254955

তালাকের টাকাই কাল হল রোজিনার

লাশের মুখম-লে, গলা থেকে বুকের ডান পাশ পর্যন্ত ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাত। পুরো শরীরে মোট ৭টি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন। মৃত্যু নিশ্চিত করে খাটের ওপর নিথর দেহ ফেলে যায় অচেনা খুনি। এভাবে ১১ দিন তালাবদ্ধ ঘরে পড়ে থাকে লাশ। পোকা বাসা বাঁধে লাশের শরীরে, পচনের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। এর পর ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে পুলিশ। উদ্ধার করে ৩৫ বছর বয়সী রোজিনা বেগমের গলিত লাশ। গত ১৬ নভেম্বর গভীর রাতে রাজধানীর পল্লবীতে ১২ নম্বর সেকশনের সি-ব্লকের ১০ নম্বর সড়কের ৩ নম্বর বাড়ির ৪ তলার ফ্ল্যাটে এ ঘটনা ঘটে।

জানা গেছে, ওই ফ্ল্যাটে একাই বসবাস করতেন রোজিনা। ৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় বান্ধবী শাহনাজের সঙ্গে শেষ দেখা গিয়েছিল তাকে। এর পর থেকেই তার মোবাইল ফোনের সংযোগ বন্ধ। খুনের ক্লু না থাকায় সন্দেহভাজনের তালিকায় প্রথমেই ছিল রোজিনার বান্ধবী শাহনাজের নাম। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে কিছুই পাওয়া যায়নি। নিহতের সঙ্গে কারও দ্বন্দ্বও ছিল না। তা হলে সহজসরল প্রকৃতির এই ভাত বিক্রেতাকে কে খুন করল? কেন করল? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা দৃষ্টি দেন রোজিনার মোবাইল ফোনের কললিস্টে এবং এর সূত্রেই শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে এই খুনের মূল নায়ক।

তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম থেকে গত বুধবার গ্রেপ্তার করা হয় রোজিনার খুনি তার সাবেক স্বামী মো. আলীকে। গত বৃহস্পতিবার তিনি হত্যার দায় স্বীকার করেন; ঢাকার হাকিমি আদালতে বর্ণনা দেন লোমহর্ষক এ হত্যাকা-ের। জানান, তালাকের ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিতে তিনি রোজিনার গলা কেটে নৃশংসভাবে খুন করেছেন।মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই মো. জাহিদুল ইসলাম আমাদের সময়কে জানান, লাশ উদ্ধারের পরদিন নিহত রোজিনার ছেলে মো. সাজ্জাদ বাদী হয়ে অচেনা আসামির বিরুদ্ধে থানায় হত্যামামলা করেন। এর পর তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গ্রেপ্তার করা হয় মো. আলীকে।

আলী আগে মিরপুরের সাংবাদিক আবাসিক এলাকায় শরবত বিক্রি করতেন। ঢাকায় একাই থাকতেন। মেসে ভাত সরবরাহের সূত্রে রোজিনার সঙ্গে পরিচয় হয় আলীর। এটি ২০১৫ সালের ঘটনা। তখন রোজিনার মেস ছিল মিরপুর ১২ নম্বরের ক-ব্লকে। এর পর একসময় তারা পরস্পরের প্রেমে পড়েন। ২০১৬ সালে দুজন বিয়ে করেন। ৪-৫ মাস সংসার করার পর রোজিনাকে তালাক দেন আলী। এ বাবদ ৫০ হাজার টাকা দিতে হয় তার। তবে এর পরও রোজিনার বাসায় যাওয়া-আসা ছিল আলীর; ছিল শারীরিক সম্পর্কও। বিয়েবিচ্ছেদের সময় দেওয়া টাকা আলীকে ফেরত দিয়ে রোজিনা ফের সংসার করতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু টাকা না দেওয়ায় একসময় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন আলী। এরই মধ্যে আলীকে না জানিয়ে রোজিনা আগের বাসা ছেড়ে পল্লবীর বাড়িতে ওঠেন। তাই রোজিনাকে শিক্ষা দিতে অনেক খুঁজে তার ঠিকানা বের করেন আলী। গত ৫ নভেম্বর রোজিনার বাসায় যাওয়ার কথা থাকলেও তিনি যান পরদিন রাত পৌনে ৯টার দিকে। সে সময় রোজিনা বাসায় একাই ছিলেন। রাতের খাবারের পর তারা তাদের দাম্পত্য জীবনের স্মৃতি নিয়ে গল্প করেন। প্রসঙ্গক্রমে আসে বিবাহবিচ্ছেদের টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়টি।

কিন্তু রোজিনা টাকা দেওয়ার বিষয়ে কিছু না বলায় আলী একসময় শুয়ে পড়েন এবং ঘুমের ভান করেন। রাত দেড়টার দিকে রোজিনা যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন ঘরে হাঁড়ি-পাতিলের র‌্যাকের ওপর একটি ছুরি পেয়ে সেটি দিয়ে প্রথমে ঘুমন্ত রোজিনার গলা কাটেন আলী। এর পর বুকের ডান পাশে একাধিক ছুরিকাঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। তার শরীর বিছানা সব ভেসে যাচ্ছিল রক্তে। ঠা-া মাথায় আলী বাথরুমে যান, গা হাত পা থেকে ধুয়ে ফেলেন রক্ত। রোজিনার মোবাইল ফোনটি বাথরুমে প্যানের মধ্যে ফেলে দিয়ে রাত ৩টার দিকে ছুরিটি নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যান আলী। এর পর কালশী স্টিল ব্রিজের কাছে ছুরিটি ফেলে খিলক্ষেতের বটতলার বাসায় ফিরে যান। গ্রেপ্তার এড়াতে পরদিন গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে গিয়ে কৃষিকাজে লাগেন।আদালতে আলীর জবানবন্দির বরাত দিয়ে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান এসআই মো. জাহিদুল ইসলাম। দ্রুতসময়ের মধ্যে এ মামলায় চার্জশিট দেওয়া হবে, বলেন তিনি।

ad

পাঠকের মতামত