ক্রিকেটার তুষারের মৃত্যু আর নিজের শিউরে ওঠা বনানী ট্র্যাজেডি!
আমি তখন চাকরিচ্যুত। হন্য হয়ে কাজ খুঁজছি। অফিস থেকে ‘দায়িত্বে অবহেলা ও কর্মে সন্তুষ্টি না হওয়ায় আপনাকে অব্যাহতি প্রদান করা হলো’- এমন কিছু কথা লিখে একটি টার্মিনেশন লেটার হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। আমি একদম বিচলিত নই। চুপচাপ কাজ খুঁজি। হঠাৎ ডেইলি স্টারের এক সাংবাদিক বড় ভাই বললেন, বনানীতে একটি পত্রিকা অফিসে ইন্টারভিউ দিতে। আমি চলে গেলাম একটি সিভি হাতে নিয়ে। গিয়ে দেখি সেই পত্রিকা অফিসে কেউ আসেনি, শুধু পিয়ন ছাড়া। নতুন অফিস স্টাফ সব নিয়োগ হয়নি। আমাকে বলা হলো- বসতে হবে, স্যার আসতে দেরি হবে। নতুন পত্রিকা অফিস ১৭ তলার ওপরে।
আমি বসে আছি। হঠাৎ পিয়ন দৌড়ে এসে বলল, যেভাবে পারেন পালিয়ে যান। আগুন ধরেছে। পিয়ন উধাও, আমি কিছুক্ষণ ভেবে নিচে নামার চেষ্টা করলাম। আশপাশে কাউকে দেখছি না। সিঁড়ি বেয়ে নামার চেষ্টা করছি। ৯ তলার আগ পর্যন্ত সম্ভব হলো, আর পারলাম না। চারদিকের ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে ওপরে উঠছে। আমার বুঝতে বাকি নেই, আমি ওপরে ওঠার চেষ্টা করছি শরীর আর চলে না। শুধু মন ঠিকমতো নিজেকে সাহস জোগাচ্ছে বাঁচার উৎসাহে। কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলাম বড় কোনো বিপদের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আগুনের কী অবস্থা কিছুই বুঝতে পারছি না। তখন মনে হলো আজ হতে পারে জীবনের শেষ দিন।
নিজেকে খুব ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা মনে হচ্ছিল। খুব স্বাভাবিক ছিলাম। তখন মাথায় এলো আমি যে ইন্টারভিউ দিতে এসেছি, সেটি তো কেউ জানে না। তখন সেই পত্রিকা অফিসের মধ্যে ঢুকলাম। কেউ নেই। মোবাইলে নেটওয়ার্ক চলে গেছে। আমি ল্যান্ডফোন তুলে কাউকে ফোন করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ততক্ষণে ফোনের সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক বেশ ডাউন। বেশ কিছুক্ষণ পর নেটওয়ার্ক পেলাম কোনো রকমে। কাকে জানাব বিষয়টি?
ছোটবেলার মাগুরার এক বন্ধুকে ফোন করলাম। প্রথমে তার সঙ্গে কুশলবিনিময় করলাম খুব সুন্দর ও সহজ ভঙ্গিতে। এবার বললাম বন্ধু তুমি কি একটু কাগজ-কলম হাতে নিতে পারবে! সে বলল হ্যাঁ, আমি বললাম আমি যা বলব তুমি লিখবে। একটুও ঘাবড়াবে না কিন্তু… সেই বন্ধুটি খুব যত্ন করে পুরো ঘটনা লিখতে শুরু করল। আমি প্রথমে অফিসের লোকেশন, আমার বর্তমান অবস্থান কোথায়, কেন এবং কী কারণে এখানে এসেছি- সেটি বললাম। তারপর বললাম, আমার পরনে কী আছে, কী রঙের পোশাক ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয় স্পষ্ট জানালাম।
শুধু বন্ধুটিকে বললাম, যদি আগুন থেকে জীবন নিয়ে না ফিরতে পারি, অন্তত আমার মৃত লাশ যেন পরিবার খুঁজে পেতে পারে এ জন্যই তোকে এ বিষয়টি স্পষ্ট করে জানালাম। আমার বন্ধু ফোনের ওপারে কাঁদছে। আমি কিছু বলছি না, তখন শুধু বেশ কিছু পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিষয় তাকে বললাম। এরপর আবার ফোনের সংযোগ কেটে গেল নেটওয়ার্ক না থাকায়। একা একটি রুমে আমি ২ ঘণ্টার মতো অবরুদ্ধ থাকলাম। এরপর ফায়ার সার্ভিসের লোক এসে বলল- সাবধানে নেমে যেতে। সিঁড়িতে পানি আর পোড়া গন্ধ।
বনানীর ওই দিনের কথা আজ খুব মনে পড়ছে। টিভির পর্দায় দেখছিলাম। ৪-৫ বছর আগের কথা এইটা।আজ ২৮ মার্চ রাত সাড়ে ১০টায় অভি ফোন করল। বলল, আমাদের মাগুরার এক ক্রিকেটার বন্ধু তুষার বনানীতে আগুনে পুড়ে মারা গেছে। এই তুষার হলো যে বাঁ হাতি পেস বোলার ছিল। আমরা সবাই লেফটি তুষার বলে তাকে ডাকতাম। মাগুরা জেলা টিমের ক্রিকেটার ছিল। স্টেডিয়ামের অপর পাশে আদর্শপাড়ায় থাকত ওরা। তুষারের বাবার চাকরির সুবাদে মাগুরা থাকত। দারুণ এক হাসিখুশি বিনয়ী ছেলে। সবার পরিচিত মুখ ছিল সে।
সবার নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। আহতের জন্য দোয়া। লেফটি তুষারকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জান্নাত দান করুন। ওর মৃতদেহ এখন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রয়েছে বলে বনি আমিন অভি জানাল।শুধু মনে পড়ছে, এমন মৃত ঘটনার শিরোনাম তো আমিও হতে পারতাম। হয়তো আপনাদের দোয়ায় আজ আমি… লেখক: খান নয়ন, ম্যানেজার, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স




