রাজনীতিতে নতুন মঞ্চের আত্মপ্রকাশ
নিউজ ডেস্ক।। ‘জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ’- নামে আত্মপ্রকাশ ঘটেছে নতুন এক রাজনৈতিক উদ্যোগের। নানা জল্পনা-কল্পনার পর গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে এ উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াতের সংস্কারপন্থীরা। আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে ১৯ দফা ঘোষণাপত্রে তারা বলেছেন- জামায়াতসহ দেশে প্রচলিত কোনো রাজনৈতিক ধারা বা দলের অনুসারি নয়, তারা সম্পূর্ণ স্বাধীন উদ্যোগে একটি স্বতন্ত্র ধারা। যারা তাদের উদ্যোগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হবেন, চিন্তা ও কর্মপন্থায় ঐক্যমত পোষন করবেন- তাদের নিয়ে একটি রাজনৈতিক দল গড়ে তোলা হবে। রাজনৈতিক উদ্যোগটির আত্মপ্রকাশ ঘটলেও রাজনৈতিক দলটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে কিছুদিন পর। পূর্ণাঙ্গ দল গঠনে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে পাঁচটি কমিটি।
আলোচনা, পর্যালোচনা করে সংগঠনের নাম, কাঠামো, কর্মপদ্ধতি, লক্ষ্য ও কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হবে। যথাসময়ে একটি ইশতেহার, সাংগঠনিক কাঠামো, নেতৃবৃন্দের কার কী দায়িত্ব- তা নিয়ে জাতির সামনে হাজির হবেন তারা। যার ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করবে স্বাধীন সত্তায় বিকশিত হওয়ার রাজনীতি; মানবিক সম্ভাবনার বিকাশ, সমৃদ্ধ ও কল্যাণরাষ্ট্র নির্মাণের সামষ্টিক সংগ্রাম। এই রাজনৈতিক দল হবে সত্যিকার অর্থে ইনক্লুসিভ ও একটি ইতিবাচক বাংলাদেশ গড়ার নতুন রাজনৈতিক কার্যক্রম। ঘোষণাপত্রে ও প্রশ্নোত্তরপর্বে তারা অবস্থান পরিষ্কার করে বলেছেন- কোনো নির্দিষ্ট তত্ত্বের আদলে আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের চিন্তা, মত ও পথের তারা নন। এই রাজনৈতিক সংগঠন ধর্মীয় সংগঠন হবে না। দেশের সব জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করবে তাদের এই সংগঠন। তাদের রাজনীতির মূখ্য উদ্দেশ্য হবে সমষ্টির জন্য কল্যাণকর বিষয় নির্ধারণ। সেজন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টায়, সকলের মতামত ও ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে ঐক্যমতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক, সাংগঠনিক ও সাংস্কৃতিক চর্চায় নিবিষ্ট হবেন।
ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, জাতীয় মুক্তি ও জন আকাঙ্ক্ষার নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে উজ্জীবিত একদল আশাবাদী মানুষের উদ্যোগ এটি। গণআকাঙ্ক্ষা, সুশাসন ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার নতুন রাজনীতির স্বপ্ন নিয়ে আত্মপ্রকাশ করা এ উদ্যোগে নতুন প্রজন্মের চিন্তা ও মনোভাবের প্রতিফলন ঘটবে। রাজধানীর বিজয়নগর হোটেল ৭১-এর ‘স্বাধীন সত্তার বিকাশে অধিকার ও কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনীতি-শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার বরখাস্তকৃত সদস্য মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ শীর্ষক উদ্যোগের সমন্বয়কের ভূমিকায় রয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের দায়ভার ৭১ পরবর্তী প্রজন্মের বহন করা উচিত নয় এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষে অবস্থান জানিয়ে ঘোষণাপত্রে বলা হয়, মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সকলের গর্বিত রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। একে বিভেদ, বিভক্তি ও সংকীর্ণ স্বার্থে ব্যবহারের যেকোনো প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। একইসাথে ইতিহাসের মীমাংসা ও ন্যায় বিচারের স্বার্থে মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের যে সমস্ত অভিযোগ তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে নিরপেক্ষ, স্বচ্চছ ও স্বাধীন বিচার প্রক্রিয়ায় চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। এদিকে জামায়াতের সংস্কারপন্থীদের এ উদ্যোগের নেপথ্যে কারা রয়েছেন- এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে রয়েছে নানাগুঞ্জন। তবে আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে সে বিষয়টি খোলাসা হয়নি। কারণ অনুষ্ঠানে খ্যাতনামা কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব উপস্থিত না থাকলেও কমিটি গঠন বা ঘোষণা না হওয়ায় পরিষ্কার হয়নি এ উদ্যোগে কারা শক্তি যোগাচ্ছেন। তবে এক প্রশ্নের জবাবে আয়োজকরা জানিয়েছেন ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক এ উদ্যোগে নেই। গুঞ্জন ছিল জামায়াতের সংস্কারপন্থীদের এ তৎপরতায় সহায়তা রয়েছে সরকারের। কিন্তু গতকাল অনুষ্ঠানের আগে সমন্বয়ক মজিবুর রহমান মঞ্জুকে ঘণ্টাখানেকের মতো হোটেলে আটকে রেখেছিল পুলিশ।
অনুষ্ঠান চলাকালে অনুষ্ঠানস্থল ও হোটেল ৭১এর বাইরে অবস্থান করছিলেন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যসহ পোশাকধারী পুলিশের একটি টিম। তবে শেষ পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করেনি পুলিশ। অনুষ্ঠানে নারীদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। জামায়াতের সংস্কারপন্থীদের এ উদ্যোগ নিয়ে ব্যাপক কৌতুহল রয়েছে রাজনৈতিক মহলে। জামায়াত যেমন তাদের বিরোধীতা করছে তেমনি সতর্ক পর্যবেক্ষণে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।
১৯ দফার ঘোষণাপত্রে বলা হয়, মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির পটভূমি অনেক দীর্ঘ। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৫৪-তে যুক্তফ্রন্টের বিজয়, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা দাবি, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচন- সবই বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্ব ঘোষণার ভিত্তি তৈরি করেছিল। ছয় দফার প্রতি ব্যাপক গণসম্মতির প্রকাশ ঘটেছিল ৭০-এর নির্বাচনে। মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে সংগঠিত ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত করেছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বায়ান্নর প্রাণ বিসর্জনকারী ভাষা আন্দোলনের ভেতরে জন্ম নিয়েছিল আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্রগড়ার স্বপ্ন।
বলা হয়, ১৯৭১ সালে বৈষম্য ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আমরা আবারও স্বাধীনতা ফিরে পাই। নতুন রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি ও সামষ্টিক অভিপ্রায় হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্রে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার- এই তিনটি মূলনীতিকে গ্রহণ করা হয়েছিল। ঘোষিত এই তিন নীতির প্রতি সমর্থন, বিশ্বাস ও বাস্তবায়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়ে জনগণ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্মের পর কখনোই এই প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটেনি। আজ পর্যন্ত যারাই বাংলাদেশ শাসন করেছেন, তাদের প্রত্যেকেই মুক্তিযুদ্ধের এই মৌলিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
সরকারের সমালোচনা করে বলা হয়, সুদীর্ঘ সংগ্রামী ঐতিহ্য, অজস্র অধিকার অর্জনের আন্দোলনে ও সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া বাংলাদেশ আজ অধিকারহীন, অনিরাপদ ও স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। গুম-খুন, গ্রেফতার-নির্যাতন, বিনা বিচারে কারাভোগ কিংবা নিস্তব্ধ কণ্ঠের চাপা আর্তনাদ নিয়ে বেঁচে থাকার এক বিভীষিকাময় জনপদের নাম বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর থেকে সব সরকারই জনগণের প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পথকে রুদ্ধ করেছে। বাংলাদেশের মানুষ কখনোই অভীষ্ঠ গণতন্ত্রের স্বাদ পায়নি। ঘোষণাপত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাপারে বলা হয়, একপক্ষের ব্যর্থতাকে পুঁজি করে অন্যপক্ষ ক্ষমতায় এসেছে। অনাকাঙ্ক্ষিত রক্তপাত, আন্দোলন, জ্বালাও-পোড়াও, সংঘাত-সংঘর্ষ ও মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত গণসংগ্রাম সবই হয়েছে। কিন্তু আজও মানুষ সত্যিকার স্বাধীনতা এবং সুশাসনের দেখা পায়নি। দেশবাসীকে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়েছে দুঃশাসনের বিরুদ্ধে, যা আজও অব্যাহত আছে এবং এ লড়াই আরও কঠিন হয়েছে।
একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে ভোটের একটি মহড়া উল্লেখ করে বলা হয়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সরকার ও বিদ্যমান রাষ্ট্রের কাছে নাগরিক হিসেবে আমাদের অস্তিত্ব এবং ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো মূল্য নেই। বিরোধী জোটসমূহের পক্ষে মানুষের বিপুল সমর্থন দৃশ্যমান হলেও তারা যে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার সামর্থ্য রাখে না, সেটাও পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এভাবে গণতন্ত্রের সব পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়া এবং মুক্তির কোনো আশাব্যঞ্জক দিকনির্দেশনা না থাকা দেশের ঐক্য, সংহতি ও অস্তিত্বের জন্য একটি ভয়ংকর হুমকি। ঘোষনাপত্রে অভিযোগ করা হয়, রাষ্ট্রের সর্বস্তরে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, শৃঙ্খলা ও ভারসাম্য ভেঙে পড়েছে। জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা ও নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা এবং সাংবিধানিক দায়-দায়িত্বপালনের অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গ। একইসঙ্গে সামাজিক প্রতিষ্ঠান, নাগরিক উদ্যোগ, সংবাদমাধ্যম কেউই আর নির্বিঘ্নে নির্ভয়ে ক্ষমতাসীনদের অনিয়মের সমালোচনা, সত্য প্রকাশ ও জবাবদিহিতার দাবিতে সোচ্চার হতে পারছে না। ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার উগ্র বাসনায় সংবিধান পরিবর্তন করে বিচার বিভাগকে নির্বাহী কর্তৃত্বের অধীনস্থ করার মরিয়া চেষ্টা করেছে সরকার। ক্ষমতার পৃথকীকরণসহ যা কিছুপ্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা তৈরি করা হয়েছিল তার প্রায় সবগুলোই আজ অকার্যকর। ঘোষণাপত্রে দেশের আর্থিক খাত ও পররাষ্ট্রনীতির পরিস্থিতি তুলে ধরে সরকারের সমালোচনা করা হয়। দেশে একটি প্রতিনিধিত্বশীল সরকার না থাকায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেও তারা মনে করেন।
ঘোষণাপত্রে বলা হয়, ইতিহাসের এমন দুঃসহ পরিস্থিতিতে সেই দেশের নবীণ ও তরুণদের ঘুরে দাঁড়াতে হয়। ব্যক্তি ও সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে চেপে বসা স্বৈরাচারকে রুখে দাঁড়ানো ছাড়া জাতির সামনে অন্য কোনো পথ খোলা থাকে না। আত্মোপলব্ধি থেকে কেউ না কেউ এগিয়ে এসে পথ হারানো জাতিকে দিশা দেন, নতুন রাজনীতির দরজা খোলেন। তাই আমরাও বিশ্বাস করি, প্রচলিত ও পরিচিত ধারার কেউ নয়, বাংলাদেশকে আজ নেতৃত্ব দেয়ার জন্য এগিয়ে আসতে হবে একদল নতুন মানুষকে। সেই উপলব্ধি থেকেই আমরা মহান এই কর্তব্য পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ঘোষণাপত্রে বলা হয়, কিশোর-তরুণদের আশা জাগানিয়া নিরাপদ সড়ক ও কোটা সংস্কার আন্দোলন পুরো দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। তরুণ প্রজন্ম এই রাষ্ট্র মেরামতের দাবি তুলেছে। এই দাবি ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতাকামী প্রতিটি নাগরিকের আন্তরিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনি। একে সম্ভব ও সফল করে তোলাই আমাদের উদ্যোগের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
আমরা মনে করি- আমাদের সামনে দুটি চ্যালেঞ্জ উপস্থিত, যা হচ্ছে- বাংলাদেশের রাজনীতির পুনর্বিন্যাস ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পুনর্গঠন। এজন্য একটি নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ, উদ্যমী নেতৃত্ব ও গতিশীল সংগঠনের অভিষেক জরুরি। আমরা বিশ্বাস করি, ১৬ কোটি মানুষের অধিকারহীন এই অসহনীয় বন্দিত্ব ঘুচিয়ে, স্বাধীন সত্তায় বিকশিত সৃষ্টিশীল বাংলাদেশ গড়তে এখন প্রয়োজন অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজনীতি। আমরা প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি, কিন্তুকোনো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠন করব না। আমরা যেরাজনৈতিক দল গঠন করতে যাচ্ছি তা হবে ধর্ম, জাতি, লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলের জন্য গ্রহণযোগ্য, উন্মুক্ত একটি প্লাটফর্ম। মানবিক সক্ষমতার পরিপূর্ণ বিকাশ, উৎকর্ষ অর্জন, কাজ সৃষ্টি ও ব্যক্তি উদ্যোগ বিস্তৃত হওয়ার পথে অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা অপসারণই হবে আমাদের গৃহীত নীতি। আমাদের অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎসস্থল ইসলামের উদার ঐতিহ্য, সাম্যের দর্শন এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠার দায়িত্বানুভূতি।
আমরা নৈতিক গুণাবলি, আত্মিক শিক্ষা এবং মূল্যবোধ তাড়িত অধিকারের রাজনীতি প্রতিষ্ঠায় ব্রতী। বলা হয়, আমরা মনে করি, জাতীয় জীবনের এত গভীর সঙ্কট সত্ত্বেও বিভিন্ন দল, গোষ্ঠী ও ধারা মতাদর্শিক বিভাজন এবং বিভক্তির কারণে ঐক্যবদ্ধ হতে পারছে না। জাতীয় ঐক্য কখনোই কোনো দল এবং দলীয় আদর্শে বিশ্বাস স্থাপন করে সূচিত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন সকলের অস্তিত্ব, সমস্বার্থ ও মর্যাদা সুরক্ষায় সবার কাছে গ্রহণযোগ্য সর্বজনীন মূলনীতি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত মূলনীতি; সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফ আমাদের জাতীয় ঐক্যের পাটাতন। মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে প্রতিশ্রুত বাংলাদেশ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে জাতীয় জীবনের সকল অর্জন ও ঐক্যের জায়গাগুলো সমন্বিত করে নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি প্রস্তুত করা প্রয়োজন। এজন্য অন্তত তিনটি বিষয়ে জাতীয় ঐক্যমতের কোনো বিকল্প নেই। সেগুলো হচ্ছে- ক. স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণপ্রতিরক্ষা; খ. মানবাধিকার, সুশাসন ও জবাবদিহিতা; গ. অর্থনৈতিক উন্নতি, সমতা এবং কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। আমরা উপরোক্ত বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে রাজনীতির পুনর্বিন্যাস ও রাষ্ট্রের পুনর্গঠনে জাতীয় ঐক্যমত সৃষ্টিতে কাজ করব। সমন্বয়ক মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, আপাতত এই উদ্যোগ সমন্বয় করার দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়েছে। আমরা পাঁচটি পৃথক কমিটি গঠন করেছি। কমিটিগুলো হচ্ছে- রাজনৈতিক প্রস্তাবনার খসড়া প্রণয়ন কমিটি; জনসংযোগ ও অন্তর্ভুক্তি তত্ত্বাবধান কমিটি; গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম ও তথ্য-প্রযুক্তিবিষয়ক কমিটি; অর্থ সংগ্রহ সংক্রান্ত প্রস্তাবনা এবং পরিকল্পনা কমিটি এবং সাংগঠনিক কাঠামো প্রস্তাবনা, কর্মকৌশল এবং পরিকল্পনা কমিটি। কমিটিতে আমাদের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের পাশাপাশি দেশে ও বিদেশে কর্মরত আমাদের চিন্তার শুভার্থী, বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে- জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর দিলারা চৌধুরী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী নাজিমউদ্দিন আল আজাদ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিবাদী পক্ষের অন্যতম আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর কামাল উদ্দিন, প্রফেসর আবদুল হক, গোলাম ফারুক, সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মোস্তফা নূর, মাওলানা আবদুল কাদের, ব্যবসায়ী নাজমুল হুদা অপু, ব্যারিস্টার জোবায়ের আহমেদ ভূইয়া, বিমান বাহিনীর সাবেক কমকর্তা সালাহউদ্দিন ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি এহসান জুবায়ের প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন।
গত ১৫ই ফেব্রুয়ারি জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল থেকে পদত্যাগকারী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে এই উদ্যোগের কোনো সম্পর্ক আছে কিনা এমন প্রশ্নে মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে তিনি যুক্ত নয়। তবে আমরা দেশে-বিদেশে অনেকের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েছি। আমরা কোনো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠন করব না। জামায়াতসহ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আবার এই উদ্যোগের পেছনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরও কোনো মদদ নেই। এই রাজনৈতিক দল হবে ইতিবাচক বাংলাদেশ গড়ার নতুন কার্যক্রম।
জামায়াতের ভেতর সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেহেতু আমরা অতীত থেকে বর্তমানে এসে পৌঁছেছি, এখন যে চিন্তাটা লালন করছি, সেই চিন্তার মধ্যে যারা আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এই চিন্তা নিয়েই আমরা কাজ করছি। এখন কোনো সংস্কারের দায়দায়িত্ব বা চিন্তা আমাদের নেই। আমরা বলেছি এটা একটি সম্পূর্ণ নতুন উদ্যোগ। এর প্রাথমিক স্পেসটা আজকে পেয়েছি। বাকিটা সামনে আপনাদের জানাবো। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের সঙ্গে বিভিন্ন ধর্ম বর্নের লোক থাকতে পারে। আজকে যারা এখানে এসেছেন তাদের দল মতের পার্থক্য থাকতে পারে। কে আসবে কে যাবে সেটা বড় বিষয় নয়। আমরা সকল দলের লোকদের আহ্বান জানিয়েছি। দলমত নির্বিশেষে সকলের প্রতি আমাদের আহ্বান। আমরা কোনো তত্বের চর্চা করবো না। আমরা অধিকার কেন্দ্রিক রাজনীতির চর্চা করব। বাংলাদেশে যতোগুলো আন্দোলন হয়েছে দল মতের উর্ধ্বে মানুষের অধিকারের ভিত্তিতে। সেই অভিজ্ঞতাটাই আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে।
লিখিত বক্তব্যে বলেছেন আমরা কোনো ধর্মের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল গঠন করব না। আবার বলেছেন আমাদের প্রেরণার উৎস ইসালামের উদার, সাম্যের দর্শন ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার দায়িত্বানুভূতি। বিষয়টা সাংঘর্ষিক হয়ে গেল কিনা? এমন প্রশের জবাবে তিনি বলেন, এটা সাংঘর্ষিক না। কারণ অনুপ্রেরণা আর কোনো কিছুর ভিত্তিতে কাজ করা এক জিনিস না। আমরা বলেছি আমাদের আদর্শ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা। আবার বলেছি গণআকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ। মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে রাজনীতিটাকে শুরু করতে চাই। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টাকে ফলাও করেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে সব দলমতের লোকেরা ছিল। কিন্তু তারা নেতৃত্ব দেয়ার কারণে তাদের অনুসারীর সংখ্যা বেড়েছে। যখন মানুষের দাবি ও প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে একটা ব্যবহারিক জায়গা গড়ে ওঠে তখন সেখানে একটা রাজনৈতিক চর্চা গড়ে ওঠে। আমরা সেই রকম একটা উদ্যোগের চিন্তা করছি। একই সঙ্গে বলছি আমরা এখনো শেষ করিনি। কেবল একটা প্লাটফর্ম দাড় করিয়েছি। ক্রমান্বয়ে আমরা ঠিক করব আমাদের আদর্শ কি হবে এবং অন্যান্য। সেদিন আপনাদের সবাইকে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়ার জন্য আহ্বান জানাবো।
এখানে যারা এসেছেন তারা অনেকেই জামায়াতে ইসলামী থেকে এসেছেন। তাহলে কি আমরা বলতে পারি জামায়াত ভেঙ্গে নতুন একটি রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আপনি বলতে পারেন না। কারণ আপনিই বলছেন আমি মনে করি, ধারণা করি। এই ধরণের অবস্থায় কিছু না বলাই ভালো। আমরা ভাঙা গড়ার রাজনীতিতে বিশ্বাস করিনা। বাংলাদেশের ভাঙাগড়ার রাজনৈতির অতীত অভিজ্ঞতা ভালো নয়। আমরা একটা নতুন উদ্যোগ শুরু করছি। আমরা মনে করি সকল রাজনৈতিক দল উপলব্ধি থেকে বাংলাদেশ গড়ার জন্য এগিয়ে আসবেন।
স্বাধীনতার সময়ে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন কিনা? এবষিয়ে তিনি বলেন, কাউকে যদি তালাক দেয়া হয়। আবার তার কাছে যদি তার পূর্বের সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় তাহলে এটা তার জন্য একটা বিব্রতকর প্রশ্ন। আমি যেহেতু সেখানে নেই। সে সম্পর্কে কোন কিছু বলা আমার উচিৎ নয় বলে আমি মনে করি। এছাড়া ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি লিখিত বক্তব্যেই বলেছি।
পুর্ণাঙ্গ নাম নিয়ে জাতির সামনে আসতে কতো সময় লাগবে এমন প্রশ্নের জবাবে মঞ্জু বলেন, আমরা যথাসম্ভব দ্রুত সময়ের মধ্যে নামসহ রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করব। আমরা ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছি। আজ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিচ্ছি। আমরা আগামী তিন মাসের মধ্যে নতুন দল নিয়ে সক্রিয় হওয়ার আশা রয়েছে। এই উদ্যোগের সঙ্গে সরকারের কোন সম্পর্ক আছে কিনা জানতে চাইলে মঞ্জু বলেন, অনেকে এই উদ্যোগের সঙ্গে সরকারের যোগসাজস থাকার সন্দেহ করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের সঙ্গে সরকারের কোন সম্পর্ক নেই। কারও মদত বা উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে আমরা আসিনি। অনেক বাধা-বিপত্তি এসেছিল আমাদের উপর। সামনেও আসবে, তারপর আমরা এগিয়ে যাব। উৎস: মানবজমিন।




