274867

শিশুদের বানানো হতো কুমিরের টোপ!

ডেস্ক রিপোর্ট।। আফ্রিকা মহাদেশের কথা মনে হলেই প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ একটি মহাদেশের কথাই মনে হয়। তবে এই প্রাকৃতিক সম্পদই ওই অঞ্চলের মানুষের জন্য বিভীষিকা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই সম্পদের লোভেই ইউরোপীয় এবং মার্কিনীরা দলে দলে আফ্রিকা গমন করে সেখানকার অধিবাসীদের জোর করে ক্রীতদাস হিসেবে নিজ দেশে নিয়ে আসতো। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণ্য, নির্মম এবং মর্মান্তিক সেই অধ্যায়ের কত অজানা খবরই আমরা এখনো জানতে পারিনি।

এসব ক্রীতদাসদের সঙ্গে পশ্চিমাদের অমানবিক আচরণের কিছু কাহিনী মার্কিন লেখক আলেক্স হ্যালির উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত টেলিভিশন সিরিজ ‘রুটস’ এ আমরা দেখতে পেয়েছি। এছাড়াও ক্রীতদাসদের জীবন নিয়ে আরো অনেক গল্প উপন্যাসও লেখা হয়েছে। বইগুলোর পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে অসহায় এসব মানুষের প্রতি নিষ্ঠুর নির্যাতনের নির্মম কাহিনী।

আফ্রিকান ক্রীতদাসদের সঙ্গে আমেরিকা এবং ইউরোপের মানুষেরা যে পাশবিক আচরণ করেছে তা ভাবলেও শিউরে উঠতে হয়। এমনকি তাদের শিশুদেরও তারা নিজেদের কেনা সম্পদের মতই ব্যবহার করতো। নদীর পানিতে থাকা কুমিরের টোপ হিসেবে এসব শিশুকে ব্যবহারের অসংখ্য নজির রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা, ফ্লোরিডা এবং দক্ষিণ আমেরিকার কিছু কিছু অংশে ভয়াবহ এই অমানবিক প্রথার প্রচলন ছিল। সেসব অঞ্চলে শিশুদের কুমিরের টোপ হিসেবে ব্যবহার করা বেশ জনপ্রিয় একটি প্রথা ছিল। ১৮০০ থেকে ১৯০০ শতকে কুমিরের চামড়ার ব্যাপক চাহিদা ছিল। এই চামড়া দিয়ে জুতা, জ্যাকেট, বেল্ট এবং অন্যান্য সামগ্রী বানানো হত। ফলে কুমিরের চামড়া সংগ্রহ করার ব্যবসা অনেক লাভজনক একটি পেশা ছিল।

তবে কুমির শিকার করা অনেক কঠিন একটি কাজ ছিল। কুমির শিকারীরা প্রায় সময়ই দুর্ঘটনায় পতিত হতো। এমনকি তাদের অঙ্গহানিও ঘটত। অনেকেই তাদের হাত, পা হারাতো এমনকি জীবনও দিতে হয়েছে। ফলে শ্বেতাঙ্গ কুমির শিকারীরা নিজেদের জীবন বাঁচানোর জন্য ক্রীতদাসের শিশুদের দিকে নজর দিতে শুরু করে।

কুমির শিকারীরা ক্রীতদাসের শিশুদের চুরি করে নিয়ে আসতো কুমিরের টোপ হিসেবে ব্যবহারের জন্য। অনেকেই হয়তো প্রশ্ন করতে পারে মানব শিশুকেই কেন টোপ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে? সেসময় মুরগি, খরগোস কিংবা ছাগলের কি অভাব পড়েছিল? আসলে ওইসব প্রাণীরও তো মূল্য ছিল কিন্তু ক্রীতদাসের সন্তানের আবার মূল্য কি? কোনরকমে চুরি করে নিয়ে আসতে পারলেই হল। এর জন্য তো আর আইন আদালতের মুখোমুখি হতে হবে না তাদের। এতোটাই নিষ্ঠুর ছিল শ্বেতাঙ্গ এসব শিকারী। এতোটাই অন্ধ ছিল তাদের বিবেক। মানবিকতাবোধ বলে কোন কিছুই হয়তো তাদের মধ্যে কাজ করতো না।

ক্রীতদাসের শিশুদের প্রতি নির্মম এই আচরণের অনেক কাহিনীই লিপিবদ্ধ রয়েছে। ১৯২৩ সালের টাইম ম্যাগাজিনে ক্রীতদাসের শিশুদের কুমিরের টোপ হিসেবে ব্যবহারের একটি খবর প্রকাশ করা হয়। এসব শিশুদের অগভীর পানিতে খেলার জন্য ছেড়ে দেয়া হতো। একজন শিকারী রাইফেল হাতে কিছুদূরে অবস্থান করতো। কুমিরটি যখন ধীরে ধীরে তার শিকার অর্থাৎ বাচ্চাগুলোর দিকে অগ্রসর হত তখন তাকে গুলি করা হতো।

খবরটি প্রকাশের পর ফ্লোরিডার চিপলি শহরের চেম্বার অব কমার্স যথারীতি এটি অস্বীকার করে। সংস্থাটি জানায়, কুমির শিকারের এই কাহিনী সস্তাদরের মিথ্যা একটি গল্প এবং অবাস্তব ঘটনা। তবে কেবল টাইম ম্যাগাজিনই নয় যুক্তরাষ্ট্রের আরো অনেক সংবাদপত্রে এই ধরনের খবর প্রকাশিত হয়েছিল। ফলে এটিকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেয়ার কোন অবকাশই ছিল না। তবে কেবল সংবাদপত্রই নয় মিশিগানের জিম ক্রো যাদুঘরে প্রদর্শিত ছবি এবং পোস্টকার্ডেও শিশুদের কুমিরের টোপ হিসেবে ব্যবহারের প্রমাণ রয়েছে। একটি ছবিতে দেখা গেছে, ফ্লোরিডার একজন তার দেয়ালে এমন একটি ছবি রেখেছে যাতে নয় জন কৃষ্ণাঙ্গ শিশুকে নগ্ন অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। ছবির নীচে লেখা রয়েছে, ‘কুমিরের টোপ’।

এছাড়া ১৯০৮ সালের ৩ জুন ওয়াশিংটন টাইমসে একটি খবর প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়, নিউইয়র্কের জুলজিক্যাল গার্ডেনে কুমিরদের শীতকালীন বাসস্থান থেকে গ্রীষ্মকালীন বাসস্থানে নিয়ে আসার জন্য ক্রীতদাসের দুটি শিশুকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কুমিরের টোপ হিসেবে কর্তৃপক্ষের মাথায় অন্য কিছু ব্যবহারের চিন্তাও আসেনি। কি মর্মান্তিক!

তবে শ্বেতাঙ্গরা নিজেদের অপরাধ ঢাকার জন্য বলতো এসব শিশুকে টোপ হিসেবে ব্যবহারের জন্য তাদের মায়ের কাছ থেকে কিনে নেয়া হয়েছে। এছাড়া তাদের যাতে কোন ক্ষতি না হয় সে ব্যাপারেও নজর দেয়া হতো বলে উল্লেখ করে তারা। এগুলোকে একধরনের মিথ্যাচারই বলা যেতে পারে। কেন না কোন মা কি তার সন্তানকে কুমিরের শিকার হওয়ার জন্য বিক্রি করতে পারে?

১৯২৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ওকল্যান্ড ট্রিবিউনে একটি মর্মান্তিক খবর প্রকাশিত হয়। এতে কুমিরের টোপ হিসেবে ব্যবহৃত একটি শিশুর কুমিরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর খবর দেয়া হয়। ওই খবরে আরো বলা হয়, নিহত শিশুটিকে ঠিকঠাক অবস্থায় তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। সঙ্গে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দুই ডলারও দেয়া হয়।

কুমিরের টোপ হিসেবে ব্যবহৃত এসব শিশু বেশিরভাগ সময়ই মৃত্যুর শিকার হয়। কেন না কুমির এদেরকে কামড়ে ধরার পরই শিকারী কুমিরটিকে গুলি করে। ফলে এই অবস্থায় তাদের বেঁচে থাকার কোন সুযোগই থাকে না। কোন কোন খবরে বলা হয়েছে এসব শিশুকে জীবন্ত অবস্থায় তাদের চামড়া তুলে ফেলা হতো। এর ফলে রক্তের গন্ধ পেয়ে অনেক সময় কুমির এসে হাজির হতো। কুমিরদের আকৃষ্ট করার জন্য কি নির্মমতার পথই না বেছে নিয়েছিল বর্বর এসব শ্বেতাঙ্গ শিকারীরা।

সেসময় কুমিরের টোপের লাভজনক একটি ব্যবসা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। এরকম ব্যবসা করা একজন জানিয়েছিলেন, শিশুদের মায়েরা যখন কাজে ব্যস্ত থাকতো তখন তাদের চুরি করা হতো। এসব শিশু বেশিরভাগই একদম কম বয়সি ছিল। কেউ কেউ হয়তো এক বছরের ছিল। জলাভূমিতে এদের নিয়ে কুমিরের জন্য ছেড়ে দেয়া হতো। ক্রীতদাসদের প্রতি মার্কিন শ্বেতাঙ্গদের এসব বর্বর,অসভ্য আচরণের প্রমাণ পাওয়া যায় যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের জিম ক্রো মিউজিয়াম অব রেসিস্ট মেমোরাবিলিয়াতে।

ad

পাঠকের মতামত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *