আপনার জানা উচিৎ কফি পানের যে ১০টি উপকারিতা সম্পর্কে
ডেস্ক রিপোর্ট।। কফি সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয়র মধ্যে একটা। প্রচুর এন্টিঅক্সিডেন্ট এবং পুষ্টিকর উপাদান থাকার কারনে এটা শরীরের জন্যও বেশ উপকারী। দেখে নিন কফি পান করলে কি কি উপকার হতে পারেঃ
১) শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে : কফিতে ক্যাফেইন নামক একটা উদ্দীপক থাকে। এটা পান করলে ক্যাফেইন রক্তের সাহায্যে ব্রেইনে যায়। এর ফলে ব্রেইনে নরপাইনফ্রাইন এবং ডোপামিন এর মতো নিউরোট্রান্সমিটারের সংখ্যা বাড়ে। এতে মানুষের ক্লান্তি দূর হয় এবং শক্তি বাড়ে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে কফি পান করার কারনে ক্লান্তি দূর হওয়া এবং শক্তি বাড়ার পাশাপাশি স্মৃতিশক্তি ভালোভাবে কাজ করে, মন ভালো হয় এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়।
২) ওজন কমাতে সাহায্য করে : আপনার শরীর যে রেটে ক্যালরি পোড়ায়, সেটাকে মেটাবোলিক রেট বলা হয়। মেটাবোলিক রেট যত বেশি হয়, ওজন কমানো তত সহজ হয়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে কফি পান করলে মেটাবোলিক রেট ৩-১১% বাড়তে পাড়ে। বেশি পান করলে আরো বাড়তে পারে। তবে আপনার ওজন খুব বেশি হলে কফি খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না। অনেক বছর ধরে কফি পান করার অভ্যাস থাকলেও এটা থেকে খুব বেশি উপকার পাওয়া যায় না।
৩) কর্মক্ষমতা বাড়ায় : ক্যাফেইন আপনার চর্বি কোষকে চর্বি ভাঙতে বলে। এর ফলে শরীর জ্বালানি হিসেবে ফ্যাটি এসিড পায়। এছাড়া এটা আপনার রক্তে অ্যাড্রেনালিন এর লেভেল বাড়ায়। অ্যাড্রেনালিন আপনার শরীরকে পরিশ্রম করতে সাহায্য করে। এসবের কারনে ক্যাফেইন কর্মক্ষমতা গড়ে ১০-১২% বাড়িয়ে দেয়। একারনে ব্যায়াম করার আধা ঘন্টা আগে এক কাপ কফি পান করতে পারেন।
৪) প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান থাকে : কফির বীজে থাকা অনেক পুষ্টি উপাদান কফি বানানোর পরেও উপস্থিত থাকে। এক কাপ কফিতে থাকেঃ ভিটামিন বি১২ঃ প্রতিদিন শরীরের যতটুকু প্রয়োজন, তার ১১%। ভিটামিন বি৫ঃ প্রতিদিন শরীরের যতটুকু প্রয়োজন, তার ৬%। ম্যাঙ্গানিজ এবং পটাশিয়ামঃ প্রতিদিন শরীরের যতটুকু প্রয়োজন, তার ৩%। ভিটামিন বি৩ঃ প্রতিদিন শরীরের যতটুকু প্রয়োজন, তার ২%। এগুলো খুব বেশী মনে না হতে পারে। তবে কফি পান করা মানুষ প্রতিদিন কয়েক কাপ কফি পান করে। এর ফলে সব মিলিয়ে অনেক পুষ্টি উপাদান হতে পারে।
৫) টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা কমাতে পারে : টাইপ ২ ডায়াবেটিস অত্যন্ত কমন একটা স্বাস্থ্য সমস্যা। এটা লক্ষ লক্ষ মানুষের আছে। আপনার শরীর যথেষ্ট পরিমাণে ইনসুলিন তৈরি করতে না পারলে অথবা কোষকে ইনসুলিন ঠিকভাবে প্রভাবিত করতে না পারলে ব্লাড সুগার লেভেল বেড়ে যায়। এর ফলে টাইপ ২ ডায়াবেটিস হয়। কিছু কারনে নিয়মিত কফি পান করা মানুষের টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা কম হয়। বেশ কয়েকটা গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে নিয়মিত কফি পান করলে টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা ২৩-৫০% কমে যায়। এছাড়া ১৮ গবেষণার একটা পর্যালোচনাতে দেখা গিয়েছে যে প্রতিদিন এক কাপ করে পান করলে ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা ৭% কমে যায়।
৬) আলঝেইমার রোগ থেকে আপনাকে রক্ষা করতে পারে : আলঝেইমার অত্যন্ত ভয়ঙ্কর একটা রোগ। এটা সাধারণত্ ৬৫ এর চেয়ে বেশি বয়সী মানুষদের হয় এবং এর কোন চিকিৎসা নেই। এটা হলে মস্তিস্কের যেসব স্থানে স্মৃতি সংরক্ষিত থাকে, সেসব জায়গা বিনষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে স্মরণশক্তি, কথা, চিন্তা ও বিচারক্ষমতা ব্যহত হয়। আক্রান্ত ব্যাক্তির স্মরণশক্তি লুপ্ত হয়, কথা মনে না আসা এবং সে মানসিক ভারসাম্যহীনতা হারায়। রোগের তীব্রতা বাড়লে আক্রান্ত ব্যাক্তি অস্বাভাবিক এবং অদ্ভুত আচরণ করা শুরু করতে পারে। যদিও আলঝেইমারের কোন চিকিৎসা নেই, এটা হওয়ার সম্ভাবনা কমানোর কিছু উপায় আছে। সবসময় স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়া এবং ব্যায়াম করার পাশাপাশি কফি পান করলে এটা হওয়ার সম্ভাবনা কমতে পারে। কয়েকটা গবেষণাতে দেখা গিয়েছে যে কফি পানকারীদের আলঝেইমার হওয়ার সম্ভাবনা ৬৫% কম।
৭) পার্কিনসন রোগের সম্ভাবনা কমতে পারে : আলঝেইমারের মতো পার্কিনসনও মারাত্মক একটা রোগ। এটা হলে আক্রান্ত ব্যাক্তির বিভিন্ন অঙ্গ বিশেষ করে হাত-পা কাঁপতে থাকে। এর ফলে আক্রান্ত ব্যাক্তি ঠিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারে না। রোগ তীব্র হলে অঙ্গ প্রতঙ্গ এতো জোরে কাঁপতে থাকে যে আক্রান্ত ব্যাক্তি কোন কাজই করতে পারে না। আলঝেইমারের মতো পার্কিনসনেরও কোন চিকিৎসা নেই। তাই এটা হওয়া কিভাবে প্রতিরোধ করা যায়, তার প্রতি লক্ষ রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে নিয়মিত কফি পানকারীদের পার্কিনসন হওয়ার সম্ভাবনা ৩২-৬০% কম।
৮) আপনার যকৃৎকে রক্ষা করতে পারে : আপনার যকৃৎ এর কাজ হচ্ছে পরিপাক নালী থেকে আসা রক্ত শরীরের বাকি অংশে যাওয়ার আগে ফিল্টার করা। এটা ছাড়া এটি ৫০০ এর বেশী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। যকৃৎ এ হেপাটাইটিস, ফ্যাটি লিভার ডিজিজ এবং এছাড়া বিভিন্ন রোগ হতে পারে। এসব রোগ হলে যকৃৎ নিজেকে মেরামত করার চেষ্টা করে। এটা করতে যেয়ে যকৃৎ এ ক্ষত ট্যিসু তৈরি হয়। এটাকে সিরোসিস বলা হয়। সিরোসিস বাড়তে বাড়তে এক সময় যকৃৎ আর ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। কফি আপনাকে সিরোসিস থেকে রক্ষা করতে পারে। যারা প্রতিদিন ৪ কাপের মতো পান করে, তাদের সিরোসিস হওয়ার সম্ভাবনা ৮০% কম।
৮) বিষণ্ণতা কমাতে পারে এবং আপনাকে সুখী করতে পারে : বিষণ্ণতা অত্যন্ত মারাত্মক একটা সমস্যা। এটার কারনে মানুষ দৈনন্দিন কাজকর্ম ঠিকভাবে করতে পারে না। এর ফলে আক্রান্ত ব্যাক্তির জীবনের মান অনেক কমে যায়। বাংলাদেশে কত পার্সেন্ট মানুষের বিষণ্ণতার সমস্যা আছে তা আমাদের জানা নেই। তবে বাংলাদেশের মতো বিভিন্ন দেশে ৪-৫% এর বেশী মানুষ বিষণ্ণতায় ভোগে। ২০১১ সালে করা এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে যেসব নারী প্রতিদিন চার কাপ বা তার অধীক কফি পান করে, তাদের বিষণ্ণতা হওয়ার সম্ভাবনা ২০% কম। আরেকটা গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে যেসব মানুষ প্রতিদিন চার বা তার অধিক কাপ পান করে, তাদের সুইসাইডে মরার সম্ভাবনা ৫৩% কম।
৯) কিছু কিছু ক্যান্সারের সম্ভাবনা কমাতে পারে : ক্যান্সারের কারনে প্রতি বছর প্রচুর মানুষ মারা যায়। কফি আপনাকে দুই ধরণের ক্যান্সার থেকে বাঁচাতে পারেঃ লিভার এবং কোলোরেক্টাল ক্যান্সার। লিভার ক্যান্সার তৃতীয় সবচেয়ে কমন এবং কোলোরেক্টাল ক্যান্সার চতুর্থ সবচেয়ে কমন ক্যান্সার। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে কফি পানকারীদের লিভার ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা ৪০% কম। অন্যদিকে বিশাল বড় একটা গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে যারা প্রতিদিন ৪-৫ কাপ কফি পান করে, তাদের কোলোরেক্টাল ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা ১৫% কম।
১০) স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা কমাতে পারে : মানুষ অনেক সময় দাবী করে যে কফি পান করলে ব্লাড প্রেশার বেড়ে যায়। এটা সত্য। তবে প্রেশার একেবারে অল্প বাড়ে। এছাড়া নিয়মিত কফি পান করলে কিছু দিন পর থেকে প্রেশারে কোন পরিবর্তন হয় না। কফি পান করলে যে হার্টের সমস্যা হয়, সেটাও ভুল। এটা পান করার কারনে উলটো হার্টের সমস্যা কম হতে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে কফি পানকারীদের স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা ২০% কম।
কতটুকু কফি পান করা উত্তম : কফি পান করলে আপনি উপরে উল্লেখিত সবগুলো উপকার পেতে না পারেন। তবে এটা সবসময় আপনার ক্লান্তি দূর করবে এবং আপনাকে কাজ করতে সাহায্য করবে। আপনি যদি কফির সম্পূর্ণ উপকারিতা নিতে চান, তাহলে প্রতিদিন ৩-৪ কাপ পান করুন। আপনার চার কাপের বেশি পান করার অভ্যাস থাকলে একটু কম পান করার চেষ্টা করুন। অতিরিক্ত পান করলে বিভিন্ন রকম সমস্যা হতে পারে। প্রথম প্রথম অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা হতে পারে এবং ঘুম আসতে সমস্যা হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত পান করলে আপনার শরীর এতে অভ্যস্থ হয়ে যাবে এবং কোন সমস্যা হবে না। তবে এতে আপনি কফির উপকারিতা গুলোও হাড়াবেন।




