261667

REM Sleep Behaviour Disorder কি? এর কারন, লক্ষণ, নির্ণয় এবং চিকিৎসা

REM Sleep Behaviour Disorder মানুষের অদ্ভুত একটি ঘুমের সমস্যা। এই সমস্যা হলে মানুষ ঘুমের মধ্যে এমন কিছু আচরন করে যা তার অথবা তার আশপাশের মানুষের জন্য ক্ষতির কারন হয়ে দাঁড়াতে পারে। মানুষের ঘুমের দুইটা আলাদা অবস্থা আছে – Non-rapid eye movement (NREM) এবং rapid eye movement (REM) ঘুম। REM ঘুম এর সময় চোখ অত্যন্ত নড়াচড়া করে, নিঃশ্বাস অনিয়মিত হয়ে যায়, ব্লাড প্রেশার বেড়ে যায় এবং শরীর প্যারালাইসিস হয়ে যায়। তবে ব্রেইন অত্যন্ত সক্রিয় থাকে।

REM ঘুম এর সময় ইসিজি করে দেখা গিয়েছে যে এই সময় ব্রেইন জেগে থাকা সময়ের মতো কাজ করে। REM ঘুম এর সময় মানুষ সাধারণত স্বপ্ন দেখে। মানুষের মোট ঘুমের ২০-২৫% হচ্ছে REM ঘুম। কারো REM sleep behaviour disorder (RBD) থাকলে তার শরীর সম্পূর্ণরুপে প্যারালাইসিস হয়ে যায় না। এর ফলে সে স্বপ্নে যা দেখছে, বাস্তবে তা করতে থাকে। যেমন স্বপ্নে যদি সে লাথি দেয়, তাহলে বাস্তবেও সে ঘুমের ঘোরে লাথি দিবে। স্বপ্নে যদি কেউ তাকে তাড়া করে, তাহলে ঘুমের মধ্যে সে বিছানা থেকে উঠে পালানোর চেষ্টা করবে। এটা হলে আক্রান্ত ব্যাক্তি প্রথমে ছোট ছোট কাজ করে। যেমন, ঘুমের মধ্যে কথা বলা অথবা হাত-পা ঝাঁকি দেয়। আস্তে আস্তে সমস্যা বেড়ে আক্রান্ত ব্যাক্তি লাথি/ঘুষি দেওয়া শুরু করতে পারে। RBD তে আক্রান্ত মানুষ অনেক সময় প্রাণবন্ত, উগ্র স্বপ্ন দেখে বলে তারা প্রচুর নড়াচড়া করতে পারে।

REM Sleep Behaviour Disorder এর উপসর্গ : RBD মাঝেমধ্যে একবার অথবা প্রতিরাতে কয়েকবার করে হতে পারে। এর যেসব উপসর্গ দেখা দিতে পারেঃ মারামারি পূর্ণ অথবা উগ্র স্বপ্ন (যেমন কেউ তাড়া করছে অথবা আটক করছে) দেখলে লাথি/ঘুষি দিতে, জোরে জোরে হাত নড়াতে অথবা বিছানা থেকে লাফ দিতে পারে। বিভিন্ন রকম শব্দ করতে পারে (যেমন কথা বলা, চিল্লানো, হাসা, কান্না অথবা গালি দেওয়া) ঘুম থেকে উঠলে কি স্বপ্ন দেখেছে তা স্পষ্ট মনে করতে পারে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটা ঘুম আসার কমপক্ষে ৯০ মিনিট পরে হয়। কিছু কিছু মানুষের এটা ঘুমের শেষেরদিকে হয়। কারো কারো এটা একরাত্রে ৩-৪ বার হতে পারে।

স্লিপওয়াকিং (ঘুমের মধ্যে হাটা) RBD এর থেকে আলাদা একটা সমস্যা। স্লিপ ওয়াকিং এবং RBD এ আক্রান্ত ব্যাক্তি একই রকমভাবে শরীর নড়াতে পারে। তবে স্লিপওয়াকিং থেকে ঘুম ভাগলে মানুষ অত্যন্ত বিভ্রান্ত হয়ে থাকে। RBD তে সেটা হয় না। এছাড়া RBD তে আক্রান্ত মানুষ মানুষ সহজে ঘুম থেকে উঠে যায় এবং ঘুম থেকে উঠার পরে কি স্বপ্ন দেখেছে সেটা মনে করতে পারে। আপনি যদি ঘুমানো অবস্থায় চোখ খোলা রেখে বিছানা থেকে উঠে হেটে বেড়ান, ঘর থেকে বের হন, খাদ্য খান অথবা বাথরুম ব্যবহার করেন, তাহলে আপনি সম্ভবত স্লিপওয়াকিং এর সমস্যায় ভুগছেন। আপনার যদি RBD এর কোন উপসর্গ থাকে তাহলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।

REM Sleep Behaviour Disorder কাদের হওয়ার সম্ভাবনা বেশি? : RBD মোট জনসংখ্যার ১% মানুষের আছে। এটা সাধারণত মধ্যবয়স্ক থেকে বৃদ্ধ মানুষদের বেশি হয়। তবে পুরুষদের নারীদের তুলনায় একটু বেশি হয়। RBD হওয়ার কারণটা স্পষ্ট না। তবে এটা বিভিন্ন ডিজেনারেটিভ নিউরোলজিকাল কন্ডিশন (যেমন diffuse Lewy Body dementia, Shy-Drager syndrome, Parkinson’s disease, multisystem atrophy, ইত্যাদি) এর সঙ্গে হতে পারে। আপনার যদি এসব নিউরোলজিকাল রোগ থাকে, তাহলে আপনার RBD হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এই রোগটা পারকিনসন্স এর মতো। তবে দুইটার কারনে হওয়া শারীরিক ক্ষতির পরিমাণ ভিন্ন। RBD থাকলে আপনার অন্যান্য যেসব রোগ হওয়ার সম্ভাবনা আছেঃ

পার্কিনসন্স রোগ – এটা একটা ব্রেইনের রোগ যেটার কারনে ব্রেইন আস্তে আস্তে নষ্ট হতে থাকে। এটার কারনে প্রথমে একা-একাই শরীর কাঁপতে থাকে এবং একসময় ভালোভাবে হাটা-চলা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
Narcolepsy – এটা হলে প্রচন্ড ঘুম আসে এবং আক্রান্ত ব্যাক্তি দিনের বেলাতে হঠাৎ হঠাৎ করে ঘুমিয়ে পড়ে।
Periodic limb movement disorder – এটা হলে ঘুমের মধ্যে পায়ের পেশিতে টান পড়ে ব্যাথা করে অথবা পা একা একা ঝাঁকি খায়। স্লিপ এপনিয়া – এটা হলে ঘুমের মধ্যে শ্বাসক্রিয়াতে বাধা সৃষ্টি হয়। এর ফলে ব্রেইন এবং শরীরের বাকি অংশ যথেষ্ট পরিমাণে অক্সিজেন পায় না

REM Sleep Behaviour Disorder নির্ণয় :  এটা নির্ণয়ের জন্য আপনাকে একজন স্লিপ স্পেশালিস্ট এর কাছে যেতে হবে। ডাক্তার আপনার মেডিকেল ইতিহাস জানতে চাইবেন এবং নিউরোলজিকাল পরীক্ষা করবেন। স্পেশাল টেস্ট করার জন্য ডাক্তার আপনাকে একজন নিউরোলজিস্ট এর কাছেও পাঠাতে পারেন। ডাক্তার আপনার স্লিপ প্যাটার্ন পরীক্ষা করার জন্য আপনাকে একটা স্লিপ ডায়েরী রাখতে বলতে পারেন। ডায়েরীতে আপনি কখন ঘুমাচ্ছেন, কেমন ঘুম হচ্ছে, তা লিখতে হবে। এছাড়া আপনাকে একদিনের জন্য হাসপাতালের শুতে বলা হতে পারে। হাসপাতালের ল্যাবরেটরীতে আপনাকে শোয়ায়ে ঘুমের মধ্যে আপনার হার্ট রেট, ব্রেইন ওয়েভ, শ্বাস গ্রহণ ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করা হবে। এছাড়া সেখানে মনিটর থাকবে যেটা আপনি রাত্রে কতটুকু নড়াচড়া করছেন এবং আপনার অন্য কোন ঘুমের সমস্যা আছে কিনা তা দেখবে।

REM Sleep Behaviour Disorder এর চিকিৎসা : ঔষধের সাহায্যে RBD কে সফলভাবে নিয়ন্ত্রনে রাখা সম্ভব। এটা ভালো করার জন্য Clonazepam (Rivotril, Denixil) সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়। এছাড়া উপসর্গকে ভালো করার জন্য আপনাকে Melatonin নামক একটা সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হতে পারে। RBD অনেক সময় অন্যান্য ঘুমের সমস্যার সাথে হয়। RBD এর সাথে সাথে সেগুলোরও চিকিৎসা করা হবে। ঔষধ খাওয়ার পাশাপাশি আপনার নিজেকে এবং আপনার সাথে শোয়া মানুষকে নিরাপদে রাখার জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবেঃ

আপনার খাটের সাইড থেকে সবকিছু সরিয়ে রাখতে হবে। জানালার আশেপাশে শোয়া যাবে না। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যেতে এবং একই সময়ে ঘুম থেকে উঠার চেষ্টা করতে হবে। এলকোহল থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করতে হবে।

ঔষধের সাইড-ইফেক্ট : অধিকাংশ সময় ঔষধের সাহায্যে এই রোগটাকে সফলভাবে দূর করা যায়। আপনি যদি RBD এর চিকিৎসার জন্য Rivotril অথবা Denixil খান, তাহলে আপনার কিছু সাইড-ইফেক্ট হতে পারে। যেমন, সকালবেলা আপনার ঘুম ঘুম ভাব লেগে থাকতে পারে, স্মৃতিশক্তিতে সমস্যা হতে পারে, বিভ্রান্তি লাগতে পারে। এটার কারনে আপনার স্লিপ এপনিয়ার সমস্যাও বাড়তে পারে। তাই এই ঔষধটা খেলে আপনার শরীরের উপর কি প্রভাব পড়ছে তা ভালো করে লক্ষ করুন। যদি কোন সাইড-ইফেক্ট লক্ষ করেন, তাহলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন। এছাড়া আপনার নিয়মিত কোন নিউরোলজিকাল রোগ আছে কিনা তা পরীক্ষা করা উচিত। অনেক সময় RBD হওয়ার কয়েক বছর পরে নিউরোজেনারেটিভ ডিজিজ হয়।

ad

পাঠকের মতামত