযরত ইব্রাহীম আ: প্রথমে ১০০ বকরী কোরবানী করলেন। কিন্ত কবুল হলোনা তার সেই কোরবানী।

পূনরায় আল্লাহ পাক স্বপ্নে তার প্রিয় জিনিস কোরবানীর নির্দেশ দেন। পূনরায় হযরত ইব্রাহীম আ: ১০০ উঠ কোরবানী দেন। কিন্ত কোরবানী কবুল হলো না। আল্লাহ পাক পূনরায় স্বপ্নের মাধ্যমে জানালেন হে আমার হাবীব , আপনি আপনার অন্তরের সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে কোরবানী দিন। এবার হযরত ইব্রাহীম আ: আল্লাহ পাকের এরাদা বুঝতে পারলেন। তার অন্তরের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু হলো হযরত ইসমাঈল আ:। আল্লাহ পাক তাকে কোরবানীর জন্যই নির্দেশ দিয়েছেন।

পরদিন সকালে ইসলাঈল আ: এর মা হযরত হাজেরা আ: কে বললেন , তোমার ছেলেকে সাজিয়ে দাও , দাওয়াত খেতে নিয়ে যাব। স্ত্রী স্বামীর নির্দেশ মোতাবেক, ছেলে ইসমাঈল আ: কে সাজিয়ে দিলেন। বাবা হযরত ইব্রাহীম আ: প্রানের প্রিয় ছেলে ইসমাঈল আ: কে নিয়ে রওয়ানা হলেন । সাধে গোপনে অতি ধাড়ালো ছুড়ি নিলেন হযরত ইব্রাহীম আ:। রওয়ানা হওয়ার সাথে সাথে মানুষের চরম শত্রু মি: শয়তান আল্লাহ পাকের হুকুম যাতে না মানতে পারে তজ্জন্য ধোকা দেয়া শুরু করলো ।

প্রথমে হযরত হাজেরা আ: কে মাসুষ বেষে ধোকা দিল। বললো হাজেরা তোমার ছেলেকে তুমি সাজিয়ে দিলে। কিন্ত তোমার স্বামী তার ছেলেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তা তুমি জান ? হাজেরা আ: জবাব দিলেন , দাওয়াত খেতে। শয়তান ধোকা দিল । না । তাকে জবেহ করার জন্য নিয়ে যাচ্ছে। হাজেরা আ: বললেন, তা কিছুতেই হতে পারে না। কারন হযরত ইব্রাহীম আ: তার সন্তানকে অত্যন্ত ভালবাসে। সে জবেহ দিতে পারে না। তার এই যুক্তি খন্ডনের জন্য সত্য কথাই বলতে বাধ্য হলো শয়তান। বললো আল্লাহ পাকের হুকুম হয়েছে। তাই তাকে জবেহ করতে নিয়ে যাচ্ছে। হযরত হাজেরা অ: এবার বুঝতে পারলেন যে , এটি তাহলে শয়তান ।

আল্লাহ পাকের হুকুম হলেতো অবশ্যই তা কার্যকরী হবে। তাই শয়তানের ধোকা থেকে রক্ষা পাবার জন্য তিনি শয়তানকে লক্ষ করে পাথর নিক্ষেপ করেন। শয়তান এখানে কৃতকার্য না হয়ে তার ধোকার স্বধনানা থেকে বিরত হয়নি। তার দ্বিতীয় চক্রান্ত শুরু হলো হযরত ইসমাঈল আ: এর উপর। এবার পিছন থেকে হযরত ইসমাঈল আ: কে ধোকা দিয়ে বলতে শুরু করলো। হে ইসমাঈল তোমাকে তোমার বাবা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে জানো? তোমাকে জবেহ করার জন্য নিয়ে যাচ্ছে। ইসমাঈল আ: বললেন তা কিকরে সম্ভব? আমার পিতা আমাকে এত ভালোবাসে! তিনি কখনো এমন কাজ করতে পারেন না। শয়তান বললো, আল্লাহ পাকের হুকুম হয়েছে তোমাকে জবেহ করার। হযরত ইসমাঈল আ: বিষয়টি বুঝে ফেললেন। তাহলে এ শয়তান। আল্লাহ পাকের হুকুম হলে আমি তাতে রাজি। তিনিও শয়তানকে লক্ষ করে পাথর নিক্ষেপ করলেন শয়তানের ধোকা থেকে হেফাজত হবার জন্য।

পিতা ও পুত্রের শয়তানের ধোকা থেকে হেফাজত হবার জন্য পাথর নিক্ষেপ আল্লাহ পাকের নিকট এত পছন্দ হলো যে উহা কেয়ামত পর্যন্ত সমস্ত হাজীগনের জন্য পাথর নিক্ষেপ ওয়াজিব করে দিয়েছেন। পিতা পুত্র সামনের দিকে এগুতে লাগলো। এক পাহাড়ের চুড়ায় গিয়ে এবার হযরত ইব্রাহীম আ: আল্লাহ পাকের নির্দেশের কথা তার ছেলে হযরত ইসমাঈল আ: এর নিকট প্রকাশ করলেন যে, আল্লাহ পাক তোমাকে জবেহ করার নির্দেশ দিয়েছেন। শুনে হযরত ইসমাঈল আ: বললেন, বাবা আপনি আল্লাহ পাকের হুকুম পালন করুন। আমাকে সবরকারীগনের মধ্যে পাবেন। কি সুন্দর জবাব পুত্রের। পিতা পুত্রকে জবেহ করবে। তার জবাবে এমন বর্ননাতীত, বিরল জবাব কেয়ামত পর্যন্ত কোন সন্তান পিতাকে কি দিবে? শুধু তাই নয়? যুবক পুত্র বৃদ্ধা পিতাকে পরামর্শ দিতেছে। পিতা জবেহ করার পূর্বে আপনার চোখ দুটো ভালো করে বেধে নিন। যাতে করে জবেহ করার সময় যদি আমার চেহার দেখেন তাহলে মায়ার বশে আল্লাহ পাকের হুকুম পালনে বাধার সৃষ্টি হতে পারে। তাহলে আল্লাহ পাক নারাজ হবেন। আর আমার হাত পা শক্ত করে বেধে নিন যাতে করে আমি জবেহ করার সময় নড়াচড়া করতে না পারি। যদি আমার হাত পা খোলা থাকে তাহলে নড়াচড়ায় যদি আমার হাত পা আপনার গায়ে লেগে যায় তাহলে সেই বেয়াদবীর জন্য কাল হাশরের ময়দানে আমি আল্লাহ পাকের নিকট কি জবাব দিব? কত খোদাভীতি, নম্রতা, শীষ্টাচার, ভদ্রতা, সহনশীলতা, পিতা ও আল্লাহ পাকের প্রতি আনুগত্যতা দেখিয়েছেন ছোট যুবক যার সমকক্ষ প্রমান দন্ডায়মান করা সম্ভব হবেনা কেয়ামত পর্যন্ত।

পিতা পুত্রের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ শুরু হলো। পিতা পুত্রের হাত পা শক্ত করে বেধে নিলেন। নিজের চোখ দুটিও বেধে নিলেন। এবার হাতে ধা[ড়ালো ছুড়ি নিলেন। পুত্রকে জবেহের কাজ শুরু করিলেন। একজন নবীর গায়ে ৪০ জন সাঘারন মানুষের শক্তি আল্লাহ পাক দান করে থাকেন। সেই পূর্ন শক্তি দিয়ে পুত্রের গলায় ছুড়ি চালালেন। কিন্তু ফলাফল বিপরীত। ধাড়ালো ছুড়িতেও ইসমাঈল আ:: এর গলা তো দুরের কথা একটি পশমও কাটলো না। এইভাবে একবার নয় দুইবার নয় তিন বার চেষ্টার পর ব্যর্থ হয়ে রাগ করে ছুড়ি নিক্ষেপ করলেন। সেই একই ছুরি দ্বারা শক্ত পাথর দ্বিক্ষন্ডিত হলো কিন্ত ইসমাঈল আ: জবেহ হলেন না। কারন যখন হযরত ইব্রাহীম আ: যখন হযরত ইসমাঈল আ: কে জবেহ শুরু করছিলেন ।

তখন সবকিছুই আল্লাহ পাক নিজেই পর্যবেক্ষন করছিলেন। তিনি ছুড়িকে হুকুম করে দিলেন ইসমাঈল আ: একটি পশমও যেন না কাটে। ছুড়িও আল্লাহ পাকের মাখলুক । আল্লাহ পাকের হুকুম মানে । তার হুকুম ব্যতীত ছুড়িরও কাটার কোন শক্তি নেই। সেই একই ছুড়িতে পাথর দ্বিখন্ডিত হয়ে গিয়েছিল। আল্লাহ পাক পিতা ও পুত্রের এ্ই কোরবানীকে কবুল করে নিলেন। এবং হযরত জিব্রাঈল আ: কে হুকুম দিলেন। আমার হাবীব আমার পরীক্ষায় পাশ করেছে। জলদীি করে হযরত ইসমাঈল আ: কে সরাইয়া সেখানে জান্নাত থেকে একটি দুম্বা নিয়ে শুইয়ে দাও। যেমন হুকুম তেমন কাজ। দুম্বা জ;বেহ হয়ে গেল। গরম রক্ত হাতে লাগতেই হযরত ইব্রাহীম আ: শোকরীয়া আদায় করে চোখের বাঁধ খুললেন। দেখলেন যে, পুত্র পাশে দাড়ানো, দুম্বা জবেহ হয়ে গিয়েছে। তিনি পুনরায় পুত্রকে জবেহ করার জন্য ধরলেন। এদিকে আল্লহ পাক জানিয়ে দিলেন। হে আমার খলিল ,আপনি পরীক্ষায় পাশ করেছেন। আমি কোরবানী দুম্বা দিয়ে কবুল করে নিলাম আপনার ইসমাঈলকে আপনার নিকট ফিরাইয়া দিলাম।

আল্লাহ পাক বান্দার থেকে কোরবানী চান কিন্ত নেন না। এই ঘটনা সমস্ত মুসলিম জাতীর জন্য ওয়াজেব করে দিলেন। প্রতি বছর ঈদুল আযহায় মুসলমানদের জন্য ওয়াজেব আল্লাহ পাকের জন্য এই কোরবানী দেয়া। তারপর থেকে হজ্জের সময় শয়তানের প্রতি পাথর নিক্ষেপ ও কোরবানী দেয়া হাজী সাহেবানগনের জন্য ওয়াজেব করে দিলেন আল্লাহ পাক। আমাদের মহানবী সা: হ্জ্জ পালনের সময় তা্ই করেছেন। এবং হযরত আবু বকর রা: কে নিয়ে এই মীনায় কাফেরদের গোত্রে গোত্রে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিতেন।

এই ঘটনার থেকে সমস্ত মুসলিম জাতি ও সমগ্র বিশ্ব মানব জাতির যা শিক্ষনীয় তা হলো :
(১) মানুষের অন্তরের মধ্যে একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত কোন মাখলুকের মহব্বত বা ভালোবাসা থাকতে পারবে না। যা শিরক এর পর্যায়ে । আল্লাহ পাক তা পছন্দ করেন না । তাই এই কোরবানীর নির্দেশ দিয়েছেন দিল থেকে ইসমাঈলের মহব্বত বেড় করার জন্যই। আমাদেরও কর্তব্য আমাদের দিল থেকে দুনিয়ার সব রকম মহব্বত বেড় করে একমাত্র আল্লাহ পাকের মহব্বত বসানো।
(২) শয়তানের ধোকা থেকে মানুষকে হেফাজতের সার্বিক ব্যবস্তা নিতে হবে।
(৩) আল্লাহ পাকের সন্তস্টির জন্য নারী ,পুরুষ ও যুবক সকলকে দ্বীনের জন্য কোরবানী উঠাতে হবে তাহলে আল্লাহ পাকের দ্বীন দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত হবে। যেমনটি করেছেন হযরত পিতা ইব্রাহীম আ:, নারী হযরত হাজেরা আ: এবং পুত্র/যুবক হযরত ইসমাঈল আ:।
(৪) ছুড়ি বা সমস্ত মাখলুকের কোনই শক্তি নেই কাটার বা কোন কিছু উপকার বা অপকার পৌছানোর আল্লাহ পাকের হুকুম ব্যতীত। তাই আমাদের ঈমানকে মজবুত করতে হবে দুনিয়ার কোন বস্তুই আমাদের উপকার অপকার করতে পারে না আল্লাহ পাকের হুকুম ব্যতীত।
(৫) আল্লাহ পাকের হুকুম মানতে গিয়ে পুত্র পিতার প্রতি যে শ্রদ্ভাবোধ , সম্মান, ধৈর্য্য, উত্তম আদর্শ দেখিয়েছেন তা কেয়ামত পর্যন্ত সমস্ত সন্তানের জন্য পালনীয়।
(৬) আল্লাহ পাক বান্দাকে পরীক্ষার জন্য পরীক্ষা চান কিন্ত নেন না।
সূত্র: জান্নাতের চাবি

ad

পাঠকের মতামত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *