260559

ইউশা (আ.) এর মৃত্যু ও দাফন

ইসলাম ডেস্ক।। মুফতি শামসুর রহমান পোরশা : জর্ডানের পশ্চিমে সিলত নামক এলাকার এ কবরটিকে ইউশা (আ.) এর সমাধি বলে দাবি করা হয়। এর সত্যাসত্য সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন আল্লাহ পাক বনি ইসরাইল সম্প্রদায়কে অসংখ্য নেয়ামত দান করেন। কিন্তু নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পরিবর্তে ধাপে ধাপে তারা আল্লাহর আদেশ অমান্য করেছে। একদা নবী মুসা (আ.) এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বনি ইসরাইলকে সিরিয়ায় গিয়ে যুদ্ধ করার আদেশ দেন। কেননা সেখানকার ভূমি ছিল পবিত্র ও বরকতময়। এ বরকতময় জমিন মুসা (আ.) এর নবুওতের আগে কওমে আমালেকার দখলে চলে যায়। আল্লাহ পাক তাদের সঙ্গে লড়াইয়ের নির্দেশ দেন এবং এ সুসংবাদ ঘোষণা করেন যে, বিজয় সুনিশ্চিত, কাজেই কাপুরুষতা দেখিও না। এটি কোরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবে, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করো, যা আল্লাহ পাক তোমাদের জন্য নির্ধারিত করে দিয়েছেন এবং পেছন দিকে প্রত্যাবর্তন করো না। অন্যথায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে।’ (সূরা মায়েদা : ২১)। কিন্তু তারা আল্লাহ পাকের এ নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করে মুসা (আ.) কে সম্বোধন করে বলল, ‘হে মুসা (আ.) সেখানে একটি শক্তিমান পরাক্রান্ত জাতি রয়েছে। আমরা কখনও সেখানে যাব না, যে পর্যন্ত না তারা সেখান থেকে বের হয়ে যায়।’ (সূরা মায়েদা : ২২)।

তাদের এ ধৃষ্টতা প্রকাশের কারণে আল্লাহ পাক এ শহরকে ৪০ বছর পর্যন্ত তাদের জন্য হারাম করে দেন। এ সময়ের মধ্যে মুসা ও হারুন (আ.) দুইজনই মৃত্যুবরণ করেন। এ দুই সহোদরের ওফাতের পর আল্লাহ পাক তাদের বংশধর থেকে ইউশা (আ.) কে নবুওত দান করেন। আল্লাহ তায়ালা তাকে কওমে আমালেকার সঙ্গে যুদ্ধের নির্দেশ দেন। পরে তিনি আমালেকার সঙ্গে লড়াই করে বিজয় লাভ করেন। ইমাম বগবি (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুসা (আ.) এর মৃত্যুর ৪০ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর আল্লাহ পাক ইউশা (আ.) কে নবুওত দানের মাধ্যমে সম্মানিত করেন। নবুওত লাভ করার পর ইউশা (আ.) বনি ইসরাইলকে সম্বোধন করে বললেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে কওমে আমালেকার সঙ্গে লড়াইয়ের নির্দেশ এসেছে, তোমরা লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো।

বনি ইসরাইল ইউশা (আ.) এর এ সংবাদকে সাদরে গ্রহণ করলেন, সঙ্গে সঙ্গে তারা তার হাতে হাত রেখে এ ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ হলেন। এরপর যুদ্ধের উদ্দেশ্যে তারা সিরিয়ার আরিহা শহরে যাত্রা করলেন। সেখানে পৌঁছার পর পুরো শহর তারা ঘেরাও করেন। শহরটি ছয় মাস পর্যন্ত অবরোধ করে রাখেন। সপ্তম মাসের শুরুতে শহরের প্রাচীর ছিদ্র করে সজোরে আল্লাহু আকবার ধ্বনি তোলেন, সঙ্গে সঙ্গে শহরের নিরাপত্তা প্রাচীর ভেঙে যায়। এরপর বনি ইসরাইল শহরে প্রবেশ করে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ আরম্ভ করেন। একপর্যায়ে তারা তাদের বিপর্যস্ত করেন। এমনকি তারা একেক করে তাদের গ্রিবা উড়িয়ে দিতে লাগলেন।

এ যুদ্ধ সংঘটিত হয় পবিত্র জুমার দিনে। সারা দিন চলে উভয়পক্ষের তুমুল লড়াই। এদিকে সূর্য অস্তমিত হয়ে পরদিন ঊষালগ্নে ঈষাণকোণে শনিবারের দিবাকর উদিত হয়। এখন পর্যন্ত যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটেনি। এ অবস্থায় ইউশা (আ.) আল্লাহর সমীপে দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! সূর্যকে আমার দিকে প্রত্যাবর্তন করে দেন। তিনি সূর্যকে সম্বোধন করে বললেন, হে সূর্য! তুমি আল্লাহর নির্দেশ পালনে কর্মরত রয়েছ, আমিও তার নির্দেশ পালনরত। সুতরাং তুমি স্থির হয়ে যাও। যাতে করে আমি আল্লাহর বৈরীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে পারি। পরবর্তী সময়ে আল্লাহ পাকের নির্দেশে সূর্য প্রত্যাবর্তন করে এবং এ দিন এক ঘণ্টা বৃদ্ধি হয়। শেষে ইউশা (আ.) তাদের প্রত্যেককে বধ করেন। (আহমদ)।

বগবি আরও বর্ণনা করেন, এরপর ইউশা (আ.) সিরিয়ায় অভিযান পরিচালনা করেন। একপর্যায়ে পুরো সিরিয়া তার দখলে এসে যায়। পরে তিনি সিরিয়ার বিভিন্ন শহরে নিজের পক্ষ থেকে প্রশাসক নিযুক্ত করেন।

যুদ্ধ শেষে বনি ইসরাইল সেখান থেকে অর্জিত যুদ্ধলব্ধ সম্পদ একত্রিত করেন। কিন্তু হঠাৎ গনিমতের সম্পদকে ভস্মীভূত করার জন্য আসমান থেকে অগি্নশিখার অবতীর্ণ হয়। এ দেখে ইউশা (আ.) চিন্তিত হয়ে বললেন, আল্লাহই জানেন, কি ত্রুটি ঘটেছে? আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহি অবতীর্ণ হলো, একজন যুদ্ধলব্ধ সম্পদ থেকে কিছু অর্থ চুরি করেছে। আবার বনি ইসরাইলকে ইউশা (আ.) এর হাতে বায়াত গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়। ফরমান অনুযায়ী তারা সবাই আবার তার হাতে বায়াত হলেন। বায়াত গ্রহণের সময় এক ব্যক্তির হাত ইউশা (আ.) এর সঙ্গে হস্তবিরুনি হলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে কী রয়েছে? তখন সে মূল্যবান মণি-মুক্তাখচিত স্বর্ণের একটি অলঙ্কার উপস্থিত করল। এটিকে সে গনিমতের সম্পদ থেকে চুরি করেছিল। ইউশা (আ.) এটিকে তার কাছ থেকে নিয়ে আল্লাহর নামে উৎসর্গকৃত সম্পদে অন্তর্ভুক্ত করে দেন।

পরবর্তী সময়ে এসব উৎসর্গকৃত সম্পদকে আসমান থেকে অগি্নশিখা এসে ভস্মীভূত করে দেয়। এর কিছু দিন পর ইউশা (আ.) ইন্তেকাল করেন। আফরাহাম পর্বতে তাকে দাফন করা হয়। তার বয়স হয়েছিল ১২৬ বছর। মুসা (আ.) এর ওফাতের পর ২৬ বছর পর্যন্ত তিনি বনি ইসরাইলের নবী হিসেবে মনোনীত ছিলেন। (সূত্র : মাআরিফুল কোরআন : ২/৪৮০, তাফসিরে মাজহারি : ৩/২৮৭)।

ad

পাঠকের মতামত