251118

১৪-১৫টি বিয়ে করা নুরু স্ত্রী তালাক দেওয়ায় মাইকিং করে হত্যার হুমকি

নিউজ ডেস্ক।। স্বামীর নির্যাতন সইতে না পেরে স্বামীকে তালাক দিয়েছেন পঞ্চগড়ের সাবিনা আক্তার (৩৪)। কিন্তু নির্যাতন থেকে মুক্তি মেলেনি তাঁর। সাবেক স্বামী নুরুল ইসলাম ওরফে নুরু ড্রাইভার (৫০) বাড়িতে এসে সাবিনাকে মারধর করেন এবং হত্যার হুমকি দেন। স্থানীয় লোকজন প্রতিবাদ জানালে তাদেরও হুমকি দেন। এমনকি গভীর রাতে তাদের হত্যার হুমকি দিয়েছেন মাইকিং করে। তাঁর ভয়ে তিন মাস ধরে সন্তানদের নিয়ে গৃহবন্দির মতো দিন কাটাচ্ছেন সাবিনা। এলাকার মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম নুরু ড্রাইভার। অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নুরু। সাবিনা আক্তার পঞ্চগড় সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়নের কহুরুহাট এলাকার দরিদ্র সলেমান আলীর মেয়ে। আর নুরুল ইসলাম ওরফে নুরু ড্রাইভার কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার বল্লার চর এলাকার দুধু মিয়ার ছেলে।

সাবিনা ও তাঁর পরিবার জানায়, প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে তালাক হওয়ার পর সাবিনাকে বিয়ে করেন নুরু। বিয়ের পর সাবিনাকে পাবনা, ঢাকা, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে নিয়ে যান নুরু। বিয়ের পর থেকেই মাদকাসক্ত নুরু সাবিনাকে নির্যাতন করে আসছিলেন। চার বছর পর প্রথম সন্তানের (মেয়ে) মা হন সাবিনা। ১৯ বছরের সংসারে নুরু-সাবিনার তিন মেয়ে রয়েছে। এর মধ্যে নুরু ১৪-১৫টি বিয়ে করেছেন। সন্তানদের মুখের দিকে চেয়ে নির্যাতন সয়ে সংসার করছিলেন সাবিনা। এর মধ্যে কয়েকবার বাবার বাড়ি চলে আসেন সাবিনা। সালিসের মাধ্যমে ভুল স্বীকার করে সাবিনাকে নিয়ে যান নুরু। তিন বছর আগে সাবিনা চট্টগ্রাম থেকে সন্তানদের নিয়ে বাবার বাড়ি চলে আসেন। পরে কিতনিয়াপাড়ার বাড়িসহ ১২ শতক জমি কেনেন সাবিনা ও নুরু। এখানেও নুরু নির্যাতন করেন সাবিনাকে। বাড়িতে বন্ধুদের নিয়ে মদ ও জুয়ার আসর বসান। জুয়া খেলতে সাবিনাকে বাবার বাড়ি থেকে টাকা এনে দিতে বলেন। টাকা না দেওয়ায় করেন নির্যাতন। নির্যাতন থেকে বাঁচতে তিন মাস আগে নুরুকে তালাক দেন সাবিনা। নুরু আত্মীয়র বাড়িতে চলে যান। তবে সাবিনার ওপর নির্যাতন বেড়ে যায়। মাঝেমধ্যেই গভীর রাতে সাবিনাকে হত্যার জন্য ছুরি, দা, এসিড, পেট্রল নিয়ে সাবিনার বাড়িতে হামলা করেন নুরু। সাবিনা ও সন্তানদের মারধর করেন। বাড়িতে ভাঙচুর ও বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেন। তাদের চিৎকারে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে পালিয়ে যান নুরু। পরে তাদের প্রাণনাশের হুমকি দেন। কয়েকবার মারধরের শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন সাবিনা। এ নিয়ে আদালতে মামলা করেন তিনি। পুলিশ আসামি নুরুকে গ্রেপ্তার করলেও কয়েক দিনের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে আসেন তিনি। এসেই দিচ্ছেন হুমকি, করছেন নির্যাতন।

সাবিনার প্রতিবেশী আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, ‘একটা মেয়ের ওপর এমন নির্যাতন হচ্ছে, আমরা প্রতিবেশীরা তো বসে থাকতে পারি না। আমরা এগিয়ে গেলে আমাদের ওপরও ছুরি নিয়ে হামলা করতে আসে নুরু।’ একই ধরনের কথা বললেন আরেক প্রতিবেশী ইসামদ্দিন। তিনি বলেন, ‘ওর (নুরু) ভয়ে আমরা হাট-বাজারে যেতে পারছি না। চাকলাহাটে গেলে আমার ভাতিজা শহিদুল্লাহকে ছুরি মেরেছে নুরু।’ প্রতিবেশী আবুল হোসেন বলেন, ‘আমাদের গ্রামের মানুষকে হত্যার হুমকি দিয়ে প্রকাশ্যে মাইকিং করে নুরু। আমরা বাজারে গেলে হামলা করতে আসে। রাস্তায় ছুরি নিয়ে বসে থাকে। আমরা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি।’

সাবিনার বড় মেয়ে নুরী ইসলাম সাথী বলে, ‘বুঝ হওয়ার পর থেকেই দেখছি বাবা আমার মায়ের ওপর নির্যাতন করে আসছে। আমাদেরও মারধর করে। আমরা এখন বাইরে বের হতে পারি না। সে আমাদের ওপর এসিড দেওয়ার জন্য রাস্তায় বসে থাকে।’ মেজো মেয়ে নুরিয়া ইসলাম বীথি বলে, ‘গভীর রাতে বাবা লোকজন নিয়ে আমাদের হত্যা করতে আসে। আমরা ভয়ে বাইরে বের হই না। স্কুলে যাই বলে আমার বইগুলো পুড়ে দিয়েছে।’ সাবিনার মা রাবেয়া খাতুন বলেন, ‘আমরা রাতে ঘুমাতে পারি না। কখন যে নুরু হামলা করে, সব সময় এই ভয়ে থাকি। নুরু আমাদেরও মারধর করে। অনেক জায়গায় বিচার দিয়েও পাইনি। পুলিশ আসে, কিন্তু নুরুকে ধরে না।’

সাবিনা বলেন, ‘আমি কোথাও বিচার পাচ্ছি না। কয়েক মাস ধরে আমি বাইরে যেতে পারি না। রাস্তায় ও (নুরু) ছুরি নিয়ে বসে থাকে। তিন মেয়েকে নিয়ে গৃহবন্দির মতো দিন কাটাচ্ছি। আমি জেলা পুলিশ সুপারকে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। কোনো লাভ হয়নি।’ চাকলাহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘স্ত্রীকে নির্যাতনের জন্য আমি গ্রাম পুলিশ দিয়ে তাকে (নুরু) ধরে এনেছিলাম। পরে পুলিশের হাতে তুলে দিই। সে জামিনে বেরিয়ে আসে। রাত ১টা নয়, ২টা নয় সে অত্যাচার করে। আমি চেয়ারম্যান, কয়বার তার পেছনে যাব!’

নুরুল ইসলাম ওরফে নুরু ড্রাইভার বলেন, ‘আমি কখনো তার (সাবিনা) গায়ে হাত তুলিনি। আমাকে তালাক দেওয়ার পর সে আমার বাড়িতেই কিভাবে থাকে। আমি আমার বাড়িতে গেলে তারা আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করে। আমাকে ফাঁসাতে আদালতে মিথ্যা মামলাও করেছে।’ একাধিক বিয়ে করার বিষয়টি অস্বীকার করেন নুরু। পঞ্চগড় পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুদর্শন রায় বলেন, ‘জামিনে আসার পর সে (নুরু) তার স্ত্রীকে নির্যাতন করছে কি না এমন অভিযোগ আমাদের কাছে নেই। অভিযোগ পেলে আমরা আইনি ব্যবস্থা নেব।’ উৎস: কালের কন্ঠ।

ad

পাঠকের মতামত