এমন সংবাদ সম্মেলন আগে করেননি মাশরাফি
নিউজ ডেস্ক।। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ শুরু ৯ ডিসেম্বর। রীতি অনুযায়ী বাংলাদেশ ওয়ানডে অধিনায়কের সিরিজ-পূবর্ সংবাদ সম্মেলন ৮ ডিসেম্বর হওয়ার কথা। কিন্তু মাশরাফি সংবাদ সম্মেলনে চলে এলেন গতকাল। তঁার আধঘণ্টার সংবাদ সম্মেলনের প্রায় পুরোটাতেই থাকল রাজনীতি। বিসিবির মিডিয়া ম্যানেজার সোমবার জানিয়েছিলেন, মঙ্গলবার দুপুরে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন মাশরাফি বিন মুতর্জা। ওয়ানডে সিরিজ শুরু হবে ৯ ডিসেম্বর। রীতি মেনে ওয়ানডে অধিনায়কের সিরিজ-পূবর্ সংবাদ সম্মেলন ৮ ডিসেম্বর হওয়ার কথা। মঙ্গলবারই কেন সংবাদমাধ্যমের সামনে আসছেন মাশরাফি?
রাজনীতিতে নাম লেখানোর পর থেকেই তঁাকে নিয়ে মানুষের বিপুল আগ্রহ, তঁাকে নিয়ে নানা প্রশ্ন। খেলোয়াড়ি জীবন শেষ না হতেই কেন রাজনীতিতে এলেন? কেনইবা নিবার্চন করার সিদ্ধান্ত নিলেন? এত দিন সব মতের, সব পথের মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন; সেই ভালোবাসায় দেখা দিয়েছে বিভক্তি। শুনতে হচ্ছে নানা নেতিবাচক কথাও। তবুও সবার প্রিয় ‘ম্যাশ’ কেন এই সিদ্ধান্ত নিলেন? রাজনীতির কণ্টকময়, পিচ্ছিল পথে হেঁাচট খাওয়ার ঝুঁকি আছে। ঝুঁকি আছে নোংরা রাজনীতিতে রক্তাক্ত হওয়ারও। কেন মাশরাফি এই পথটাই বেছে নিলেন? ক’দিন আগে ফেসবুকে নিজের পেজে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তবুও প্রশ্নের শেষ নেই। সব প্রশ্নের উত্তর দিতে মাশরাফি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ওয়ানডে সিরিজের আগেই রাজনীতিবিষয়ক সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেবেন। খেলা শুরু হয়ে গেলে যেন এটি নিয়ে প্রশ্ন না হয়, সে কারণেই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন।
মঙ্গলবার মাশরাফির সংবাদ সম্মেলনটা হলোও এক অদ্ভুত জায়গায়, মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের অস্থায়ী পুলিশ কন্ট্রোল রুমে। কোনো ক্রিকেটার পুলিশ কন্ট্রোল রুমে দঁাড়িয়ে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলছেন, এই দৃশ্য পৃথিবীতে আগে কখনো দেখা গিয়েছে কি না, সন্দেহ! বিসিবির মিডিয়া ম্যানেজার জানিয়েছিলেন, সংবাদ সম্মেলন হবে বেলা ১টায়। মাশরাফি অনুশীলন সেরে এলেন বেলা ২টায়। আধঘণ্টার সংবাদ সম্মেলনে কত যে প্রশ্ন। প্রশ্নগুলো কখনো তঁার কাছে কখনো লাসিথ মালিঙ্গার ইয়কার্র, কখনো মোস্তাফিজের দুদার্ন্ত কাটার, কখনো জিমি অ্যান্ডারসনের সুইং, কখনো বা মুখ বরাবর শোয়েব আখতারের বাউন্সার হয়ে ধেয়ে এসেছে!
প্রশ্নের উত্তর দিতে কখনো মাশরাফি বিমষর্ হয়েছেন, কখনো বা মুখে ঝুলিয়ে দিয়েছেন কাষ্ঠহাসি। আধঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পরও যখন প্রশ্ন শেষ হচ্ছিল না, একটা পযাের্য় বাধ্য হয়ে জনাকীণর্ সংবাদ সম্মেলন ছেড়ে হঁাটাই দিলেন। ক্রিকেটবিষয়ক কত কঠিন, জটিল প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। তবে ১৭ বছরের আন্তজাির্তক ক্যারিয়ারে কখনো এমন সংবাদ সম্মেলনে আসতে হয়নি মাশরাফিকে। রাজনীতিতে আসা নিয়েই এত প্রশ্ন। তা কোন ভাবনায় নাম লিখিয়েছেন রাজনীতিতে, সেটির উত্তর আরও বিস্তারিত দিলেন মাশরাফি, ‘আমার ক্যারিয়ার অবশ্যই শেষের দিকে। না আমি শচীন টেন্ডুলকার, না আমি গেøন ম্যাকগ্রা যে মানুষ আমাকে স্মরণ করবে। আমার মতো করেই ক্রিকেট খেলেছি। আমার মতো করেই সংগ্রামমুখর ক্যারিয়ারটা গড়েছি। মানুষের জন্য কিছু করা সবসময়ই উপভোগ করেছি। এটা আমার ছোটবেলার শখ ছিল বলতে পারেন। ছোটবেলার চাওয়া-পাওয়া ছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে সুযোগটা দিয়েছেন। যদি বৃহৎ পরিসরে কিছু করা যায়, এ ভাবনাতেই রাজনীতিতে আসা।’
‘খেলা শুরু হওয়ার পর এ নিয়ে আর প্রশ্ন না হোক, যে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার এখন দিয়ে ফেলছি’, খেলার মধ্যে রাজনীতি যেন না আসে, মাশরাফি বললেন, সে কারণেই এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন। খেলার মানুষ রাজনীতিতে জড়িয়েছেন, মাশরাফি চাইলেও কি আর এড়াতে পারবেন? অধিনায়কের ক্রিকেট আর রাজনীতি এখন হাত ধরাধরি করেই এগোবে। না চাইলেও সময়-অসময়ে চলে আসবে এ প্রসঙ্গ। বাংলাদেশ ভালো করলেও আসবে, খারাপ করলেও আসবে। এমনকি ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে টস করতে গিয়েও যদি ধারাভাষ্যকররা তঁার কাছে রাজনৈতিক-বিষয়ক মন্তব্য জানতে চান, তাতেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। হেরে যাওয়ার পরও সংবাদ সম্মেলনে এসেছেন অনেকবারই। খেলার ধকল আর পরাজয়ের ক্লান্তি ছিল চোখেমুখে। মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনটাকে সেগুলোর সঙ্গেও মেলানো গেল না। অথচ রাজনীতির দীঘর্ দুরূহ পথ তো পড়ে আছে মাশরাফির সামনেই।
রাজনীতিতে নামার ব্যাপারে মাশরাফির মূল যুক্তি দেশের জন্য কাজ করা। এর পাল্টা হিসেবে তঁাকে প্রশ্ন করা হয়, দেশের মানুষের জন্য কাজ তো তিনি এমনিতেই করছিলেন। রাজনীতিতে নামা-না নামা এতে কতটা পাথর্ক্য তৈরি হবে? জবাবে পাল্টা প্রশ্ন দিয়ে মাশরাফি বলেন, ‘আমার ফাউন্ডেশনে কী কী কাজ হয়েছে বলতে পারবেন?’ প্রশ্নকতার্ কিছু কাজের কথা উল্লেখ করতেই মাশরাফি ব্যাখ্যা দিলেন, ‘একটাও কিন্তু ঠিক হয়নি। আমি কিন্তু রাস্তা করতে পারিনি। এটাই দেখেন, সবকিছু সবার কাছে পরিষ্কার না কিন্তু। ফাউন্ডেশন করে এটাই বুঝছি। অনেক কিছু করেছি কিন্তু মানুষ জানে না। নড়াইলেরই অনেকে কিছুই জানেন না। এটা সত্যি কথা। যেটা আমি বললাম, হ্যঁা, আমি করার চেষ্টা করেছি। আমার জায়গা থেকে।
মাশরাফির বেশির ভাগ কথায় উঠে এসেছে জনমানুষের উন্নয়ন। পাল্টা প্রশ্ন এসেছে, সংসদ সদস্যের কাজ তো আইন প্রণয়ন করা, এলাকার উন্নয়ন করেন তো সেখানকার জনপ্রতিনিধিরা। উদাহরণ হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যদের কথাও বলা হয়। মাশরাফির জবাব, ‘আসলে, আইন প্রণয়ন করাই তো জানি। এলাকার জনপ্রতিনিধিদের কাজ উন্নয়ন করা অবশ্যই। আমি দেখেছি এ পযাের্য় (সংসদ) থেকে অনেক সাহায্য আসে, সরকারিভাবে অনেক সহযোগিতা আসে, এখান থেকে যাওয়ার পরে সেগুলো ঠিকভাবে বণ্টন করারও একটা ব্যাপার থেকে যায়। আমি চেষ্টা করব জিনিসগুলো ঠিকভাবে করার।’
সংবাদ সম্মেলনে এরপর উঠে এল নিবার্চনে লড়াইয়ের প্রসঙ্গ। মাশরাফি উন্নয়ন করতে চান, নিবার্চনে তঁার প্রতিদ্ব›দ্বীরও তো একই চাওয়া। মাশরাফি তাহলে সেই প্রতিদ্ব›দ্বীর চেয়ে কোন দিক দিয়ে ভালো? মাশরাফির সোজা জবাব, ‘আমি তো এ কথা বলিনি একবারও।’ সংবাদকমীির্ট তখন বুঝিয়ে বললেন, না আপনি যখন ভোট চাইতে যাবেন তখন তো আপনাকে এ কথা বলতে হবে। অধিনায়কও পাল্টা বললেন, ‘আমি তো একবারের জন্যই বলিনি আমি উনার (নিবার্চনে প্রতিপক্ষ) থেকে ভালো।’
বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ককে মুদ্রার উল্টোপিঠও দেখানো হয়। নিবার্চনে জিতলে মানুষের উন্নয়ন করাটা মাশরাফির জন্য সহজ হবে। কিন্তু জিততে না পারলে? দল যদি ক্ষমতায় না আসে? তখন মাশরাফির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী? এমনিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিহিংসার। মামলা, হয়রানি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হলে কী করবেনÑএই প্রশ্নও করা হয় সংবাদ সম্মেলনে। মাশরাফির জবাব, ‘কাল আপনার জীবনে কী হবে সেটা আপনি জানেন না, আমার জীবনে কী ঘটবে সেটাও আমি জানি না। গুরুত্বপূণর্ হচ্ছে, আমি পরিষ্কার মন নিয়ে যাচ্ছি কি না। আমি শুধু আমাকেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, এর বাইরে কোনো কিছু আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না। আমি পুরো পরিষ্কার মনে আছি, আর আমি এখন শুধু এটাই ভাবছি। আর যেটা বললাম, কালকে আমার কী হবে সেটা আমি নিজেই জানি না। এত কিছু ভাবার সুযোগও নেই এখন আর।’
তাহলে ভোটাররা ঠিক কেন মাশরাফিকে ভোট দেবে? মাশরাফির উত্তর, ‘দেখেন, ভোট তো সবার একটা একটা করে, আরেকজনের ভোটও একটা, আমার ভোটও একটা। যিনি ভোটটা দেবেন তঁার কাছে যদি আমার গ্রহণযোগ্যতা থাকে তবেই তিনি আমাকে ভোটটা দেবে। আমার যতটুকু করণীয় থাকবে, অবশ্যই আমি ততটুকুই করব, বাদবাকিটা তঁাদের ব্যাপার, তঁারা আমাকে ভোট দেবেন নাকি দেবেন না। সেটার নিয়ন্ত্রণ তো আমার কাছে নেই। আমি শুধু আমার বাতার্ দিতে পারি, কিন্তু বাকিটা তো আমার হাতে নেই।’ সেই বাতার্টা কী? মাশরাফি তা বলতে চাইলেন না। নিবার্চনী আচরণবিধির ঝামেলা এড়িয়ে যেতে চাইলেন। উৎস: যায়যায়দিন







