মুখের ভেতরে ঘা হওয়ার কিছু কারণ তা থেকে মুক্তির ঘরোয়া উপাই
মুখের ভেতর নানাবিধ দন্ত্যরোগ ছাড়াও যে সমস্যাটি অহরহ দেখা দেয় তা যায় সেটা হচ্ছে মুখের ঘা। যে কোন কারণে ঠোঁট, গলা, জিভ বা তালুতে ক্ষতের সৃষ্টি হলে তাকে মুখের ঘা বলা যেতে পারে। এই ঘা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাময়িক ও সাধারণ হলেও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে মারাত্মক ক্যানসারেও রূপ নিতে পারে।
নানা কারণেই মুখে ঘা হতে পারে, যেমন- জীবাণু জনিত ঘা: আলসারেটিভ জিনজিভাইটিস রোগে মাড়িতে ক্ষত ও প্রদাহের সৃষ্টি হয়। দুই ধরণের জীবাণু এই রোগ সৃষ্টি করে। এই রপগে মাড়িতে ঘা হয়ে ব্যথা ও দুর্গন্ধ হয়। শরীরে জ্বর হয়। চোয়ালের নিচে লিমফগ্ল্যান্ড ফুলে যেতে পারে।
ছত্রাকজনিত ঘা: এক ধরণের ছত্রাক মুখের বিভিন্ন অংশে যেমন- জিভে, গালে জমে থেকে সাদা আবরণের সৃষ্টি করে। এই আবরণ উঠে গেলে ঘা দেখা যায়। মুখ অপরিষ্কার থাকলে, মুখে পুরনো অপরিষ্কার ডেনচার থাকলে ও দীর্ঘদিন অ্যান্টিবায়টিক গ্রহণের ফলেও মুখে ছত্রাক জমতে পারে। শিশু ও বয়স্কদের এই ঘা বেশি হয়।
ভাইরাসজনিত ঘা: ভাইরাস আক্রমণে মুখে ও ঠোঁটে ঘা হয়। সাথে ব্যথা ও জ্বর হয়। আর এক প্রকার ভাইরাসের কারণে ফোস্কা পড়ে ও ফেটে গিয়ে ঘা হয়।
আঘাতজনিত ঘা: কোন কারণে ব্রাশ করার সময় , হাড় বা মাছের কাঁটা থেকে ঠোঁট, গলা বা জিভ কেটে গিয়ে ক্ষতের সৃষ্টি হতে পারে। এটা সহজেই সেরে যায়। আবার জীবাণু আক্রান্ত হয়ে অথবা ভাঙা দাঁত, অবিন্যস্ত দাঁতের ক্রমাগত কামড় ও ভাঙা ধারালো ডেনচার দ্বারা অব্যাহত আঘাতে ঘা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ক্যানসারের রূপ নিতে পারে।
রাসায়নিক বা ওষুধজনিত ঘা: অম্ল ক্ষার বা কোন বিষাক্ত পদার্থ মুখে লাগালে মুখে ঘা হতে পারে। সাদা চুন খেলে ও দাঁতে গুল ব্যবহার করলে, দীর্ঘদিন অ্যান্টিবায়টিক ব্যবহার করলে, অ্যাসপিরিন জাতীয় ট্যাবলেট দাঁতের ব্যথার জন্য মুখের কোন অংশে রেখে দিলে মুখে ঘা হতে পারে। অতি উত্তপ্ত পানীয় বা খাদ্য গ্রহনেও মুখে ঘা হতে পারে।
ভিটামিনের অভাব জনিত ঘা: ভিটামিন বি এর অভাবে মুখে নানা ধরণের ঘা হতে পারে। কোন কোন ক্ষেত্রে জিভের ত্বক মসৃণ হয়ে যায়। ভিটামিন সি এর অভাবে স্কার্ভি রোগে মাড়িতে ঘা হয় ও রক্তক্ষরণ হয়।
অজানা কারণজনিত ঘা: অ্যাথপস ঘা ঠোঁট, জিভ, মাড়ি ও তালুতে ছোট বড় এক বা একাধিক ব্যথাযুক্ত এই ঘা হতে পারে। এর সঠিক কোন কারণ জানা না থাকলেও কিছু কিছু বিষয় এটিকে বাড়িয়ে তোলে যেমন- কোষ্ঠকাঠিন্য, ধূমপান, দুশ্চিন্তা, অনিদ্রা ইত্যাদি। ঘায়ের উপরিভাগ সাদা ও চারপাশে লাল টকটকে হয়। সাধারণত এক সপ্তাহে এই ঘা সেরে যায়। অনেক সময় ঘা দ্রুত বেড়ে গিয়ে বড় ক্ষতের সৃষ্টি হয় এবং সারতে দেরি হয়।
ক্যানসারজনিত ঘা: মুখ ও জিভের ক্যানসার প্রথমে মুখের ঘা রুপে দেখা দেয়। কোন কোন সাধারণ ঘা অবিরত দৈহিক ও রাসায়নিক উত্তেজনা বা আঘাতে দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ক্যানসারে রূপ নিতে পারে। মুখের ক্যানসারের সঠিক কারণ অজানা হলেও, কিছু কিছু বিষয় যেমন অত্যাধিক চুন, সাদা মিশ্রিত পান খাওয়া, দাঁতে গুল ব্যবহার করা, অত্যাধিক ধূমপান বিশেষ করে সিগার অ অত্যাদিক মদ্যপান সিফিলস রোগ, অপুষ্টি ও সাধারণ দৌর্বল্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই ক্যানসার সৃষ্টিতে সাহায্য করে। এছাড়া ভাঙা ও ওপরের পার্টির ডেনচারে ব্যবহৃত রাবার- এর সাকশন থেকে তালুতে ক্যানসারের ঘা হতে পারে। [১]
মুখের ঘায়ের যন্ত্রণা দূর করুন ঘরোয়া ৬ উপায়ে-মুখের ঘা খুব সাধারণ এবং অস্বস্তিকর একটি সমস্যা। ছোট বড় সব বয়সের মানুষেরা এই সমস্যায় পড়ে থাকেন। সাদাটে ছোট ছোট এই ঘা বেশ কষ্টদায়ক। এটি সাধারণত মুখের ভিতর, জিহবা, ঠোঁট, দাঁতের মাড়িতে হয়ে থাকে। সাধারণত তিন ধরণের মুখে ঘা দেখা যায়। মাইনর আলসার, যা দুই সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়। মেজর আলসার, এটি প্রায় এক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়ে থাকে। হারপেটিফ্রম আলসার, এটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেকগুলো ঘা নিয়ে একটি বড় ঘা হয়ে থাকে।
বিভিন্ন কারণে মুখে ঘা হতে পারে। এর মধ্যে জ্বর, রক্ত স্বল্পতা, ফুড অ্যালার্জি, পুড়ে যাওয়া,স্ট্রেস, অতিরিক্ত অ্যাসিডিটি, ভিটামিনের অভাব ইত্যাদি অন্যতম। ঘায়ের তীব্র ব্যথার কারণে অনেকে ঠিকমত খেতে পারেন না। ওষুধ ছাড়াও ঘরোয়া কিছু উপায়ে এই ঘা ভাল করা সম্ভব।
১. যষ্টিমধু: মুখের ঘা সারাতে যষ্টিমধু বেশ কার্যকর। এক টেবিল চামচ যষ্টিমধু দুই কাপ পানিতে দুই থেকে তিন ঘন্টা ভিজিয়ে রাখুন। এটি দিয়ে দিনে কয়েকবার কুলকুচি করুন। যষ্টিমধুর অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরী এবং অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল উপাদান মুখের ঘা ভাল করে থাকে।
২. টি ব্যাগ: খুব সহজ ঘরোয়া উপায়ে মুখের ঘা দূর করার আরেকটি উপায় হল টি ব্যাগ। এটি দ্রুত ব্যথা এবং ইনফ্লামেশন দূর করে দিয়ে থাকে। একটি টি ব্যাগ ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে সেটি ঘায়ের স্থানে লাগান। এটি সাথে সাথে আপনার ব্যথা কমিয়ে দিয়ে দিবে।
৩. নারকেল তেল: সহজলভ্য নারকেল তেল দিয়ে মুখের ঘা দূর করা সম্ভব। একটি তুলোর বলে নারকেল তেল লাগিয়ে সেটি মুখের ঘায়ের স্থানে লাগান। নারকেল তেলের অ্যান্টি মাইক্রোবিয়াল উপাদান ঘা সারিয়ে তুলতে সাহায্য করবে।
৪. তুলসি: কয়েকটি তুলসি পাতাসহ পানি দিনে তিন থেকে চারবার পান করুন। এটি দ্রুত মুখের ঘা প্রতিরোধ করবে এবং মুখে ঘা হওয়ার প্রবণতা কমিয়ে দিবে।
৫. বেকিং সোডা: এক চা চামচ বেকিং সোডা অল্প পানিতে মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করে নিন। এই পাতলা পেস্টটি মুখের ঘায়ের স্থানে লাগিয়ে নিন। এটি দিনে কয়েকবার করুন। এছাড়া বেকিং সোডা সরাসরিই মুখের ঘায়ের স্থানে লাগাতে পারেন।
৬. মধু: একটি তুলোর বলে মধু লাগিয়ে নিন। এবার এটি মুখের ঘায়ের স্থানে লাগান। এছাড়া মুখের ঘায়ের স্থানে গ্লিসারিন, ভিটামিন ই অয়েল লাগাতে পারেন।




