যে হাটে বেচা-কেনা হয় শ্রমিক!
সকালের সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী পৌর শহরের চৌরাস্তায় সমাগম ঘটে শতশত মানুষের। না, কোনো বাজার কিংবা মেলা নয়। এত মানুষের সমাগম শুধু একটি মাত্র কারণে। মানুষ বেচা-কেনা করা হয় এখানে। সহজ করে বললে সাত সকালে ‘শ্রমিক বেচা-কেনার হাট’ বসে সেখানে।প্রায় প্রতিদিনই ধনবাড়ী পৌর শহরের চৌরাস্তায় এক শ্রেণির মানুষ আসেন ‘বিক্রি’ হতে, আর কিছু শ্রেণি আসেন ‘শ্রম’ কিনতে। স্থানীয় ভাষায় এ হাটকে বলা হয় ‘কামলার হাট’। কেউ কেউ আবার একে বলে ‘কৃষি শ্রমিকের হাট’।
ধনবাড়ীতে এখন চলছে বোরো ধান কাটার মৌসুম। আগাম জাতের এই ধান কাটার পর পরই কাটা শুরু হবে অন্যান্য জাতের বোরো ধান। এ সময় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা কৃষি শ্রমিকরা ধনবাড়ী পৌর শহরের চৌরাস্তা বাজারে এসে ভিড় জমায়।সরেজমিনে হাটে ঘুরে দেখা গেছে; রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর, নিলফামারী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, শেরপুর জেলাসহ বিভিন্ন জেলার গ্রাম থেকে অভাবি লোকজন এসেছেন কাজের সন্ধানে।
এ মৌসুমে ধনবাড়ীতে কৃষি শ্রমিকের চাহিদা বেশি। সকাল সাড়ে পাঁচটা থেকে আটটা পর্যন্ত চলে এ হাট। কেউ বিক্রি হন একদিনের, কেউ পাঁচদিন, আবার কেউ সাত দিনের জন্য। দূর থেকে যারা এ হাটে আসেন তারা বেশি দিনের জন্য এবং স্থানীয় শ্রমিকরা প্রতিদিনের জন্য বিক্রি হন। এ অঞ্চলে বোরো ধান কাটা শুরু হওয়ায় শ্রমিক বেচা-কেনার হাট জমে উঠেছে। একজন শ্রমিক ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় প্রতিদিন শ্রম বিক্রি করছেন।
ধনবাড়ী পৌর শহরের চৌরাস্তা বাজারে শ্রমিকের হাটে কথা হয় রংপুরের শহিদুল ইসলাম, লালমনির হাটের মো. আজিজুর ইসলাম, জামালপুরের মোহাম্মদ আলী, পাবনার ইয়াকুব আলী, সিরাজগঞ্জের মুসলিম উদ্দিনের সঙ্গে। তারা দৈনিক আমাদের সময়কে জানান, তাদের এলাকায় এখন কাজ নেই। প্রতি পরিবারে ৮ থেকে ১০ জন সদস্যের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তারা। তাদের উপার্জনেই চলে সংসার। প্রতি বছরই এ সময়ে তারা এ অঞ্চলে আসেন ধান কাটার জন্য। এ সময় শ্রমিকের দাম বেশি থাকে। এক মাস কাজ করলে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা নিয়ে বাড়িতে ফিরতে পারেন।
কুড়িগ্রাম থেকে আসা সাজিদুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভুরঙ্গামারীর উত্তরতিলাই গ্রামের তার বাড়ি। বাবা-মা, ভাই-বোনসহ পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৫ জন। তার উপার্জনেই চলে সংসার। তবে এবার সে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। রেজাল্ট ভালো হলে কলেজে ভর্তি হতে হবে। এর জন্যও টাকা দরকার। পরিবারের খরচ, তার ভর্তি; দুশ্চিন্তা নিয়ে এসেছেন কাজ পেতে। আয় ভালো হলে কলেজেও ভর্তি হবেন। পরিবারকেও টাকা দিতে পারবেন।
ধনবাড়ী পৌর শহরের চৌরাস্তা বাজারে শ্রমিকের হাটে শ্রম কিনতে আসা মো. আজাহারুল ইসলাম জানান, তিনি এ বছর ১০ বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছেন। জমি চাষ, ধানের চারা, সার, কীটনাশক, সেচ, পরিচর্যা এবং শ্রমিকের খরচ দিয়ে চাষাবাদ এখন আর লাভজনক হয় না। প্রতিদিন একজন শ্রমিককে মজুরী বাবদ দিতে হয় ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। পাশাপাশি তিন বেলা খাবার দিতে খরচ হয় ১৫০ টাকা।ধনবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজিবর রহমান জানান, দূর দুরান্ত থেকে আসা কৃষি শ্রমিকরা সারাদিন বিভিন্ন এলাকায় কাজ করে রাতে টাকা নিয়ে উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় ঘুমান। তাদের নিরাপত্তার জন্য চলতি একমাস পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে।




